☰
✕

আমি সমাজ বদলাতে আসিনি, মানুষকে আনন্দ দিতে এসেছি : জেমস

০২ অক্টোবর, ২০২৬

গিটার হাতে ঘরছাড়া এক তরুণের স্বপ্ন ছিল গান। চট্টগ্রামের আজিজ বোর্ডিং থেকে শুরু হওয়া সেই পথচলা তাকে এনে দিয়েছে আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা। ফারুক মাহফুজ থেকে হয়ে উঠেছেন জেমস—বাংলা রকসংগীতের ‘গুরু’। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তার কণ্ঠ ও গিটারের জাদুতে মেতেছে একের পর এক প্রজন্ম। আজ শুক্রবার (২ অক্টোবর) ৬১ পেরিয়ে ৬২ বছরে পা রাখলেন নগর বাউলখ্যাত এই সংগীত তারকা।

নওগাঁয় জন্ম হলেও জেমসের বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামে।

সেখানেই ব্যান্ড সংগীতের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয় তার। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই বাবা বুঝতে পেরেছিলেন, ছেলের মন পড়ে আছে অন্য কোথাও। বাবার সঙ্গে অভিমান করে একদিন গিটার হাতে ঘর ছাড়েন তরুণ জেমস। আশ্রয় হয় চট্টগ্রামের আজিজ বোর্ডিংয়ে।

সেখান থেকেই শুরু হয় সংগীতের পথে তার নতুন অধ্যায়।

বন্ধুদের নিয়ে গড়ে তোলেন ব্যান্ড ‘ফিলিংস’। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। ঝাঁকড়া চুল, বাবরি দোলানো আর স্বতন্ত্র কণ্ঠের এই শিল্পী ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন বাংলা রকসংগীতের অন্যতম জনপ্রিয় মুখ। ভক্তদের ভালোবাসায় পেয়েছেন ‘গুরু’ উপাধি।

জন্মদিন ঘটা করে উদযাপন করেন না জেমস। তবে বিশেষ দিন উপলক্ষে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর পূর্বাচলের একটি ক্লাবে নিরিবিলি সময় কাটিয়েছেন তিনি। সেখানে গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সংগীতের ভবিষ্যৎ, নতুন প্রজন্মের শিল্পী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং শিল্পের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন এই রকস্টার।

‘মানুষের এখন পুরো একটি ট্র্যাক শোনারও ধৈর্য নেই’

সংগীতের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা সংশয় থাকলেও নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের প্রতিভা নিয়ে প্রশ্ন নেই জেমসের। তার মতে, গান তৈরির ধরন ও শোনার অভ্যাস বদলে যাচ্ছে। প্রযুক্তির সহজলভ্যতা যেমন গানকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে, তেমনি বদলে দিচ্ছে শ্রোতার মনোযোগের ধরনও।

জেমসের ভাষ্য, ‘এ পর্যন্ত যত গান তৈরি হয়েছে, যদি নতুন কোনো গান নাও তৈরি হয়, তবু মানুষ আগামী ২০ বছর অনায়াসেই সেগুলো শুনতে পারবে। আর এখন যেহেতু গান স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে চলে গেছে, তাই এটি খুব সহজেই পাওয়া যাচ্ছে। যা বিনামূল্যে পাওয়া যায়, মানুষের তার প্রতি আকর্ষণ কমে যায়। মানুষের এখন পুরো একটি ট্র্যাক শোনারও আর ধৈর্য নেই।’

প্রযুক্তির পরিবর্তন মেনে নেওয়ার ওপরও জোর দিয়েছেন এই শিল্পী। তার কথায়, ‘পরিবর্তন মেনে নিতে হবে। এআই এখন নিজেই কোড লিখছে, ফলে আলাদা কোডারদের প্রয়োজনীয়তা কমে আসছে। কিন্তু কোনো শিল্পরূপ বিলুপ্তির পথে থাকলেও তা প্রায়শই ভালোবাসা ও আবেগের কারণেই টিকে থাকে।’

‘লাভের কথা ভেবে গান তৈরি করা যায় না’

জেমসের কাছে সংগীত কেবল পেশা নয়, আবেগ ও ভালোবাসার জায়গা। তার মতে, শিল্পচর্চার মূল প্রেরণা হওয়া উচিত নিজের ভেতরের তাগিদ। লাভের হিসাব কষে শিল্পের পথে এগোলে হতাশ হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যা-ই করা হোক না কেন, তা পুরোপুরি আবেগ ও ভালোবাসা থেকেই করতে হবে। লাভের কথা ভেবে গান তৈরি করা যায় না। যদি প্রাকৃতিকভাবে কিছু আসে, তবে তা ভালো, কিন্তু আপনি যদি লাভের আশা নিয়ে কোনো শিল্পকলা শুরু করেন, তবে আপনাকে হতাশ হতে হবে।’

নতুন প্রজন্মের সংগীতশিল্পীদের প্রতিভা ও আগ্রহের প্রশংসাও করেছেন জেমস। তার মতে, নতুন প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ভালো কিছু তৈরি করতে পারলে তাতে আপত্তির কোনো কারণ নেই।

জেমস বলেন, ‘এখন তো এআই-এর যুগ। তরুণ সংগীতশিল্পীরা যদি সুন্দর কাজ তৈরির জন্য এআই বা নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে, তবে অবশ্যই তা করা উচিত। ভালো কোনো নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে কোনো দোষ নেই।’

‘সংস্কৃতি নদীর মতো’

সংগীত মানুষের জন্য—মানুষের আনন্দ, অনুভূতি আর প্রকাশের মাধ্যম। তাই গান কোথায়, কীভাবে গাওয়া হবে, তা নিয়ে অযথা বাধা দেওয়ার পক্ষপাতী নন জেমস। তার কথায়, সংস্কৃতিকে স্বাভাবিক গতিতে বিকশিত হতে দেওয়া উচিত।

তিনি বলেন, ‘গান তৈরি হয় মানুষের শোনার ও গাওয়ার জন্য। মানুষ যেখানে খুশি বাজারে কিংবা নদীর ঘাটে গান গাইবে। কারোই এতে বাধা দেওয়া উচিত নয়। সংস্কৃতি নদীর মতো—একে তার নিজস্ব গতিতে বইতে দেওয়া উচিত।’

সমাজের অনিয়ম কিংবা অসংগতি নিয়ে শিল্পীদের কথা বলার অধিকারও স্বীকার করেন এই গায়ক। তবে সেটি হতে হবে ব্যক্তির নিজস্ব উপলব্ধি ও সচেতনতা থেকে। নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে জেমস বলেন, ‘আমি একজন বিনোদনকর্মী; আমি সমাজ বদলাতে আসিনি। আমি মানুষকে আনন্দ দিতে এসেছি।’

সমাজের কল্যাণে বড় বড় পরিবর্তনের অপেক্ষায় না থেকে প্রত্যেকের নিজের জায়গা থেকে ভালো কিছু করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। জেমসের ভাষায়, ‘সবার জন্য ভালো করার মতো এমন বড় বড় চিন্তা করার চেয়ে যদি প্রত্যেকে নিজের ও নিজের আশপাশের মানুষের ভালো করার চেষ্টা করে, তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সমাজের কল্যাণ হবে।’