২২ অক্টোবর, ২০২৬
সুদান ও মিসর সীমান্তে স্বর্ণখনিশ্রমিকদের ওপর মিসরের বিমান হামলায় বহু মানুষের মৃত্যুর কয়েক দিন পরও শোক ও আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে পারেননি বেঁচে যাওয়া শ্রমিকেরা। তবু জীবিকার আর কোনো পথ না থাকায় তাদের অনেকে আবারও খনিতে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
২৬ বছর বয়সী শরাফ আল-দিন আলী এএফপিকে বলেন, ‘আমাকে আমার স্বর্ণ আনতে যেতে হবে।’
হামলায় নিহত তার বন্ধুকে অন্তত আরও দুই ডজন মানুষের সঙ্গে একটি অগভীর কবরে দাফন করার কয়েক দিন পর তিনি এ কথা বলেন।
সীমান্তের দক্ষিণে একটি যাত্রাবিরতি কেন্দ্রে বসে কথা বলছিলেন আলী। সেখান থেকে একটি ট্রাকে করে জাবাল আল-উকাইদাতের খনিতে শেষবারের মতো যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন তিনি।
আলী বলেন, ‘এরপর আর ফিরব না। কিন্তু স্বর্ণখনির কাজও ছাড়তে পারছি না।’
২০২৩ সালের এপ্রিলে সুদানের সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে কলেজের পড়াশোনা ছেড়ে দেন আলী।
এরপর তার মতো লাখ লাখ মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ স্বর্ণ উত্তোলনের কাজে জড়িয়ে পড়েছেন। এই স্বর্ণের ব্যবসা সুদানের চলমান সংঘাতের দুই পক্ষকেই অর্থ জোগাচ্ছে। উত্তোলিত স্বর্ণের প্রায় সবটাই সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাজারে যায়, যার বড় একটি অংশ প্রথমে মিসর হয়ে পরিবাহিত হয়।
সুদান-মিসর সীমান্তের বিস্তীর্ণ ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হাজার হাজার মানুষ স্বর্ণ উত্তোলনের কাজে জড়ো হয়েছিলেন। ১০ অক্টোবর ২৯ বছর বয়সী আলী মোহাম্মদ হামদান সহকর্মীদের সঙ্গে চা পান করছিলেন। এ সময় আকাশে একটি উড়োজাহাজ চক্কর দিতে শুরু করে।
পরে পূর্ব সুদানে নিজের বাড়িতে ফিরে সামান্য আহত অবস্থায় চিকিৎসা নেওয়ার সময় এএফপিকে হামদান বলেন, ‘উড়োজাহাজটি তিনবার চক্কর দেয়। চতুর্থবারে এসে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে।’
সুদানের মানবাধিকার সংগঠন ‘ইমার্জেন্সি লইয়ার্স’ জানিয়েছে, ওই বিমান হামলায় অন্তত ৭২ জন নিহত হয়েছেন। সংগঠনটি হামলার জন্য মিসরের সামরিক বাহিনীকে দায়ী করেছে। তবে মিসর জানিয়েছে, তাদের ভূখণ্ডের ভেতরে অবৈধ স্বর্ণ উত্তোলনকারীদের লক্ষ্য করে অভিযান চালানো হয়েছিল।
নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এখনো শত শত খনিশ্রমিকের খোঁজ পাওয়া যায়নি। নিখোঁজদের মধ্যে অনেক শিশু রয়েছে।
হামদানের ছোট শহর ওয়াদ আল-হুলায়ওয়াহ থেকেই ১১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
ইথিওপিয়া সীমান্তের কাছে কৃষিনির্ভর এই গ্রামে এএফপির সাংবাদিকেরা হামলা থেকে বেঁচে ফেরা কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছেন। সেখানে তাঁদের দেখা হয়েছে এমন সব পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে, যাদের ছেলেরা আর কখনো বাড়ি ফিরবেন না।
হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া আরেক শ্রমিক ওমর মুহিউদ্দিন বলেন, উড়োজাহাজটি দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেলে প্রথমে সবাই স্বস্তি পেয়েছিলেন।
তিনি বলেন, ‘এক-দুই দিন পরপরই উড়োজাহাজগুলো আসত। তাই মানুষ অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। সেটি উত্তরের দিকে চলে গেলে সবাই ভেবেছিল, চলে গেছে।’
কিন্তু কয়েক মিনিট পর উড়োজাহাজটি আবার ফিরে আসে। মুহিউদ্দিনের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি সেটির গায়ে ‘মিসরের পতাকা’ দেখতে পেয়েছিলেন।
প্রথম বিস্ফোরণের সময় হামদান ও তার আরও তিন সহকর্মী একটি গর্তে ঝাঁপ দিয়ে আশ্রয় নেন। পরে সেখান থেকে বেরিয়ে তিনি দেখতে পান, তার এক সহকর্মীর শরীরের ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বাইরে বেরিয়ে এসেছে।
এক সপ্তাহ ধরে গ্রামটিতে শোকের পরিবেশ বিরাজ করছে। সাদা জেলাবিয়া পরা পুরুষেরা দল বেঁধে পাশাপাশি বসে আছেন। তাদের মুখে ক্লান্তি, শোক ও আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট।
চলতি মাসের এই হামলা সুদান ও মিসরের মধ্যবর্তী বিস্তীর্ণ খনিজসম্পদসমৃদ্ধ পাহাড়ি এলাকায় ঘটেছে। এই অঞ্চলের মধ্যে হালায়েব ত্রিভুজও রয়েছে, যা দুই দেশই নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে। বর্তমানে এলাকাটি মিসরের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
অবৈধ স্বর্ণ উত্তোলন ও মানব পাচার বন্ধ করতে মিসর চলতি বছর দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় মরুভূমিতে সামরিক অভিযান শুরু করেছে। এর আগে জুনে মিসরের প্রথম বিমান হামলায় ২৩ জন খনিশ্রমিক নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছিল।
সর্বশেষ হামলার পর আহতদের কাঁধে বা বহন করে কয়েক ঘণ্টা হেঁটে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে হয়েছে বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের।
সীমান্তের কাছে একটি ছোট ক্লিনিকের এক চিকিৎসক এএফপিকে বলেন, অন্যদের অনেকে খাবার ও পানি ছাড়াই রাস্তার পাশে মারা গেছেন।
চিকিৎসক বলেন, ‘সেই দৃশ্য ভাষায় বর্ণনা করা অসম্ভব। মানুষ এখানে এসেছে ছিন্নভিন্ন অবস্থায়। কারও চোখ, মাথা, পা ও বুকে শ্রাপনেলের আঘাত ছিল। সবচেয়ে গুরুতর আহত কয়েকজন পরিবহনের ব্যবস্থা না থাকায় আমাদের কাছে পৌঁছাতেই পারেননি।’
১৯ বছর বয়সী তারেক আহমেদ ঈসা হামলার পর অন্যদের সঙ্গে পাহাড়ের উঁচু ঢালে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
পরে নিচে নেমে তিনি চারদিকে লাশ পড়ে থাকতে দেখেন।
ঈসা বলেন, ‘আমরা মৃতদের দাফন করেছি, তবে আরও অনেকের লাশ খুঁজে পাইনি।’
এখনো ওই এলাকায় অবস্থান করছেন তিনি। চার মাসের পরিশ্রমে উত্তোলন করা স্বর্ণ নিকটতম বাজারে নিয়ে বিক্রি করার উপায় খুঁজছেন।
তিনি বলেন, ‘ট্রাকের সংখ্যা খুবই কম। যেগুলো আসে, সেগুলোর ভাড়াও দ্বিগুণ।’
সুদানের যুদ্ধ দেশটির তরুণদের জীবিকার পথ সংকুচিত করে দিয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী প্রায় আড়াই কোটি মানুষের এই দেশে ৮০ লাখ শিশু-কিশোর বিদ্যালয়ের বাইরে। জীবিকা অর্জনের জন্য অনেকের সামনে এখন প্রধানত দুটি পথ—দেশটির বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীতে যোগ দেওয়া অথবা স্বর্ণের খনিতে কাজ করা।
বহু কোটি ডলারের স্বর্ণশিল্পটি নির্ভর করছে লাখ লাখ মানুষের ওপর, যারা কোনো আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়াই খালি হাতে ঝুঁকিপূর্ণ খনি থেকে স্বর্ণ উত্তোলন করেন।
খনি ধসে চাপা পড়া কিংবা বিমান হামলা থেকে বেঁচে গেলেও তাদের সামনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি। স্বর্ণ পরিশোধনে ব্যবহৃত পারদ ও সায়ানাইডের সংস্পর্শে এসে তারা নানা রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। এত ঝুঁকি নিয়েও শেষ পর্যন্ত স্থানীয় বাজারে বিশ্ববাজারের তুলনায় অনেক কম দামে স্বর্ণ বিক্রি করতে হয় তাদের।
হামলায় নিজের ছেলে ও ভাতিজাকে হারিয়েছেন ওমর আবদেলরাজিগ আবদাল্লা।
তিনি বলেন, ‘স্বর্ণ বিক্রি হওয়ার পর সবাই সেখান থেকে ভাগ নেয়। নিজের অংশটুকু হাতে পাওয়ার আগে ট্রাকের মালিক, পরিশোধনাগারের মালিকসহ আরও অনেককে টাকা দিতে হয়।’
পাহাড়ে আশ্রয় নেওয়া কিশোর ঈসারও ফিরে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ আমাদের কৃষিকাজ ও গবাদিপশু—সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখতে আমাকে কাজ চালিয়ে যেতে হবে।’