☰
✕

ইঁদুরের মস্তিষ্কে মানুষের স্নায়ুকোষ, কী বলছে নতুন গবেষণা

০৭ নভেম্বর, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার একটি গবেষণাগারে খাঁচার মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ছোটাছুটি করছে একদল ইঁদুর। বাইরে থেকে তাদের আচরণে বিশেষ কোনো পার্থক্য চোখে পড়ে না। কিন্তু তাদের মস্তিষ্কের ভেতরে রয়েছে লাখ লাখ সক্রিয় মানব স্নায়ুকোষ। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা পরীক্ষাগারে তৈরি মানুষের মস্তিষ্কের কোষ ইঁদুরের মস্তিষ্কে প্রতিস্থাপন করে এই নতুন ধরনের প্রাণী তৈরি করেছেন। গবেষকেরা এর নাম দিয়েছেন ‘এলিয়েন-কর্টিক্যাল মাউস’।

নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, মানুষের মস্তিষ্কের কোষযুক্ত এই ইঁদুর স্নায়ুকোষের পারস্পরিক সংযোগ এবং মস্তিষ্কের বিভিন্ন রোগ নিয়ে গবেষণার নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে সিজোফ্রেনিয়া, সেরিব্রাল পালসি ও ডিমেনশিয়ার মতো রোগ বোঝার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

প্রাণীর মস্তিষ্কে মানুষের মস্তিষ্কের টিস্যু প্রতিস্থাপনের বিষয়টি শুনতে মেরি শেলির বিখ্যাত উপন্যাস ফ্রাংকেনস্টাইনের মতো মনে হতে পারে। তবে প্রশ্ন হলো, এসব ইঁদুর কতটা মানুষের বৈশিষ্ট্য ধারণ করছে? আর এই পরীক্ষায় কী পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা?

যেভাবে তৈরি করা হলো ইঁদুরগুলো

গবেষকেরা প্রথমে জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে এমন ইঁদুর তৈরি করেন, যাদের মস্তিষ্কে সেরিব্রাল কর্টেক্সের অধিকাংশ অংশ এবং এর পাশের হিপোক্যাম্পাস অনুপস্থিত থাকে। সেরিব্রাল কর্টেক্স মস্তিষ্কের বাইরের স্তর। উপলব্ধি, চলাফেরা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও মনোযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ন্ত্রণে এর ভূমিকা রয়েছে। অন্যদিকে, শেখা ও স্মৃতির জন্য হিপোক্যাম্পাস গুরুত্বপূর্ণ।

ইঁদুরগুলোর বয়স যখন মাত্র দুই দিন, তখন গবেষকেরা তাদের মস্তিষ্কের ফাঁকা জায়গায় মানুষের তৈরি বিশেষ কোষপুঞ্জ প্রতিস্থাপন করেন। এগুলোকে বলা হয় ‘অর্গানয়েড’। মানুষের স্টেম সেল বা টিউমার টিস্যু থেকে পরীক্ষাগারে এসব ক্ষুদ্র কোষপুঞ্জ তৈরি করা হয়। এগুলো দেখতে ও কাজের ধরনে মানব অঙ্গের ক্ষুদ্র সংস্করণের মতো।

প্রতিটি অর্গানয়েড তৈরি করা হয়েছিল সুস্থ মানুষের স্টেম সেল থেকে। একেকটিতে ছিল প্রায় এক লাখ মানব কোষ।

এই পরীক্ষায় ইঁদুরের মস্তিষ্ক থেকে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ স্নায়ুকোষ সরিয়ে সেখানে প্রায় ৪০ লাখ মানব স্নায়ুকোষ প্রতিস্থাপন করা হয়।

গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন, এটি মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপনের কোনো পরীক্ষা নয়। এসব ইঁদুর মানুষের মতো চিন্তা করতে পারে, এমন দাবিও তারা করেননি।

মোট ২৯টি ইঁদুরের ওপর এই পরীক্ষা চালানো হয়। এর মধ্যে ২৫টির ক্ষেত্রে প্রতিস্থাপন সফল হয়।

