এমপিওভুক্তির দাবিতে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি শিক্ষক-কর্মচারীদের

২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দেশের সব স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নন-এমপিও স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, ডিগ্রি, অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একযোগে এমপিওভুক্ত করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ বেতনবিহীন শিক্ষক-কর্মচারী পরিষদ। দাবি পূরণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সারাদেশে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করে রাজপথে নামার পাশাপাশি লাগাতার অবস্থান কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সংগঠনটির নেতারা।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়। এর আগে একই দাবিতে দেশের বিভিন্ন জেলায় জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেন শিক্ষক-কর্মচারীরা।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন সংগঠনের আহ্বায়ক অধ্যক্ষ শামিয়া জামান পান্না। এতে বলা হয়, দেশে প্রায় ৬০০ নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ৬৮ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী বছরের পর বছর শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করলেও বেতন পাচ্ছেন না। ফলে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

সংগঠনটির দাবি, বেতন না পাওয়ায় শিক্ষক-কর্মচারীরা অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। দেশের সার্বিক উন্নয়ন এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের অধিকার নিশ্চিত করতে সব স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অবিলম্বে এমপিওভুক্ত করা প্রয়োজন।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, আমরা আশা করি, সরকার দ্রুত আমাদের যৌক্তিক দাবি মেনে নিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটাবে। ন্যায্য দাবি আদায় না হলে এবং সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া না হলে সারাদেশের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করে শিক্ষক-কর্মচারীরা রাজপথে নেমে আসবেন।

দাবি আদায়ে কঠোর ও লাগাতার অবস্থান কর্মসূচিও ঘোষণা করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।

সংবাদ সম্মেলনে এক শিক্ষক নেতা বেতন না পাওয়ায় শিক্ষক-কর্মচারীদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক দুর্দশার কথা তুলে ধরে বলেন, আজ আমাদের ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে থাকার কথা ছিল না। আমাদের থাকার কথা ছিল নিজ নিজ বিদ্যালয়, স্কুল, কলেজ, ডিগ্রি, অনার্স-মাস্টার্স কিংবা মাদরাসার শ্রেণিকক্ষে। কিন্তু বেতন না পাওয়ার কষ্ট নিয়ে আমরা আজ এখানে আসতে বাধ্য হয়েছি।

দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়ার কারণে অনেক শিক্ষক ন্যূনতম জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতেও হিমশিম খাচ্ছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাংবাদিকদের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে জানাতে চাই, আমাদের পেটে ক্ষুধা। আমরা ঠিকমতো খেতে পারছি না। আমাদের জীবনমান বলতে কিছু নেই।

বেতনবিহীন থাকার কারণে সামাজিকভাবেও শিক্ষকরা নানা ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন বলে জানান তিনি। ওই শিক্ষক নেতা বলেন, মানুষ প্রায়ই জানতে চান তাদের বেতন কবে হবে এবং বেতন ছাড়া সংসার কীভাবে চলছে। একই প্রশ্ন পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেও শুনতে হয়।

তিনি আরও বলেন, এভাবে ১৫-২০ বছর চলে গেছে। এই প্রতিষ্ঠানে আমাদের যৌবন শেষ হয়ে গেছে, কর্মশক্তি শেষ হয়ে গেছে, চুল পেকে সাদা হয়ে গেছে; অথচ আজ পর্যন্ত বেতনের মুখ দেখিনি।

শিক্ষকদের পারিবারিক অসহায়ত্ব তুলে ধরে তিনি একজন শিক্ষকের সন্তানের সঙ্গে কথোপকথনের উদাহরণ দেন। ওই শিক্ষক নেতা বলেন, এক শিক্ষকের মেয়ে বাবাকে প্রশ্ন করেছিল, অন্য স্বজনেরা কোরবানির মাংস নিয়ে বাড়ি ফিরলেও তার বাবা কেন তা পারেন না এবং তিনি কী চাকরি করেন। এমন প্রশ্নের উত্তর একজন বাবার কাছে থাকে না!

তার ভাষ্য, এমন অনেক শিক্ষক আছেন যারা তরুণ বয়সে চাকরিতে যোগ দিয়ে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে জীবনের বড় অংশ ব্যয় করেছেন। কিন্তু চাকরির বয়স শেষ হয়ে অবসরে চলে গেলেও কোনো বেতন পাননি।

তিনি বলেন, প্রত্যেক মানুষের কাজের একটি বিনিময় ও মূল্য আছে। কিন্তু আমাদের কাজের যেন কোনো মূল্য নেই।

নীতিমালার কারণে বছরের পর বছর বেতনবিহীন অবস্থায় থাকার অভিযোগ তুলে শিক্ষক নেতা বলেন, তারা সংঘাত চান না। শিক্ষকসুলভ আচরণ বজায় রেখে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে দাবি জানিয়েছেন। সেই ধারাবাহিকতায় সরকারের কাছে নিজেদের দুর্দশার কথা পৌঁছে দিতেই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে।

তবে নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া তথ্যে ভিন্নতা রয়েছে। লিখিত বক্তব্যে দেশে প্রায় ৬০০ নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানের কথা বলা হলেও শিক্ষক নেতার বক্তব্যে সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী ৫ হাজার ৩৩২টি নন-এমপিও প্রতিষ্ঠান থাকার কথা উল্লেখ করা হয়।

শিক্ষক নেতা দাবি করেন, এসব প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করতে সরকারের খুব বেশি অর্থের প্রয়োজন হবে না। তিনি বলেন, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও নন-এমপিও শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধানে তুলনামূলক কম অর্থ প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে বঞ্চনার অবসান চেয়ে তিনি বলেন, আমাদের যেন আগামী ঈদ বা কোরবানিতে সন্তানদের মুখের দিকে অসহায়ভাবে তাকিয়ে থাকতে না হয়। আমরা যেন আর অভুক্ত না থাকি।

মাওলানা মোহাম্মদ ইব্রাহিম খলিলের সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা শিক্ষক-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।