১৯ অক্টোবর, ২০২৬
একদিকে হাসপাতালের মর্গে পড়ে আছে আগুনে পুড়ে যাওয়া ১০ পর্যটকের মরদেহ, অন্যদিকে প্রিয়জনের খোঁজে স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষা। কেউ অপেক্ষা করছেন স্ত্রীকে ফিরে পাওয়ার আশায়, কেউ সন্তান কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার প্রতীক্ষায়।
স্বজনদের চোখে মুখে উদ্বেগ, বুকজুড়ে অনিশ্চয়তা। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ৪৮ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এখনো মেলেনি নিখোঁজ কয়েকজনের সন্ধান। মরদেহগুলো অতিমাত্রায় দগ্ধ হওয়ায় পরিচয় নিশ্চিত করতে নেওয়া হচ্ছে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ। এতে প্রিয়জনের মরদেহ বুঝে পেতে আরো কয়েকদিন, এমনকি এক থেকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করতেও হতে পারে।
কক্সবাজারের উখিয়ার মেরিন ড্রাইভ ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের পর রবিবারও (১৮ অক্টোবর) কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গের সামনে স্বজনদের ভিড় দেখা গেছে। সেখানে স্ত্রী নাসরিন আক্তার মুক্তার (২৯) সন্ধানে অপেক্ষা করছিলেন ঢাকা জেলা ছাত্রদলের নেতা দেওয়ান ফয়সাল। জীবিত কিংবা মৃত যেকোনো অবস্থায় স্ত্রীর সন্ধান চান তিনি। তার শ্বশুর ঢাকার মালিবাগ এলাকায় ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য ডিএনএ নমুনা দিতে গেছেন বলে জানান ফয়সাল।
উদ্ধার করা মরদেহ নিয়ে বিভ্রান্তি
গতকাল পর্যন্ত ১০ মরদেহ উদ্ধার হলেও নিখোঁজের সংখ্যা এখন ১১ জন। তাহলে আরেকজনের মরদেহ কোথায়? এমন প্রশ্ন নিয়ে রবিবার দুপুরে কালের কণ্ঠের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ছাত্রদল নেতা দেওয়ান ফয়সাল অভিযোগ করেন, তিনি স্ত্রীর সন্ধানের বিষয়ে কক্সবাজারের প্রশাসনের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সাড়া পাননি। পরিচয় নিশ্চিত করে স্ত্রীর মরদেহ ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী দাফন-কাফন করতে চান তিনি। উদ্ধার করা ১০ মরদেহের মধ্যে আদৌ নাসরীন আকতার মুক্তার পুড়া দেহ আছে কিনা তা নিয়ে স্বামী ফয়সাল সন্দেহ প্রকাশ করছেন। তিনি জানান, একই পরিবারের ৬ জন ছাড়াও যশোরেরও এক পরিবারের অপর ৪ জনের মরদেহ নিখোঁজ রয়েছে।
উদ্ধার হওয়া ১০ জন যদি দুই পরিবারের হয়ে থাকে, তাহলে ফয়সালের স্ত্রী কোথায়, এমন প্রশ্ন নিয়ে তিনি জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটির শরণাপন্ন হয়েছেন।
এ বিষয়ে তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ‘যেহেতু তাদের কাছে বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছে, সেহেতু এখনো কোনো পুড়ে যাওয়া মানবদেহ সেখানে রয়েছে কিনা তা ভাল করে দেখা হচ্ছে।’
যশোরের নাহিদুরের পরিবারও নিখোঁজ
অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন যশোরের মণিরামপুর উপজেলার মোহনপুর গ্রামের নাহিদুর রহমান তুহিন, তার স্ত্রী আফসানা এবং তাদের দুই মেয়ে সাত বছর বয়সী রোবাইনা ও তিন বছর বয়সী সুনাইনা। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে উদ্বেগে রয়েছেন স্বজনরা। তাদের সন্ধানে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করছেন পরিবারের সদস্য ও নাহিদুরের সহকর্মীরা।
নাহিদুর ঢাকার শ্যামলীতে গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। পরিবার নিয়ে ঢাকায় বসবাস করা এই কর্মকর্তা ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত টুপটুপ রিসোর্টে থাকার বুকিং করেছিলেন। রিসোর্টের তথ্য অনুযায়ী, ১১ অক্টোবর বুকিং দেওয়া হয়েছিল এবং রবিবার দুপুর ১টায় তাদের কক্ষ ছাড়ার কথা ছিল। অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে এই পরিবারের অবস্থান নিশ্চিত করতে না পারায় তাদের স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ আরো বেড়েছে। নিহতদের তালিকা ও নিখোঁজদের তথ্য মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া চলছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আগুনে নিহত ১০ জনের মরদেহের বেশির ভাগ অংশ মারাত্মকভাবে দগ্ধ হওয়ায় স্বাভাবিক উপায়ে পরিচয় শনাক্ত করা যাচ্ছে না। এ কারণে মরদেহ থেকে নমুনা সংগ্রহের পাশাপাশি স্বজনদের রক্ত অথবা মুখের ভেতরের কোষের নমুনা নেওয়া হবে। পরে দুই পক্ষের ডিএনএ মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করা হবে।
কক্সবাজারে এ ধরনের পরীক্ষা করার পরীক্ষাগার না থাকায় নমুনা পাঠাতে হবে ঢাকায় অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবে। পরীক্ষা সম্পন্ন করে প্রতিবেদন পেতে সময় লাগায় মরদেহ হস্তান্তরেও বিলম্বের আশঙ্কা রয়েছে।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) ডা. সবুক্তগীন মাহমুদ সোহেল জানান, ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত মরদেহগুলো মর্গে সংরক্ষণ করা হবে। দগ্ধ ও বিকৃত মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষা নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি।
সদর হাসপাতালের আরএমও জানান, রবিবার সন্ধ্যায় নিহত ১০ জনের আলামত সংগ্রহ করে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশের উখিয়া তদন্ত ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপরিদর্শক ইমন ঘোষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ইমন ঘোষ এসব আলামত ঢাকার সিআইডি ডিএনএ ল্যাবে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করবেন।
