☰
✕

জাবির শিক্ষক রিফা তাসফিয়ার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ, তদন্ত কমিটি গঠন

০৪ অক্টোবর, ২০২৬

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) লোকপ্রশাসন বিভাগের প্রভাষক রিফা তাসফিয়ার বিরুদ্ধে একাডেমিক, প্রশাসনিক ও আচরণগত নানা অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চেয়ে গত ১৮ জুন উপাচার্যের কাছে বিস্তারিত প্রতিবেদন পাঠিয়েছে বিভাগীয় একাডেমিক কমিটি। তবে চিঠি পাঠানোর পর কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে জানা গেছে।

বিভাগীয় একাডেমিক কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. হরে কৃষ্ণ কুন্ড ওই প্রতিবেদন উপাচার্যের কাছে পাঠান। এতে বলা হয়, ২০২৩ সালের ১০ আগস্ট বিভাগে যোগদানের পর থেকে রিফা তাসফিয়ার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে মৌখিক ও লিখিত অভিযোগ এসেছে। এসব অভিযোগ নিয়ে বিভাগীয় একাডেমিক কমিটির একাধিক সভায় আলোচনা ও বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর বিভাগের চতুর্থ বর্ষের (৫০তম ব্যাচ) শিক্ষার্থীরা রিফা তাসফিয়ার নেওয়া PA-404: Public Sector Management in Bangladesh কোর্স বর্জন এবং তাকে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে প্রত্যাহারের আবেদন করেন।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ১০ সেপ্টেম্বর বিভাগীয় একাডেমিক কমিটির জরুরি সভায় কোর্সটি অন্য একজন শিক্ষকের কাছে হস্তান্তর এবং তার তত্ত্বাবধানে থাকা টার্ম পেপারের শিক্ষার্থীদের অন্য শিক্ষকদের মধ্যে বণ্টনের সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে তাকে একাডেমিক দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ দিতে শিক্ষার্থীদের আবেদনটি তখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এদিকে, ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর বিভাগের উইকেন্ড প্রোগ্রামের ২৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরাও রিফা তাসফিয়ার আচরণগত বিভিন্ন সমস্যা উল্লেখ করে কোর্স শিক্ষক পরিবর্তনের আবেদন করেন।

এ বিষয়ে ২৪ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত উইকেন্ড প্রোগ্রামের সমন্বয় কমিটির সভায় তাকে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানানো হলেও তিনি উপস্থিত হননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে সভায় পরবর্তী ব্যাচগুলোতে তাকে উইকেন্ড প্রোগ্রামে পাঠদানের দায়িত্ব না দেওয়া এবং পাঠদানে আরও মনোযোগী ও নিয়মানুবর্তী হওয়ার পরামর্শ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পরে বিভাগীয় একাডেমিক কমিটিও এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত ১৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত বিভাগের ১৫০তম একাডেমিক কমিটির সভায় রিফা তাসফিয়ার পাঠদান করা কোর্সগুলোর অগ্রগতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়।

সভায় অভিযোগ করা হয়, তৃতীয় বর্ষের PA-301 ও PA-309 কোর্সে পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো টিউটোরিয়াল পরীক্ষা নেওয়া হয়নি। এছাড়া ঈদুল ফিতরের ছুটির পর ২৯ মার্চ থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি কোনো ক্লাস নেননি বলেও অভিযোগ করা হয়। একই ধরনের অভিযোগ ওঠে চতুর্থ বর্ষের PA-404 কোর্স নিয়েও।

এ ছাড়া বিভাগের ১৪৯তম একাডেমিক কমিটির সভার ই-মেইল নোটিশের জবাবে তিনি শিক্ষকদের উদ্দেশে, “Two academic committee meetings within less than one month! Department on fast track to success”—এমন মন্তব্য পাঠান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভাগের শিক্ষকেরা মন্তব্যটিকে আপত্তিকর হিসেবে দেখেছেন বলেও এতে বলা হয়।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে ব্যাখ্যা ও লিখিত জবাব দিতে তাকে ১২ মে পর্যন্ত সময় দেওয়া হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরবর্তীতে ১৫ জুন অনুষ্ঠিত বিভাগীয় একাডেমিক কমিটির ১৫১তম সভায় বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় কয়েকজন শিক্ষক কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে তাকে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন। আবার কেউ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে বিষয়টি তুলে ধরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেন।

সভায় কয়েকজন শিক্ষক তার আচরণে মানসিক সমস্যার লক্ষণ থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেন এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার কাউন্সেলিংয়ের পরামর্শ দেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো চিকিৎসাগত মূল্যায়নের কথা প্রতিবেদনে নেই।

প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার আগে শেষবারের মতো তার সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগও নেওয়া হয়। এ জন্য অধ্যাপক ড. মো. নুরুল আমিনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি রিফা তাসফিয়ার বাবার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করেন। তবে পরে আর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বিভাগীয় একাডেমিক কমিটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ ও ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানায়।

তবে অভিযোগের বিষয়ে রিফা তাসফিয়ার বক্তব্য ভিন্ন। যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। আমাকে অফিশিয়ালি কোনো কিছু জানানো হয়নি যে, আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।”

এ বিষয়ে চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মো. শামছুল আলম। তিনি বলেন, “আমরা আজ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দিচ্ছি। তদন্ত কমিটিকে ১০-১২ দিন সময় দেওয়া হবে। এর মধ্যে তারা রিপোর্ট উপস্থাপন করবে। এরপর তা সিন্ডিকেটে নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”