☰
✕

তিন ট্রাকভর্তি ৪ লাখ পাঠ্যবই জব্দ নিয়ে তুলকালাম!

০৩ অক্টোবর, ২০২৬

এক ছাপাখানার তিন ট্রাকভর্তি ৪ লাখ ৩০ হাজার ২৫৫ কপি মাধ্যমিকের পাঠ্যবই জব্দ নিয়ে তুলকালাম ঘটনা ঘটেছে! অটো প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিংয়ের এসব বইয়ের মান সঠিক আছে দাবি করে মাঠ পর্যায়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসে ডেলিভারির অনুমতি দিয়েছিল এবার ই-টেন্ডারের মাধ্যমে এনসিটিবির মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবই ইন্সপেকশনের কাজ পাওয়া ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসেস বিডি।

গত ২৭ সেপ্টেম্বর মাতুয়াইলে ছাপাখানার সামনে থেকে তিনটা ট্রাকে বইগুলো উঠানো হয়েছিল। কিন্তু একটি গোয়েন্দা সংস্থা থেকে এনসিটিবি জানতে পারে, এসব বইয়ের ৬০ ভাগ নিম্নমানে ছাপানো। মুহূর্তের মধ্যে খবরটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত চলে যায়। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। এনসিটিবির মনিটরিং টিমের পাশাপাশি দুটি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে তিন ট্রাকভর্তি বই জব্দ করে পুনরায় মান যাচাই করে। তিন দিন বই আটকে রাখা হয়।

সর্বশেষ মাত্র ১৪৬টি (শূন্য দশমিক ০৩৪ ভাগ) বইয়ের কাভারে দাগ শনাক্ত করে তা বাতিল করা হয়। বাকি ৪ লাখ ৩০ হাজার ২৫৫ কপি বই ডেলিভারির জন্য অনুমতি দেওয়া হয় গত ৩০ সেপ্টেম্বর। সংশ্লিষ্টরা বলেন, ৬০ ভাগ নিম্নমান অর্থের বিনিময়ে কি ভালো মান হয়ে গেল? নাকি ইন্সপেকশন এজেন্টের রিপোর্টই সঠিক ছিল? এই প্রশ্ন এখন সবার। 

অটো প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিংয়ের স্বত্ব্বাধিকারী মিন্টু মোল্লা ইত্তেফাককে বলেন, ‘তার বইগুলোপ প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন করেছিল ইন্সপেকশন এজেন্ট। এরপর আবার এনসিটিবির মনিটরিং টিম যাচাই-বাছাই করে সামান্য কিছু বইয়ে ত্রুটি পেয়েছে। সেগুলো পুনরায় ছাপিয়ে দেওয়া হবে।’ এদিকে পাঠ্যবই ডেলিভারিতে বিলম্বের জন্য এনসিটিবির মনিটরিং টিমের অদক্ষতা ও আইন-বহির্ভূত কর্মকাণ্ডকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেন, আগামী নভেম্বরের মধ্যে সব পাঠ্যবই মাঠে পৌঁছানোর কথা। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত মাধ্যমিকের মাত্র ৫ শতাংশ বই ডেলিভারি হয়েছে। এই ধীরগতি অব্যাহত থাকলে সব পাঠ্যবই ডেলিভারি দিতে আগামী মার্চ মাস পর্যন্ত লেগে যেতে পারে।

ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসেস বিডির স্বত্বাধিকারী শেখ বেলাল হোসাইন গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, আমি ১৫ বছর ধরে পাঠ্যবই ইন্সপেকশশেন সাথে সম্পৃক্ত। ই-টেন্ডারের মাধ্যমে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বই ইন্সপেকশনের কাজ পেয়েছি। আইন অনুযায়ী, আমার প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন (পিডিআই) করার কথা। কিন্তু এনসিটিবির মনিটরিং টিম ছাড়া আমি পিডিআই করতে পারছি না। অথচ আইনে এটি নেই। আইন বহির্ভূত কর্মকাণ্ডের কারণে পাঠ্যবই ডেলিভারিতে যে বিলম্ব হচ্ছে তার উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, গত ২৪ সেপ্টেম্বর সকালে একটি ছাপাখানার পিডিআই করার কথা ছিল। এনসিটিবির মনিটরিং টিমকে অবহিত করা হয়েছিল। কিন্তু এনসিটিবির মনিটরিং টিম যেতে পারেনি, এ কারণে পিডিআই করতে তিন দিন বিলম্ব হয়। এরকম ঘটনা অনেক রয়েছে। আবার শুক্রবারে এনসিটিবির মনিটরিং টিম সময় দিতে পারে না। তিনি বলেন, অটো প্রিন্টিং প্রেসে ৬০ ভাগ নিম্নমানের বই তৃণমূলে যাচ্ছে দাবি করে আটকিয়ে ছিল এনসিটিবি। কিন্তু পরীক্ষানিরীক্ষা করে মাত্র ১৪৬ কপি বইয়ের কাভারে সামান্য দাগ পেয়েছে। আমার পিডিআই রিপোর্ট যে সঠিক ছিল সেটা প্রমাণিত হয়েছে। মাঝখানে বই ডেলিভারিতে বিলম্ব হলো। এভাবে প্রতিটি পিডিআই বিলম্ব হলে সঠিক সময়ে বই সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়বে। আর এর দায়ভার আমার ওপরে আসবে। কিন্তু স্বাধীনভাবে পিডিআই করতে পারছি না কেন? বিষয়টি এনসিটিবিকে বারবার বলার পরও প্রতিকার পাচ্ছি না।