মস্তিষ্কে বেড়েছে মানব কোষ, উন্নতি শেখার ক্ষমতায়

প্রতিস্থাপনের তিন মাসের মধ্যে ইঁদুরের মস্তিষ্কে মানুষের কোষগুলো প্রায় পাঁচ গুণ বড় হয়ে যায়। এগুলো ইঁদুরের রক্ত সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয় এবং মস্তিষ্কের ফাঁকা জায়গার ৯০ শতাংশের বেশি পূরণ করে।

মানব টিস্যু ইঁদুরের মস্তিষ্কের মোট আয়তনের প্রায় অর্ধেকজুড়ে ছড়িয়ে পড়লেও প্রাণীগুলোর স্বাভাবিক চলাফেরা ও ডাকাডাকিতে বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।

গবেষকেরা ইঁদুরগুলোকে গোলকধাঁধার মতো একটি পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে নেন। এতে দেখা যায়, যেসব ইঁদুরের মস্তিষ্কে মানুষের কোষ প্রতিস্থাপন করা হয়নি, সেগুলো বারবার পথ হারিয়েছে। অন্যদিকে, মানব কোষ প্রতিস্থাপন করা ইঁদুরগুলো তুলনামূলক ভালো করেছে। গবেষকদের ধারণা, মানুষের কোষ ইঁদুরগুলোর চিন্তাভাবনা ও শেখার সক্ষমতায় ভূমিকা রেখেছে।

পরীক্ষায় আরেকটি অপ্রত্যাশিত বিষয় সামনে আসে। প্রতিস্থাপিত মানব টিস্যুর কিছু কোষ বিশেষ ধরনের স্নায়ুকোষে পরিণত হয়। এগুলোকে বলা হয় ‘ভন ইকোনোমো নিউরন’। এ ধরনের স্নায়ুকোষ লম্বা ও বিরল। সাধারণত ইঁদুরের মস্তিষ্কে এগুলো থাকে না। পরীক্ষাগারেও এ ধরনের কোষ তৈরি করা প্রায় অসম্ভব।

মানুষ ছাড়াও বনমানুষ, তিমি ও হাতির মতো সামাজিক প্রাণীর মস্তিষ্কে এসব স্নায়ুকোষ পাওয়া যায়।

সেরিব্রাল পালসি গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা

এই পরীক্ষা সেরিব্রাল পালসি নিয়েও গবেষণার নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। শিশুদের মস্তিষ্কে অক্সিজেনের অভাবসহ বিভিন্ন জটিলতার কারণে এ রোগ হতে পারে। মানুষের ক্ষেত্রে দীর্ঘ ও জটিল প্রসবের সময় এ ধরনের জটিলতার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে, ইঁদুরের বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা খুব কম ঘটে। এ কারণে ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে সেরিব্রাল পালসি নিয়ে গবেষণা করা এত দিন কঠিন ছিল।

এবারের পরীক্ষায় জিনগত পরিবর্তন করা ইঁদুরগুলোকে কম অক্সিজেনের পরিবেশে রাখা হয়। এতে তাদের মস্তিষ্কে ক্ষতি দেখা যায়। পাশাপাশি তাদের হাঁটার ধরন বদলে যায় এবং হাত-পায়ের সমন্বয় করার ক্ষমতা কমে যায়।

গবেষকদের মতে, এসব পরিবর্তন সেরিব্রাল পালসির কিছু বৈশিষ্ট্য বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।

কেন ইঁদুরের মস্তিষ্কে মানুষের কোষ?

মানুষের মস্তিষ্কের রোগ নিয়ে গবেষণা করা বিজ্ঞানীদের জন্য অন্যতম কঠিন কাজ। মানব মস্তিষ্কে প্রায় ৮৬০০ কোটি স্নায়ুকোষ রয়েছে। এসব কোষের মধ্যে সংযোগের সংখ্যা ট্রিলিয়ন বা লাখ কোটি ছাড়িয়ে যায়। মস্তিষ্কের এই জটিল গঠন এবং জীবিত মানুষের মস্তিষ্কের টিস্যু নিয়ে গবেষণার নৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত সীমাবদ্ধতার কারণে সরাসরি গবেষণার সুযোগ খুবই কম।

