১৭ অক্টোবর, ২০২৬
টলটলে মুক্তো বিন্দুর মতো স্বচ্ছ শিশির জমছে ঘাসের ডগায়, ধানের শিষের পরে। আদিগন্ত মাঠ জুড়ে এখন ধানের প্রাচুর্য, সবুজ স্বপ্ন দুলছে। হলুদে-সবুজে একাকার নয়নাভিরাম অপরূপ প্রকৃতি। চারদিকে হেমবরন ধূসর আবহ ঘিরে রাখছে। দিবসে সোনাঝরা রোদ্দুর। অখণ্ড নীল আকাশ। হিমহিম, স্বল্পায়ু দিন ক্রমে ম্রিয়মাণ হয়ে যাচ্ছে, শেষ বিকালে কুয়াশার আবছা চাদর প্রকৃতিকে ঢেকে শিশিরের শব্দের মতো নামছে সন্ধ্যা। নিস্তব্ধ গভীর নিশিথে টুপটাপ শিশির পতনের হিরণ্ময় শব্দ। ‘সবুজ পাতার খামের ভেতর/ হলুদ গাঁদা চিঠি লেখে/ কোন পাথারের ওপার থেকে/ আনল ডেকে হেমন্তকে’...আজ পয়লা কার্তিক।
আবহমান বাংলায় ষড়্ঋতুর পরিক্রমায় এলো হেমন্ত। শরতের পর কার্তিক-অগ্রহায়ণ মিলে হেমন্ত। নতুন ঋতুর আগমনে রূপ বদলায় প্রকৃতি। প্রকৃতির ম্লান, ধূসর ও অস্পষ্টতার অনুভূতি হানা দেয় চেতনলোকে। কবির কথায় ‘পুলকে আর বিষাদে ভরা’ থাকে এই ঋতু। হেমন্তকে বলা হয় শীতের বাহন। এই কার্তিকে প্রকৃতিতে প্রগাঢ় সবুজ যেমন পাওয়া যায়, তেমনি পাওয়া যায় শীতের মিষ্টি আমেজও। এক্ষণে গ্রামীণ জনপদের প্রকৃতিতে অনুভূত হচ্ছে শীতের আমেজ, সাঁঝ-প্রভাতে কুয়াশার চাদর। আকাশ থেকে খণ্ড খণ্ড পেঁজা তুলোর মতো শুভ্র মেঘ সরে গিয়ে নিরাভরণ হয়েছে বিশাল নীল আকাশ। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়—‘হায় হেমন্তলক্ষ্মী, তোমার নয়ন কেন ঢাকা—/ হিমের ঘন ঘোমটাখানি ধূমল রঙে আঁকা।/ সন্ধ্যাপ্রদীপ তোমার হাতে মলিন হেরি কুয়াশাতে,/ কণ্ঠে তোমার বাণী যেন করুণ বাষ্পে মাখা।/ ধরার আঁচল ভরে দিলে প্রচুর সোনার ধানে।/ দিগঙ্গনার অঙ্গন আজ পূর্ণ তোমার দানে...। হেমন্তের কবি জীবনানন্দ দাশ বিখ্যাত ‘বনলতা সেন’ কবিতায় হেমন্তের চিত্র এঁকেছেন। ‘সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতো সন্ধ্যা নামে/ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল/ পৃথিবীর সব রং মুছে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন/ তখন গল্পের তরে জোনাকির রং ঝিলিমিল/ সব পাখি ঘরে আসে সব নদী ফুরায় এ জীবনের সব লেন দেন/ থাকে শুধু অন্ধকার মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন’...।
গতকাল সন্ধ্যায় অস্ত যাওয়া আশ্বিনের শেষ সূর্যটার সঙ্গে নগরের তপ্ত শ্বাসও অস্ত যাওয়ার কথা, কিন্তু জলবায়ুর যে নিত্য বদল, তাতে এ আবহাওয়া আরো ক’দিন থাকবে। অগ্রহায়ণে ধান কাটার সঙ্গে সঙ্গে দশ প্রহরণ মেলতে শুরু করবে শীত। হেমন্তকে সবচেয়ে চেনা যায় ভোরের শিশিরে। খুব ভোরে হিম-শীতল বাতাসে। সবুজ পাতার গায়ে জমে থাকা শিশির বিন্দু অপার্থিব দৃশ্যমালা রচনা করে দ্যায়। জীবনানন্দ দাশের ভাষায়—‘পাণ্ডুলিপি কাছে রেখে ধূসর দ্বীপের কাছে আমি/ নিস্তব্ধ ছিলাম ব’সে;/ শিশির পড়িতেছিল ধীরে-ধীরে খ’সে;/ নিমের শাখার থেকে একাকীতম কে পাখি নামি/ উড়ে গেলো কুয়াশায়,—কুয়াশার থেকে দূর-কুয়াশায় আরো...।’ জীবন ও প্রকৃতিতে হেমন্ত এক আশ্চর্য সময় হয়ে ওঠে। শরতের শ্বেতশুভ্র কাশফুল মাটিতে নুইয়ে পড়ার পরেই আসে হেমন্ত। মেঘমুক্ত রাতের আকাশে জোছনার আলো উছলে পড়ে। বর্ষার পরে এই সময়ে বৃক্ষরাজি থাকে সবুজে ভরা। টইটম্বুর থাকে খালবিল নদীনালা। বিল জুড়ে সাদা-লাল শাপলা আর পদ্ম পুষ্পের সমারোহ। এই হেমন্তের দুই রূপ প্রতিভাত হয়; প্রথম মাসটির এক রূপ-পরেরটির অন্য। একসময় হেমন্তের প্রথম মাসটি ছিল অভাব-অনটনের। ফসল হতো না। বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্যাভাব দেখা দিত। সারা বছরের জন্য জমিয়ে রাখা চাল ফুরিয়ে যেত এ সময়ে এসে। ধানের গোলা শূন্য হয়ে যেত। কার্তিকের দুর্নাম করে তাই বলা হতো ‘মরা কার্তিক’। শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায়ও আভাস পাওয়া যায় মন্দ্রাক্রান্ত কার্তিকের। তিনি লিখেছেন—‘শূন্য নদীর তীরে...।’ ধূসর বিবর্ণে জরাক্রান্ত ঋতু হেমন্ত। এই ঋতু সুফলা নয়। মৌসুুমি কোনো শস্য বা আনাজ আমরা এই ঋতুতে পাই না। বর্ষা ও শরতের কখনো অনাবৃষ্টি আবার কখনো অতিবৃষ্টির কারণে এই ঋতু বরাবরই নিষ্ফলা থাকে। শাকসবজি ফলমূলেরও আকাল। দাম তাই আকাশচুম্বী। খালবিল থেকে সবেমাত্র বর্ষার পানি শুকাতে শুরু করে। আকাশে মাঝে মাঝে ঘুরে বেড়ায় ছন্নছাড়া মেঘের ভেলা। কাশবনের শনশন শব্দ আর পাখপাখালির কিচিরমিচিরে জনপদ মুখর থাকে। পরানে তীব্র শিস দেয় কোনো এক আকুলতা। গ্রামাঞ্চলে শুরু হয় মাছ ধরার উত্সব। বর্ষা আর শরতের বৃষ্টির জলধারা হেমন্তে শুকোতে থাকে। ‘মাছ-ভাতে বাঙালি’—এই হেমন্তকালে জাল, বর্শা, পলো, লুই নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। গ্রামের গেরস্থ কর্তা ঘরে ফেরে ডুলাভর্তি মাছ নিয়ে। চোখ আটকে যায় শুকনো জলাশয়ে ঝিমানো কচুরিপানার বেগুনি-সাদা ফুলকলিতে। ফসলহীন খেতের আলপথে জংলিফুল পাখা মেলে। পথে পথে সবুজ বুনোলতায় পতঙ্গের খুনশুটি। একটি-দুটি ফুলও ঝরে পড়ে ঘাসের নরম বিছানায়। কাঁঠালিচাঁপার গন্ধ ডাকে দুপুরের সঙ্গী হতে। মনে হয় যেন-বা কোনো নবীনা কনে বউয়ের মুখের উজ্জ্বল আভা ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে, লাজুক রঙের বাহার। পথের বাঁকে হালকা বাতাসে ওড়ে হেমন্তের ধুলো, ধানের পরশমাখা। ঘুঘুডাকা নিঝুম বিকেল, কানে ফুলের ঝুমকো বসিয়ে গালফোলা চঞ্চল কিশোরী গাছে হেলান দিয়ে শোনে বিকেল পাখির কিচিরমিচির। এই কাব্যময় দৃশ্যপট আবহমান বাংলা ছাড়া কোথাও মেলে না । হেমন্তের এই রূপ প্রত্যক্ষ করে জাতীয় কাজী নজরুল ইসলামের অমর উচ্ছ্বাস গীতি—‘এ কী অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী জননী’, ফুলে ও ফসলে কাদা মাটি জলে ঝলমল করে লাবনি।’