সূত্র জানায়, এবার এনসিটিবির মনিটরিং টিমের আইন-বহির্ভূত আরেকটি কর্মকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দুটি ছাপাখানা। সম্প্রতি ভাইভাই ও বর্ণশোভা ছাপাখানার বিপুল পরিমাণ কাজ কেটে দিয়েছে এনসিটিবির মনিটরিং টিম। কারণ এসব কাগজে ৬৮ জিএসএম পাওয়া যায়। তবে ৬৮ জিএসএমর কাগজ প্রাইমারির পাঠ্যবইয়ে গ্রহণযোগ্য না হলেও মাধ্যমিকে যে গ্রহণযোগ্য তা জানতো না এনসিটিবির মনিটরিং টিম। তাদের এই ভুল সিদ্ধান্তের বিষয়টি ধরিয়ে দেয় ইন্সপেকশন এজেন্ট। 

‘রাঘববোয়ালরা’ এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে :কিছু ব্যতিক্রম ঘটনা ঘটলেও আগামী বছরের বিনা মূল্যের পাঠ্যবইয়ের মান নিয়ে শঙ্কা এবারও পুরোপুরি কাটছে না। দরপত্রের শর্তের চেয়ে পাঠ্যবইয়ে কম মানের জিএসএমের কাগজ ও নিম্নমানের কালি ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। কোথাও কোথাও বাঁধাইয়েও ত্রুটি ধরা পড়েছে। এ পর্যন্ত নিম্নমানের যেসব পাঠ্যবই কিংবা ফর্মা কেটে ফেলা হয়েছে, সেগুলো ছোট ছোট ছাপাখানার। ‘রাঘববোয়ালরা’ এখনো ধরাছোয়ার বাইরে রয়েছে। শেষ সময়ে যাচাইয়ের সুযোগ কম থাকে, সেই সুযোগ নিতে চায় ছাপাখানার ‘রাঘববোয়ালরা’। পাঠ্যপুস্তক ছাপানো ও বিতরণের দায়িত্বে থাকা এনসিটিবি সূত্রেই এসব তথ্য জানা গেছে। বই ছাপার মান ও সার্বিক অবস্থা জানতে গত সোমবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন রাজধানীর ছয়টি ছাপাখানা পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি বইয়ের গুণমান ও ছাপার কাজের অগ্রগতি যাচাই করেন।

এনসিটিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, পাঠ্যবইয়ের মান বজায় রাখার বিষয়ে এবার সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এ কারণে পরিদর্শনে অনিয়ম ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের কাগজের ফর্মা বাতিল করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ছাপাখানা কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যাও চাওয়া হচ্ছে। জানতে চাইলে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বলেন, ‘রোডম্যাপ অনুযায়ী বই ছাপার কাজ এগিয়ে চলছে। এতে কোনো রকম ব্যত্যয় পেলেই আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। ইতিমধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠানকে শোকজ করা হয়েছে। ফর্মার মান খারাপ পেলে সঙ্গে সঙ্গেই কেটে দেওয়া হচ্ছে।’

নির্ধারিত সময়ে বই সরবরাহ করা কঠিন :কয়েকটি ছাপাখানার মালিকেরা বলেন, বিদ্যুত্ পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এতে নির্ধারিত সময়ে বই সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিদ্যুত্ না থাকলে জেনারেটর চালানোর বাড়তি ব্যয় পোষাতে গিয়ে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান বইয়ে নিম্নমানের কাগজ ব্যবহারের সুযোগ খুঁজতে পারে বলেও সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা। জানতে চাইলে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের বলেন, ‘পাঠ্যবইয়ের মানে কোন ছাড় দেওয়া হবে না। বই ছাপার কাজ আমাদের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ীই চলছে। আশা করছি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।’