১১ অক্টোবর, ২০২৬
শারদীয় দুর্গোৎসব এলেই মণ্ডপে মণ্ডপে শুরু হয় দেবী দুর্গার আরাধনা। ঢাকের বাদ্যি, ধূপের গন্ধ আর আলোর সাজে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। তবে দুর্গাপূজার নানা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে এমন একটি রীতি রয়েছে, যা নিয়ে মানুষের কৌতূহল দীর্ঘদিনের।
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, বাংলার দুর্গাপ্রতিমা তৈরিতে গঙ্গার পলিমাটির পাশাপাশি ব্যবহার করা হয় যৌনপল্লির মাটিও। কোথাও এই মাটি প্রতিমা তৈরির উপকরণের সঙ্গে মেশানো হয়, আবার কোথাও এর গুরুত্ব প্রতীকীভাবে তুলে ধরা হয়।
সমাজে যারা দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার, তাদের বসতির মাটি কেন দেবীর প্রতিমা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে ধর্মীয় বিশ্বাস, লোককথা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির নানা ব্যাখ্যা।
তবে এই প্রথার উৎপত্তি নিয়ে প্রচলিত কাহিনিগুলোর সবকটির ঐতিহাসিক বা শাস্ত্রীয় ভিত্তি সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।
প্রতিমা তৈরিতে ‘পুণ্যমাটি’র ধারণা
বাংলার লোকাচারে যৌনপল্লির মাটি ‘পুণ্যমাটি’ বা ‘নিষিদ্ধপল্লির মাটি’ নামে পরিচিত। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, দুর্গাপ্রতিমা তৈরির মাটির সঙ্গে বিভিন্ন উপাদান মেশানোর রীতি রয়েছে।
এর মধ্যে গঙ্গার পলিমাটি, গোবর, গোমূত্রসহ যৌনপল্লির মাটির উল্লেখও পাওয়া যায়। তবে অঞ্চল, প্রতিমাশিল্পী ও স্থানীয় প্রথাভেদে এই রীতির চর্চায় পার্থক্য রয়েছে।
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, যৌনপল্লি থেকে মাটি সংগ্রহের ক্ষেত্রেও বিশেষ আচারের কথা বলা হয়। প্রচলিত বর্ণনায়, পুরোহিত বা প্রতিমাশিল্পী সেখানকার বাসিন্দাদের কাছে মাটি চাইতে যান।
বাসিন্দারা স্বেচ্ছায় মাটি দান করলে তা গ্রহণ করা হয়। এই বর্ণনায় দানের সম্মতি ও সদিচ্ছাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। যদিও সব জায়গায় এই প্রথা একইভাবে পালিত হয়, এমন নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই।
পাপ-পুণ্যের ধারণা থেকে যে ব্যাখ্যা
এই রীতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পাপ-পুণ্য নিয়ে একটি বহুল প্রচলিত লোকবিশ্বাস। বলা হয়, পুরুষেরা যৌনপল্লিতে গিয়ে নিজেদের পুণ্য সেখানে রেখে আসে এবং পাপ নিয়ে ফিরে যায়। সেই ধারণা থেকেই যৌনপল্লির মাটিকে পুণ্যময় বলে বিবেচনা করা হয়- এমন ব্যাখ্যা প্রচলিত রয়েছে।
তবে এই বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য বা সর্বজনস্বীকৃত শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি লোককথার মধ্য দিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়া একটি ধারণা।
সমাজের বাইরে নয়, সবারই কি স্থান দেবীর কাছে?
