☰
✕

নেতানিয়াহু-আইজেনকটের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই, ইসরাইলের নির্বাচনে কে এগিয়ে?

২৭ অক্টোবর, ২০২৬

ইসরাইলের গুরুত্বপূর্ণ এক নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে জনমত জরিপে। তবে কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে নির্বাচনের পর সরকার গঠন নিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক দর-কষাকষির আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) জেরুজালেমে ভোট দিয়েছেন ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ ও তার স্ত্রী মিখাল। নির্বাচনে অংশ নিতে বিদেশ থেকে প্রায় ৭০ হাজার ইসরাইলি দেশে ফিরেছেন বলে খবরে বলা হয়েছে। এ ছাড়া এবার প্রায় পাঁচ লাখ ভোটার প্রথমবারের মতো ভোট দিচ্ছেন।

শুক্রবার প্রকাশিত জনমত জরিপ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লড়াইয়ে নেতানিয়াহু ও আইজেনকটের অবস্থান প্রায় সমান। তবে কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে না। ফলে সরকার গঠনের জন্য কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাস ধরে আলোচনা চলতে পারে।

ইসরাইলের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক নির্বাচনি ব্যবস্থায় সাধারণত একাধিক দলের সমন্বয়ে জোট সরকার গঠিত হয়। অতীতেও ক্ষমতায় যেতে আদর্শগতভাবে ভিন্ন অবস্থানে থাকা দলগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে দেখা গেছে। তবে এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন দল নিজেদের অবস্থান ও আপসের সীমারেখা স্পষ্ট করে দিয়েছে।

নেতানিয়াহুবিরোধী জোটের নেতৃত্বে আইজেনকট

নতুন গঠিত ইয়াশার পার্টির নেতা আইজেনকটকে নেতানিয়াহুবিরোধী ‘পরিবর্তনপন্থী জোটের’ প্রধান মুখ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই জোটে আদর্শগতভাবে ভিন্ন কয়েকটি দল রয়েছে। তবে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর বিষয়ে তারা একমত।

জোটের অন্য গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট, আভিগদর লিবারম্যান ও বামঘেঁষা সাবেক সেনা কর্মকর্তা ইয়ার গোলান। বেনেট ও লিবারম্যান দুজনই ডানপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং নিরাপত্তার প্রশ্নে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত।

অন্যদিকে, ইসরাইলের দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী নেতা নেতানিয়াহু প্রথমবারের মতো ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হন। এবারও ক্ষমতায় ফিরতে হলে তাকে উগ্র ডানপন্থী ও অতি-রক্ষণশীল ইহুদি দলগুলোর সঙ্গে জোট গড়তে হবে। তার নেতৃত্বাধীন বর্তমান জোটকে ইসরাইলের ইতিহাসের সবচেয়ে ডানপন্থী সরকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

নির্বাচনে আরবদের দুটি দলীয় জোটও অংশ নিচ্ছে। ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব। তাদের অনেকে নিজেদের ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরাইলি নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেন।

নির্বাচনের ফল নির্ধারণে আরব দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে নেতৃস্থানীয় ইহুদি দলগুলোর মধ্যে মাত্র একটি ছাড়া অন্যরা আরব দলগুলোর সঙ্গে কাজ করতে অনিচ্ছুক বলে জানা গেছে।

ভোট-পরবর্তী জরিপে মিলবে প্রাথমিক ধারণা

মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাত ১০টায়, আন্তর্জাতিক মান সময় অনুযায়ী রাত ৮টায়, ইসরাইলি সম্প্রচারমাধ্যমগুলো ভোট-পরবর্তী জরিপের ফল প্রকাশ করবে। এসব জরিপ থেকে নির্বাচনের সম্ভাব্য ফল সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যাবে। তবে জরিপের ফলের সঙ্গে প্রকৃত ভোটের হিসাবের উল্লেখযোগ্য পার্থক্যও থাকতে পারে।

ফল পর্যবেক্ষণ করতে বিভিন্ন শহরে সমবেত হবেন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি জেরুজালেমে ফল দেখার আয়োজন করবে। অন্যদিকে, গত বছর গঠিত আইজেনকটের ইয়াশার পার্টির নেতাকর্মীরা তেল আবিবে জড়ো হবেন।

ইসরাইলের কয়েক লাখ সেনাসদস্য ও সংরক্ষিত বাহিনীর সদস্যও ভোট দেবেন। তবে তাদের অনেকের ভোট গণনা বুধবারের আগে শুরু হবে না। সেনাসদস্যদের মধ্যে ডানপন্থী দলগুলোর সমর্থন তুলনামূলক বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে তাদের ভোটের হিসাব নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।

নিরাপত্তা ও ৭ অক্টোবরের হামলা নির্বাচনের বড় ইস্যু

নির্বাচনি প্রচারে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে নিরাপত্তা। বিরোধী জোটের নেতারা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলে চালানো হামলার আগে নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতার জন্য নেতানিয়াহুকে দায়ী করছেন। ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়।

হামলার ঘটনা তদন্তে স্বাধীন কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন বিরোধীরা। তবে নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের কমিশন গঠনের বিরোধিতা করে আসছেন। তার আশঙ্কা, তদন্তে তার বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক অবস্থান নেওয়া হতে পারে।

বিরোধীদের অভিযোগ, নেতানিয়াহুর শাসনামলে ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোও চাপে পড়েছে। দুর্নীতির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিচার চলছে। তবে নেতানিয়াহু এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এ ছাড়া বিচারব্যবস্থায় বিতর্কিত সংস্কার আনার পরিকল্পনা নিয়েও দেশটিতে ব্যাপক বিরোধিতা রয়েছে। ৭ অক্টোবরের হামলার আগে এ পরিকল্পনার বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছিল।

সমালোচনার মুখেও নেতানিয়াহু নিজেকে দেশের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত নেতা হিসেবে তুলে ধরছেন। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের সামরিক অভিযানে কৌশলগত সাফল্যের কথা বলার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে নিজের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টিও সামনে আনছেন তিনি।

রোববার ইসরাইলের চ্যানেল ১২-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনের আগে ইরানের সঙ্গে নতুন করে সংঘাতের সূত্রপাত হতে পারে—এমন একটি সামরিক অভিযান চালাতে শেষ মুহূর্তে চাপ দিয়েছিলেন নেতানিয়াহু। তবে দেশটির সেনাপ্রধান আইয়াল জামির এতে আপত্তি জানান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

পরদিন সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানে নতুন করে হামলার বিষয়ে ট্রাম্পকে রাজি করানোর চেষ্টা করেছিলেন নেতানিয়াহু। তবে ট্রাম্প এতে সম্মতি দেননি বলে খবরে জানানো হয়। নেতানিয়াহু অবশ্য দুটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্যই অস্বীকার করেছেন।

নির্বাচনি প্রচারের শেষ দিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি একটি ছবি প্রকাশ করেও আলোচনায় আসেন নেতানিয়াহু। ছবিতে তেল আবিবে পারমাণবিক বোমা আঘাত হানার দৃশ্য দেখানো হয়। এর মাধ্যমে তিনি সতর্ক করেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করলে ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবেন একমাত্র তিনিই। জবাবে আইজেনকট তাকে ‘আতঙ্কগ্রস্ত’ বলে আখ্যা দেন।

সামরিক নিয়োগ নিয়েও বিতর্ক

নির্বাচনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু অতি-রক্ষণশীল ইহুদি পুরুষদের বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের একটি রায় বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে নেতানিয়াহুর সরকার। ওই রায়ে পূর্ণকালীন ধর্মীয় শিক্ষায় নিয়োজিত অতি-রক্ষণশীল ইহুদি পুরুষদেরও সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতার কথা বলা হয়েছিল।

সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলোতে হাজার হাজার ইসরায়েলিকে সামরিক দায়িত্ব পালনের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অতি-রক্ষণশীল ইহুদি পুরুষদের একটি বড় অংশকে সামরিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলছে।

গাজা ও পশ্চিম তীর নিয়ে আইজেনকটের অবস্থান

গাজা নিয়ে আইজেনকটের অবস্থান অনেকাংশে নেতানিয়াহুর অবস্থানের কাছাকাছি। আগামী ১৮ মাসের মধ্যে গাজায় হামাসের শাসনের অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন শান্তি পরিকল্পনার মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন করতে চান আইজেনকট। তবে প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের পথও খোলা রাখতে চান তিনি।

গত বছর যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পরও গাজায় প্রায় প্রতিদিন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। দেশটির দাবি, এসব হামলায় হামাসের সদস্যদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। 

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনের প্রশ্নেও আইজেনকটের অবস্থান মোটামুটি সমর্থনমূলক। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এসব বসতি অবৈধ। তবে বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে তিনি। জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি বসতিস্থাপনকারীদের হামলা নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে।

ফিলিস্তিনিদের জন্য স্বায়ত্তশাসন অথবা সীমিত ক্ষমতাসম্পন্ন রাষ্ট্র গঠনের পরিবেশ তৈরির কথাও বলেছেন আইজেনকট। তবে তার প্রস্তাবে চূড়ান্ত নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ ইসরাইলের হাতেই রাখার কথা বলা হয়েছে।

ইসরাইলের মূলধারার রাজনীতিতে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের ধারণা এখন অনেকটাই কোণঠাসা। এই সমাধানের লক্ষ্য হলো, ইসরাইলের পাশাপাশি একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, যাতে দুই রাষ্ট্র শান্তিপূর্ণভাবে পাশাপাশি অবস্থান করতে পারে।

জোট গঠন নিয়ে জটিল সমীকরণ

নির্বাচনের পর আরব দলগুলো সরাসরি সরকারে যোগ না দিয়েও আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন সংখ্যালঘু সরকারকে সমর্থন দিতে পারে বলে ধারণা করছেন কেউ কেউ। তবে সম্ভাব্য জোটসঙ্গী লিবারম্যান এ ধরনের ব্যবস্থায় অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন।

এমন অনড় অবস্থানের কারণে নির্বাচনের আসনভিত্তিক সমীকরণ আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ভোটের ফল প্রকাশের পর কোন দল কতটা ছাড় দেবে এবং কী ধরনের সমঝোতা হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

নেতানিয়াহু ও আইজেনকটকে ঘিরে এবারের নির্বাচনকে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখা হলেও অন্য কোনো নেতারও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ রয়েছে। জোট সরকার গঠনের আলোচনায় কোনো দলের নেতা প্রধানমন্ত্রী পদের দাবি জানালে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, কোনো পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে। সংখ্যালঘু সরকার গঠনের পথও বন্ধ হয়ে গেলে নতুন করে নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। তত দিন নেতানিয়াহু অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

ইসরাইলে এমন রাজনৈতিক অচলাবস্থা নতুন নয়। ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দেশটিতে পাঁচবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। রাজনৈতিক দলগুলো বারবার চেষ্টা করেও সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারায় একের পর এক নির্বাচনের আয়োজন করতে হয়েছিল। এবারের নির্বাচনেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।