এ কারণে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষাগারে মানুষের মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র কোষপুঞ্জ বা অর্গানয়েড তৈরির চেষ্টা করছেন। এগুলোতে মানুষের স্নায়ুকোষ থাকে। তবে অর্গানয়েডকে পূর্ণাঙ্গ মস্তিষ্ক বলা যায় না। জীবন্ত মস্তিষ্কের মতো জটিল সংযোগ, বিভিন্ন ধরনের সংকেত গ্রহণ এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার সুযোগ এগুলোতে নেই।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা ও আচরণবিজ্ঞানের অধ্যাপক সেরগিউ পাসকা এই গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক। তিনি বলেন, মানুষের মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি অভূতপূর্ব অন্তর্দৃষ্টি পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

পাসকার ভাষ্য, গত দুই দশক ধরে মানবদেহের বাইরে মানুষের মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালি অনুকরণ করে এমন মডেল তৈরির চেষ্টা চলছে। নতুন এই পদ্ধতি আগের মডেলগুলোর বিকল্প হবে না। তবে মানুষের মস্তিষ্কের এমন কিছু কার্যক্রম বোঝার সুযোগ দেবে, যা অন্য উপায়ে গবেষণা করা খুব কঠিন।

মানব-প্রাণী সংকর তৈরির নৈতিক প্রশ্ন

মস্তিষ্কের অর্গানয়েড নিয়ে গবেষণা যত এগোচ্ছে, ততই এ ধরনের পরীক্ষার জন্য স্পষ্ট নীতিমালা ও নজরদারির দাবি বাড়ছে। কারণ, মানুষের শরীরের বাইরে তৈরি কোষপুঞ্জ বা মস্তিষ্কের টিস্যু কোনো ধরনের অনুভূতি কিংবা চেতনা অর্জন করতে পারে কি না, তা নিয়ে নৈতিক প্রশ্ন রয়েছে। এমন সক্ষমতা তৈরি হলে তা বৈজ্ঞানিকভাবে কীভাবে যাচাই করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

গবেষকেরা ইঁদুরের মস্তিষ্কে প্রতিস্থাপন করা মানব স্নায়ুকোষের বয়স ছয় মাস হওয়ার আগেই পরীক্ষা বন্ধ করে দেন। এর উদ্দেশ্য ছিল, মানব কোষগুলো যেন ইঁদুরের মস্তিষ্কের সঙ্গে আরো বেশি স্নায়বিক সংযোগ তৈরি করতে না পারে। পাশাপাশি চেতনা বা সচেতনতার কোনো লক্ষণ দেখা দেওয়ার আগেই তাঁরা পরীক্ষা থামিয়ে দেন।

এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ডিয়েগোর সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক জন ইভান্স। তার মতে, এই পরীক্ষা নিজে থেকে বড় ধরনের নৈতিক সংকট তৈরি করে না। তবে এটি এমন কিছু সম্ভাবনার প্রমাণ দেয়, যার ভিত্তিতে ভবিষ্যতে আরো বেশি নৈতিক জটিলতা তৈরি করতে পারে—এমন প্রাণী সৃষ্টি করা সম্ভব হতে পারে।

ইভান্সের মতে, এ ধরনের গবেষণার ক্ষেত্রে কোথায় থামতে হবে, তা নির্ধারণ করা কঠিন। ইঁদুরের মতো প্রাণী থেকে শুরু করে একপর্যায়ে অমানব প্রাইমেট বা মানুষ ছাড়া অন্যান্য উচ্চ বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন প্রাইমেটের ওপর গবেষণা চালানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এই ধাপে ধাপে এগোনোর প্রক্রিয়ায় কোথায় স্পষ্ট সীমারেখা টানা হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।

এ কারণে আপাতত ইঁদুরসহ তীক্ষ্ণদন্তী প্রাণীর মধ্যেই এ ধরনের গবেষণা সীমাবদ্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছেন ইভান্স। তার আশঙ্কা, এর বাইরে গবেষণা এগোলে মানুষের ও প্রাণীর বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে তৈরি স্নায়বিক সংকর প্রাণীর উদ্ভব হতে পারে। তখন তা বড় ধরনের নৈতিক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।