পতিতালয়ের মাটি ব্যবহারের রীতিকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত ব্যাখ্যাগুলোর একটি হলো সামাজিক অন্তর্ভুক্তি। সমাজের যে অংশকে নানা কারণে দূরে সরিয়ে রাখা হয়, তাদের বসতির মাটি দেবীর প্রতিমায় ব্যবহারের মধ্যে অনেকে সমতার প্রতীক খুঁজে পান।
দুর্গাকে মাতৃরূপে কল্পনা করা হয়। সেই ধারণা থেকে অনেকে মনে করেন, দেবীর আরাধনায় কোনো মানুষকে সামাজিক পরিচয়ের কারণে আলাদা করে দেখার কথা নয়।
এই ব্যাখ্যায় যৌনপল্লির মাটির উপস্থিতি শুধু ধর্মীয় আচারের অংশ নয়, বরং সামাজিক বৈষম্য ও অবহেলা নিয়ে ভাবারও একটি উপলক্ষ।
তবে এই অর্থই যে প্রথাটির একমাত্র বা মূল ধর্মীয় ব্যাখ্যা, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এর তাৎপর্য নিয়ে মানুষের বিশ্বাস ও ব্যাখ্যা ভিন্ন হতে পারে। তাই লোকাচার, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং আধুনিক সামাজিক ব্যাখ্যাকে আলাদা করে দেখা জরুরি।
শিবকে ঘিরে প্রচলিত একটি লোককথা
যৌনপল্লির মাটি দুর্গাপ্রতিমা তৈরিতে ব্যবহারের কারণ ব্যাখ্যা করতে একটি জনপ্রিয় লোককথা প্রচলিত রয়েছে। কাহিনি অনুযায়ী, একবার কয়েকজন যৌনকর্মী গঙ্গায় স্নান করতে যাওয়ার পথে নদীর তীরে এক কুষ্ঠরোগীকে দেখতে পান। ওই ব্যক্তি গঙ্গাস্নানের জন্য সাহায্য চাইলেও অন্য কেউ এগিয়ে আসেননি।
তখন ওই নারীরা তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে যান। লোককথার বর্ণনায়, ওই কুষ্ঠরোগী ছিলেন স্বয়ং শিব। নারীদের মানবিক আচরণে সন্তুষ্ট হয়ে তিনি নিজের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করেন এবং তাদের বর চাইতে বলেন।
কাহিনি অনুসারে, নারীরা তখন নিজেদের উঠোনের মাটি দিয়ে দুর্গাপ্রতিমা তৈরির বর চান। শিব তাদের সেই বর দেন। এই ঘটনার পর থেকেই গঙ্গার তীরের মাটির পাশাপাশি যৌনপল্লির আঙিনার মাটি দিয়ে দুর্গাপ্রতিমা তৈরির প্রথা চালু হয় বলে লোককথাটিতে দাবি করা হয়।
দেবী পুরাণের উল্লেখ ঘিরেও রয়েছে কাহিনি
আরেকটি প্রচলিত বর্ণনায় দেবী পুরাণের উল্লেখ করে বলা হয়, এক কিশোরী যৌনকর্মীকে দেবী স্বপ্নে দেখা দিয়ে আশ্বস্ত করেন। কাহিনির এক সংস্করণে, দেবী জানান যে তার পূজায় ওই কিশোরীর আঙিনার মাটির প্রয়োজন হবে।
এই গল্পের মধ্য দিয়ে সমাজের অবহেলিত মানুষের প্রতিও দেবীর মমতার ধারণা তুলে ধরা হয়। তবে কাহিনিটির নির্দিষ্ট শাস্ত্রীয় উৎস ও প্রামাণ্যতা যাচাই ছাড়া একে দেবী পুরাণের প্রতিষ্ঠিত বর্ণনা হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।
ধর্মীয় আচার, নাকি সামাজিক বার্তা?
দুর্গাপ্রতিমায় যৌনপল্লির মাটি ব্যবহারের প্রথা নিয়ে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি সামাজিক ব্যাখ্যাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কেউ একে প্রাচীন লোকাচারের অংশ হিসেবে দেখেন, কেউবা এর মধ্যে সমাজের প্রান্তিক মানুষের স্বীকৃতির প্রতীক খুঁজে পান।
তবে এই রীতির প্রকৃত তাৎপর্য বুঝতে হলে প্রচলিত বিশ্বাস ও ঐতিহাসিক তথ্যের পার্থক্য মনে রাখা প্রয়োজন। যে ব্যাখ্যাই গ্রহণ করা হোক না কেন, প্রথাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে- ধর্মীয় উৎসবে দেবীর আরাধনায় যে সমাজ একত্র হয়, সেই সমাজে প্রান্তিক মানুষের মর্যাদা ও অধিকার কতটা নিশ্চিত?
সূত্র: নিউজ এইটটিন, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস