০৫ ডিসেম্বর, ২০২৪
মানুষের জ্ঞানের প্রধান উৎস তিনটি। অভিজ্ঞতা, বুদ্ধি ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য শক্তি। অভিজ্ঞতা মানবীয় জ্ঞানের অন্যতম উৎস। বর্তমানের বিস্ময়কর মানবসভ্যতা বহুলাংশে অভিজ্ঞতার ফসল।
এ অভিজ্ঞতা আহরিত জ্ঞানের একটি সীমাবদ্ধতা আছে। মানুষের অভিজ্ঞতা কোনো একক সত্যের দাবি করতে পারে না। স্থান, কাল, পাত্রভেদে এর ভিন্ন ভিন্ন রূপ হয়ে থাকে। মানবীয় অভিজ্ঞতায় অনেক সময় ভুলভ্রান্তি থাকে।
এ ছাড়া দেশ, কাল ও পরিবেশ-পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানবীয় জ্ঞান অচল মুদ্রায় পরিণত হয়। সে অভিজ্ঞতা ব্যক্তি, দল, জাতি বা জাতীয় সংসদের যারই হোক না কেন, এর ফলে জাতীয় সংসদে রচিত আইন ও সংবিধানের সংশোধনী আনতে হয়। কাজেই অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান চূড়ান্ত ও অভ্রান্ত নয়। মানবীয় জ্ঞানের দ্বিতীয় উৎস হলো ইন্দ্রিয় শক্তি।
এর মাধ্যমে মানুষ অনেক জ্ঞান লাভ করতে পারে। এই ইন্দ্রিয় শক্তির পরিধি ও ক্ষমতার মধ্যে একটি সীমাবদ্ধতা আছে। এ ছাড়া অনিবার্য কোনো কারণেও মাধ্যমটির বিকৃতি ঘটতে পারে। যেমন—দেহে জ্বর উঠলে মিষ্টি লাগে তেতো, সর্দি হলে নাকে কোনো গন্ধ পাওয়া যায় না, জন্ডিস হলে রোগী চারদিক হলুদ দেখে (চোখ)। কাজেই ইন্দ্রিয় শক্তিও নির্ভুল জ্ঞানের মাধ্যম নয়।
মানবীয় জ্ঞানের তৃতীয় উৎস হলো মানুষের বুদ্ধি। তবে এ মাধ্যমটিরও সীমাবদ্ধতা আছে। সীমার বাইরে এর কোনো ক্ষমতা নেই। মানবীয় বুদ্ধি সবার সমান নয়। আর মানবীয় বুদ্ধি কোনো একক সত্যের দাবি করতে পারে না। এ ছাড়া অনেক কারণে মানবীয় বুদ্ধি লোপ পেতে পারে (শারীর বৃত্তীয় কারণ, বয়স... ইত্যাদি)।
সুতরাং মানবীয় জ্ঞানের প্রতিটি মাধ্যমে দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা আছে। অভিজ্ঞতার দ্বারা যে জ্ঞান অর্জন করা যায়, তা ইন্দ্রিয় শক্তির দ্বারা অর্জন করা যায় না। বুদ্ধি দিয়ে যে জ্ঞান অর্জন করা যায়, তা ইন্দ্রিয় শক্তি ও অভিজ্ঞতা দিয়ে অর্জন করা যায় না। যেমন—একটি আম মিষ্টি না টক, তা বুদ্ধি বা অভিজ্ঞতা দিয়ে জানা যায় না। এ জ্ঞান দান করে ইন্দ্রিয় শক্তি। কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ, কী করণীয়, কী বর্জনীয় তা দান করতে পারে মানবীয় বুদ্ধি। এটি ইন্দ্রিয় শক্তি দিয়ে হয় না। অতীত সম্পর্কে কোনো ধারণা বা বুদ্ধি ইন্দ্রিয় শক্তি দিতে পারে না। তা দিতে পারে মানবীয় অভিজ্ঞতা।
আসলে মানবীয় জ্ঞানে আছে অনেক ভুল, বিভ্রান্তি ও সীমাবদ্ধতা। এর মাধ্যমে যে জ্ঞান অর্জিত হয় তাতে আছে বস্তুজগতের সম্পর্ক, স্থান-কাল-পাত্রের প্রভাব। এ জ্ঞান বস্তুজগতের বাইরের কোনো মহাসত্যের সন্ধান দিতে পারে না। ফলে দৃশ্যমান বস্তুজগৎই মানুষের কাছে একমাত্র সত্য বলে মনে হয়। এই চিন্তা-চেতনায় মানুষের মনে ভোগবাদের সৃষ্টি হয়।
