☰
✕

জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিনিয়োগ আকর্ষণে জরুরি সংস্কারের আহ্বান ফরেন চেম্বারের

২০ অক্টোবর, ২০২৬

বাংলাদেশকে জ্বালানি খাতে আত্মনির্ভরশীল করতে এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে জরুরি সংস্কার, অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানিয়েছে ফরেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ফিকি)। একই সঙ্গে ব্যবসার খরচ কমানো এবং বিনিয়োগের পরিবেশ সহজ করতে আরো কার্যকর উদ্যোগের আহ্বান জানানো হয়। গতকাল সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে ফিকির আয়োজনে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে টেকসই বিদ্যুত্ ও জ্বালানি শীর্ষক এক আলোচনা অনুষ্ঠানে এ আহ্বান জানানো হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, এমপি। অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন ফিকির সভাপতি রূপালী চৌধুরী। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আন্তর্জাতিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়া-বিষয়ক প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা কাল বা পরশুই সব সমস্যার সমাধান করে ফেলব—এমন কথা বলে জনগণকে ভুল আশা দেওয়ার কোনো মানে হয় না। আমাদের অন্তত দুই বছর সময় প্রয়োজন। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম দুই বছরের মধ্যে জ্বালানি খাতসহ পুরো অর্থনীতিকে স্থিতিশীল পর্যায়ে আনা হবে। তৃতীয় বছরে অর্থনীতি গতি নেবে এবং চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে গিয়ে অর্থনীতি পূর্ণমাত্রায় ঘুরে দাঁড়াবে। এর চেয়ে ভালো বা চটজলদি কোনো আশা দেওয়াটা ভুল হবে, আর আমি তা করতে চাই না। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও জ্বালানি খাতের বাস্তবতা তুলে ধরে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুত্ এখন আর শুধু পৃথক খাত নয়, এটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান কেন্দ্রে অবস্থান করছে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর। আমরা দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় জ্বালানিসংকটের মুখোমুখি হয়েছি। তার ওপর যোগ হয়েছে আগের আমলের বিপুল পরিমাণ দেনা ও উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত দায়। তবে এসব উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সমস্যা নিয়ে বেশি কথা বলতে চাই না। কারণ, এসব কথা তুললেই মনে হয়, যেন কোনো অজুহাত খোঁজা হচ্ছে। সব দিকেই যে বিশাল ঘাটতি ছিল এবং তার ওপর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আমাদের পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করেছে, তা আমরা সবাই জানি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, দুর্ভাগ্যবশত, বর্তমানে আমাদের ব্যবসা পরিচালনার খরচ অনেক বেশি এবং ব্যবসা করার সহজলভ্যতার সূচকও বেশ নিম্নমুখী। আমরা দীর্ঘকাল ধরে একটি অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণনির্ভর দেশ হিসেবে চলেছি। এই অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা এখন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জ্বালানিসংকট নিরসনে সরকারের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা জানিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এক বা দেড় দশক ধরে আমরা নিজস্ব গ্যাস সম্পদ অনুসন্ধান করিনি। এটিই এখন আমাদের প্রধান কাজ। বাপেক্সকে দিয়ে ৫০টি নতুন কূপ খননের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং পিএসসি (প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্র্যাক্ট) চুক্তি চূড়ান্ত করা হচ্ছে। স্থলভাগ ও সমুদ্র—উভয় অঞ্চলেই (অফশোর ও অনশোর) অনুসন্ধান করা হবে। পাশাপাশি আমরা অন্তত ১০ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুত্ উত্পাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি। এর অংশ হিসেবে সৌরবিদ্যুতের অবকাঠামোর ওপর সব ধরনের কর ছাড় দেওয়া হয়েছে।

ব্যাংকিং খাতের প্রসঙ্গ টেনে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশ থেকে প্রায় ২৩৫ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়ে যাওয়ার কারণে ব্যাংক খাত ও পুঁজিবাজার মারাত্মক ধসের মুখোমুখি হয়েছিল। তবে বর্তমানে ব্যাংকিং খাত ঘুরে দাঁড়াচ্ছে এবং পুঁজিবাজারেও ইতিবাচক সংকেত দেখা যাচ্ছে। আমাদের পকেট থেকে ইতিমধ্যেই অতিরিক্ত সাত বিলিয়ন ডলার বেরিয়ে গেছে, সামনে আরো কী আসবে, তা জানা নেই।

মূল উপস্থাপনায় শফিকুল আলম সতর্ক করে বলেন, নতুন কোনো বড় ক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হলে ২০৩৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে। আমদানি নির্ভরতা কমাতে তিনি রুফটপ সোলার (ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুত্), সেচে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার, শিল্পে জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক জলবিদ্যুত্ সহযোগিতার ওপর জোর দেন। রূপালী হক চৌধুরী বলেন, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা বাংলাদেশের শিল্প খাতকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলেছে। কেবল সরবরাহ নিশ্চিত করাই নয়, বরং সাশ্রয়ী ও টেকসই জ্বালানি নিশ্চিত করার ওপর তাগিদ দেন তিনি।

অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন শেভরন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শুজিওং, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ম তামিম, বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ ও এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক। প্যানেল আলোচনা সঞ্চালনা করেন এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. মাহবুব উর রহমান। অধ্যাপক ড. ম. তামিম স্থানীয় গ্যাস উত্পাদন ও নবায়নযোগ্য শক্তির মধ্যে ভারসাম্য আনার সুপারিশ করেন। ফজলুল হক জ্বালানি সংকটে শিল্প উত্পাদন ব্যাহত হওয়ার কথা উল্লেখ করে গ্রিন ফাইন্যান্সিং বা সবুজ অর্থায়নের দাবি জানান।