কার্তিকের পর অগ্রহায়ণে আবার অবলোকিত হয় বিপরীত চিত্র, নবান্নের এই মাস সমৃদ্ধির। এ সময় মাঠের সোনালি ফসল কাটা শুরু হয়। দেখতে দেখতে গোলা ভরে ওঠে কৃষকের। অগ্রহায়ণের বাতাসে ভেসে বেড়ায় পাকা ধানের অনূঢ়া-মিষ্টি ঘ্রাণ। বাড়ির আঙিনা নতুন ধানে ভরে ওঠে। কৃষক বধূ ধান শুকোতে ব্যস্ত। দিনে দিনে বদলাচ্ছে সেই দিনলিপি-দৃশ্যপট। এখন আগের মতো সেই অভাব নেই। শস্যের বহুমুখীকরণের ফলে মোটামুটি সারা বছরই ব্যস্ত কৃষক। দৃই-তিন ফসল ফলান তারা। আয় রোজগারও বেশ। পাশাপাশি এখন কার্তিক মাসেই হূষ্টপুষ্ট হয়ে ওঠে আগাম আমন ধানের শিষ। পাকা ধান কাটা শুরু হয়ে যায়। অগ্রহায়ণ পুরোটা জুড়ে সারা বাংলায় চলবে নবান্ন উত্সব। বাঙালির উত্সব বলতেও হেমন্ত; যার নেপথ্যে সুজলা সুফলা,শস্য শ্যামলা বাংলার হাজার বছরের কৃষি সংস্কৃতির ওম জড়িয়ে আছে।
বাঙালির প্রধান ও প্রাচীনতম উত্সবগুলোর অন্যতম নবান্ন। লোকায়ত ইতিহাস অনুযায়ী, ‘কৃত্তিকা’ ও ‘আগ্রা’ নামক দুটি নক্ষত্রের নামানুসারে এ ঋতুর মাসদ্বয়ের নাম রাখা হয়েছে কার্তিক ও অগ্রহায়ণ। কার্তিকের আঞ্চলিক নাম ‘কার্তি’। যাকে গাঁয়ের লোকজন ‘মরা কার্তিক’ নামেই জানেন। মরা কার্তিকের পরই আসে সর্বজনীন লৌকিক উত্সব নবান্ন। এই নবান্ন শব্দটির আভিধানিক অর্থ হলো—নতুন অন্ন বা নতুন ভাত। হেমন্তকালীন ধান কাটার পর নতুন চালের পিঠা-পায়েস প্রভৃতি খাওয়ার উত্সব বা পার্বণবিশেষ। যা পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী মহোত্সব, বাঙালির প্রাণের উত্সব। মধ্যযুগে বাংলায় বছর শুরু হতো ধান উত্পাদনের ঋতু হেমন্ত দিয়ে। বর্ষার শেষদিকে বোনা আমন-আউশ শরতে বেড়ে ওঠে। আর হেমন্তের প্রথম মাস কার্তিকে ধান পরিপক্ব হয়। অগ্রহায়ণের শুরুতে সেই ধান কেটে মাড়াই করে গোলায় তুলে রাখেন কৃষকরা। অগ্রহায়ণ শব্দটির ‘অগ্র’ ও ‘হায়ণ’ এ দুটি অংশের অর্থ যথাক্রমে ধান ও কাটার মৌসুম।
আবহাওয়াবিদদের মতে—এখন থেকে যত দিন যাবে, ততই সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পার্থক্য কমতে থাকবে। পার্থক্য যত কমবে, তত শীতের পদধ্বনি তত ঘনীভূত হবে। উত্তরের হিমহিম বাতাসে শুষ্ক হয়ে আসবে শরীর। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে এখন প্রকৃতি যেন আর নিয়ম মানছে না।