সুরা ইখলাস পাঠের সাত পুরস্কার
মুফতি ইবরাহিম সুলতান
পবিত্র কোরআনের ১১২ নম্বর সুরা ইখলাস। এটি ইসলামের প্রাথমিক সময়ে অবতীর্ণ হয়েছে। এই সুরার মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে, শিরক থেকে মুক্ত হয়ে তাওহিদ তথা একত্ববাদে বিশ্বাসী হওয়া। আর এই মর্মার্থের ভিত্তিতেই সুরাটির নাম করা হয় ‘ইখলাস’।
কোরআন মাজিদের গুরুত্বপূর্ণ এই সুরা পাঠ করলে তিলাওয়াতকারীর জন্য রয়েছে বেশ কিছু পুরস্কারও। নিম্নে এর কয়েকটি উল্লেখ করা হলো—
জান্নাতে বিশেষ প্রাসাদ নির্মাণ
মুআজ ইবনে আনাস জুহানি (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি সুরা ইখলাস ১০ বার পড়বে আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাতে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করবেন। এ কথা শুনে উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) বলেন, তাহলে তো আমরা অনেক প্রাসাদের অধিকারী হয়ে যাব (অর্থাৎ অধিক হারে এই সুরা পাঠ করব। ফলে আল্লাহ আমাদের অনেক প্রাসাদ দান করবেন)।
রাসুল (সা.) বললেন, আল্লাহ তাআলার দান আরো প্রশস্ত, আরো উত্কৃষ্ট। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ১৫৬১০)
কোরআনের এক-তৃতীয়াংশ সওয়াবের পুরস্কার
একাধিক হাদিস শরিফে এসেছে, সুরা ইখলাস কোরআন মাজিদের তিন ভাগের এক ভাগের সমান মর্যাদা রাখে। যে ব্যক্তি একবার এই সুরা তিলাওয়াত করবে সে কোরআন মাজিদের এক-তৃতীয়াংশের সওয়াব লাভ করবে। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তিকে রাতে বারবার সুরা ইখলাস পড়তে শুনেছেন।
অতঃপর সকালে নবী (সা.)-কে এ বিষয়টি অবহিত করা হয়। তখন নবী (সা.) বলেন, ওই সত্তার শপথ! যার কুদরতি হাতে আমার জীবন, অবশ্যই এ সুরা কোরআন মাজিদের এক-তৃতীয়াংশের সমান। (বুখারি, হাদিস : ৫০১৩)
আল্লাহর ভালোবাসা লাভ
মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় আরাধনা আল্লাহ তাআলার নৈকট্য ও ভালোবাসা অর্জন করা। যারা সুরা ইখলাস বেশি বেশি পাঠ করবে তারা আল্লাহর নৈকট্য ও ভালোবাসা অর্জন করতে পারবে। আয়েশা (রা.) বলেন, একবার রাসুল (সা.) কিছু সাহাবিকে যুদ্ধে পাঠালেন।
তাদের একজনকে সেনাপতি নিযুক্ত করলেন। তিনি যুদ্ধকালীন দীর্ঘ সময়ে শুধু সুরা ইখলাস দিয়ে নামাজ পড়িয়েছেন। যুদ্ধ থেকে ফেরার পর সাহাবিরা নবী (সা.)-কে বিষয়টি জানান। তখন নবী (সা.) তাদের বলেন, তোমরা তাকে জিজ্ঞেস করো—কেন সে এরূপ করেছে? সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলে সেনাপতি জবাব দিলেন, এ সুরায় আল্লাহর গুণাবলি বর্ণিত হয়েছে। তাই আমি এ সুরাকে ভালোবাসি। নবী (সা.) তখন সাহাবিদের বলেন, তোমরা তাকে বলো, আল্লাহও তাকে ভালোবাসেন। (বুখারি, হাদিস : ৭৩৭৫)