এদিকে, নিহতদের স্বজনদের মধ্যে কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে পাওয়া চিহ্নের ভিত্তিতে পরিবারের সদস্যদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন।
এক স্বজন সামুশুদ্দোহা জানান, তার পরিবারের চারজনের মরদেহ মর্গে রয়েছে। তাদের মধ্যে একটি শিশুকে হাতে থাকা ব্রেসলেট দেখে শনাক্ত করতে পেরেছেন। অন্যদের পরিচয় নিশ্চিত হতে ডিএনএ পরীক্ষার ফলের অপেক্ষা করতে হবে। দ্রুত পরীক্ষা শেষ করে মরদেহ হস্তান্তরের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন স্বজনরা।
কক্সবাজারে ডিএনএ ল্যাব স্থাপনের দাবি
কক্সবাজারে ডিএনএ পরীক্ষার কোনো ল্যাব নেই। ভৌগোলিক কারণে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেলা কক্সবাজারে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য একটি ল্যাব স্থাপনের দাবি উঠেছে। বিশেষ করে শনিবারের টুপটুপ রিসোর্ট ট্র্যাজেডির পর ডিএনএ ল্যাবের কী রকম গুরুত্ব সেটা উপলব্ধি করছেন নিহত ১০ জনের স্বজনরা। ডিএনএ ল্যাব না থাকায় কক্সবাজারের ঘটনায় নিহতদের আলামত পাঠাতে হবে রাজধানী ঢাকার সিআইডি ল্যাবে। এত দীর্ঘ সময় ধরে মরদেহের দাফন-কাফনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এসব কারণে দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্রে কক্সবাজারে একটি ডিএনএ ল্যাব স্থাপনের দাবি উঠেছে।
বিষয়টি নিয়ে কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. ছাবের আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডিএনএ পরীক্ষার একমাত্র ব্যবস্থা রয়েছে ঢাকায় সিআইডির ল্যাবে। এ ছাড়াও আরো একটি ছোট পরিসরের পরীক্ষা করার ব্যবস্থা রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সম্প্রতি দেশের প্রতিটি বিভাগীয় সদরে ডিএনএ ল্যাব স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তবে কক্সবাজার গুরুত্বপূর্ণ জেলা হবার কারণে এখানেও একটি ডিএনএ ল্যাব স্থাপনের দরকার রয়েছে।’
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ইসিএ নীতিমালা সংশোধনের পক্ষে
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন কালের কণ্ঠকে জানান, মেরিন ড্রাইভ রোডে দেড় শতাধিক স্থাপনা রয়েছে। এসব স্থাপনা কউকের অনুমোদন ছাড়াই নির্মিত। ২০১৬ সাল থেকে কউক-এর কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর ইসিএর নীতিমালার কারণে কউক এসব স্থাপনা অনুমোদন দিতে পারেনি।
তিনি বলেন, ‘এসব অবৈধ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আমরা নোটিশ দেওয়া অব্যাহত রেখেছি। সামনে ভ্রাম্যমাণ আদালত কার্যক্রমও পরিচালনা করা হবে। সেই সঙ্গে ইসিএ নীতিমালা সংশোধন এবং পরিবর্তন করার জন্য কউক যথাযথভাবে ব্যবস্থা নেবে।’
তদন্ত কমিটির ঘটনাস্থল পরিদর্শন
অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও রিসোর্ট পরিচালনায় অনিয়ম খতিয়ে দেখতে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি রবিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহানের নেতৃত্বে কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেন এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন।
পরিদর্শন শেষে তাসনীম জাহান সাংবাদিকদের জানান, পুড়ে যাওয়া রিসোর্টটির ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল না। আগুনের সূত্রপাতের কারণ এবং অনুমোদন ছাড়া প্রতিষ্ঠান পরিচালনার বিষয়গুলো তদন্ত করা হচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটিকে এর আগে চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্টরা কার্যকর ব্যবস্থা নেননি। তদন্ত শেষে অনিয়মের বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।
উখিয়া থানায় মামলা দায়ের
টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রিসোর্ট মালিক তানভীর সুলতান ও তার ব্যবসায়িক অংশীদার নিয়াজ মোর্শেদ এবং ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে শনিবার রাতেই উখিয়া থানায় মামলা করা হয়েছে। গ্রেপ্তার রিসোর্ট ম্যানেজার সুমনকে রবিবার জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা যাচাইয়ের দাবি
দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারে পর্যটকদের নিরাপত্তা, আবাসন প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন এবং অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে গড়ে ওঠা রিসোর্টগুলোতে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে এমন দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঝুঁকি থেকেই যায়।
টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি, নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজ এবং মরদেহ শনাক্তে দীর্ঘ অপেক্ষা সব মিলিয়ে এক বেদনাদায়ক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এখন স্বজনদের প্রধান চাওয়া, দ্রুত ডিএনএ পরীক্ষা সম্পন্ন করে পরিচয় নিশ্চিত করা এবং প্রিয়জনের মরদেহ বুঝে নেওয়ার ব্যবস্থা করা। একই সঙ্গে পর্যটন এলাকায় সব আবাসিক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোরভাবে যাচাই করার দাবি উঠেছে।