সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় ইসলামের ভূমিকা

১১ ডিসেম্বর, ২০২৪

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, যা মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতি থেকে শুরু করে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক সব বিষয়ের সমাধান দেয়। ইসলামের অন্যতম মৌলিক দিক হলো- সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির শিক্ষা। মানবজাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করতে ইসলামের যে শিক্ষা, তা শুধু ধর্মীয় চেতনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বহুত্ববাদী সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি মডেল। ইসলামের মূল শিক্ষা হলো- ‘লা ইকরাহা ফিদ্দিন’ ধর্মে কোনো জবরদস্তি নেই। এই আয়াতটি নিঃসন্দেহে ইসলামের সৌহার্দ্যনীতির অনন্য ভিত্তি। এটি অন্য ধর্মের প্রতি সহিষ্ণুতা এবং মতের পার্থক্যকে স্বীকৃতি দেয়। নবীজি সা:-এর আমলেও আরবের হাজার হাজার মানুষ অমুসলিম থেকেছে। মিসর, লেবানন, ইরাকসহ আরব দেশগুলোর লাখ লাখ মানুষ আজও যে অমুসলিম তারা তো তাদেরই বংশধর। কোনো মুসলিম সেনাবাহিনী কোনোকালেই তাদের মুসলিম হতে বাধ্য করেনি। এরই আরেক প্রমাণ, ভারতের ৬০০ বছরের বেশি কাল মুসলিম শাসন। দীর্ঘকাল মুসলিম শাসনের পরও রাজধানী দিল্লি ও তার আশপাশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ হিন্দুই থেকে যায়। তেমনটি ঘটেছে স্পেনেও। সে দেশে মুসলিমরা ৭০০ বছর শাসন করে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ খ্রিষ্টানই থেকে যায়। কিন্তু যারা জেনে বুঝে মুসলিম হয় তাদের মাথার ওপর অলঙ্ঘনীয় দায়িত্বও এসে যায়। ইসলামে বিশ্বাসের স্বাধীনতা ও পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। প্রিয় নবী মুহাম্মদ সা:-এর জীবন এই শিক্ষার একটি আদর্শ উদাহরণ। তিনি বিভিন্ন ধর্মের লোকদের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতেন এবং তাদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার ছিলেন। ইসলামের সৌহার্দ্যনীতি কুরআন এবং সুন্নাহর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। কুরআনের সূরা আল-হুজরাতে বলা হয়েছে- ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অপরকে জানতে পারো।’ (৪৯ : ১৩)
এই আয়াতে মানবজাতির ভিন্নতা এবং বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কথা বলা হয়েছে। ইসলামে মানুষের জাতি, ধর্ম, গোত্র বা বর্ণের ভিত্তিতে বৈষম্যের কোনো স্থান নেই। এটি মানুষকে সমতার ওপর ভিত্তি করে একে অপরের প্রতি সহমর্মী হতে উৎসাহিত করে।
নবী করিম সা:-এর জীবন ইসলামের সম্প্রীতির আলোকবর্তিকা হিসেবে বিবেচিত। মদিনায় এসে তিনি সেখানে এক বহুত্ববাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। মদিনার সনদ বা মদিনা চুক্তি এই সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এই চুক্তি অনুযায়ী, মুসলমান, ইহুদি, খ্রিষ্টান এবং অন্যান্য সম্প্রদায় মদিনার নাগরিক হিসেবে সমান অধিকার ও দায়িত্ব ভোগ করত। এটি ছিল বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান, যা ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সহাবস্থানের একটি মডেল। নবী সা:-এর জীবনে অন্য ধর্মের প্রতি যে শ্রদ্ধা ও সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করা হয়েছে, তা আজকের যুগেও সম্প্রীতির পথে পথপ্রদর্শক। উদাহরণস্বরূপ তায়েফের ঘটনা কিংবা মক্কা বিজয়ের সময় তাঁর ক্ষমাশীল আচরণ ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি শত্রুদেরও ক্ষমা করে দিয়েছিলেন এবং তাদের ওপর কোনো প্রতিশোধ নেননি। ইসলামের সম্প্রীতি নীতি শুধু আধ্যাত্মিক বা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়; এটি সামাজিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্যও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বর্তমান বিশ্বে ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, ধর্মীয় বৈষম্য এবং সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতিতে ইসলামের শিক্ষা অত্যন্ত যুগোপযোগী। ইসলাম শিক্ষা দেয়, মানুষের মধ্যে বৈচিত্র্য আল্লাহর সৃষ্টির অংশ। মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও মানুষকে একসাথে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে হবে। ইসলামের দৃষ্টিতে, সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতি ন্যায্য আচরণ করা এবং তাদের অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। পবিত্র আলকুরআনে বলা হয়েছে- ‘আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না তাদের সাথে সদাচার করতে, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের বাসস্থান থেকে বহিষ্কার করেনি।’ (সূরা আল-মুমতাহিনা : ৬০ : ৮)
এই আয়াতটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ক্ষেত্রে একটি নৈতিক নির্দেশনা। ইসলাম শিক্ষা দেয়, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করতে এবং তাদের সাথে সদাচার করতে।
বহুত্ববাদী বিশ্বে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সম্প্রীতি চর্চা অত্যন্ত জরুরি। আজকের সমাজে ধর্মীয় বৈষম্য এবং সাম্প্রদায়িক সহিংসতা দিন দিন বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে ইসলামের সৌহার্দ্যনীতি একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। ইসলামের শিক্ষায় উঠে এসেছে, সংলাপ ও সহযোগিতার মাধ্যমে মতপার্থক্য দূর করা সম্ভব। একে অপরের সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও ধর্মকে সম্মান জানিয়ে একটি উদার সমাজ গঠন করা যায়। এমনকি, ভিন্ন মতাবলম্বীদের প্রতি সদাচরণ করাকেও ইসলামে ইবাদতের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ইসলামের ইতিহাসে অনেক উদাহরণ রয়েছে-যেখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ধর্ম, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হয়ে উঠেছে। বিশেষত উমাইয়া এবং আব্বাসীয় খিলাফতের সময় এই নীতির চর্চা উল্লেখযোগ্য ছিল।
১. স্পেনের উদাহরণ : স্পেনে ইসলামিক শাসনের সময় মুসলমান, খ্রিষ্টান ও ইহুদি সম্প্রদায় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। এই যুগকে সহাবস্থানের স্বর্ণযুগ বলা হয়। ইবনে রুশদ, ইবনে সিনা এবং মাইমনিডেসের মতো মুসলিম ও ইহুদি চিন্তাবিদরা একই সমাজে বসবাস করলেও তারা জ্ঞানের ক্ষেত্রে পরস্পরের প্রতি সহায়তা করতেন। এই সময়েই বিজ্ঞান, দর্শন ও স্থাপত্যে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়।
২. উসমানিয়া খেলাফতে সহিষ্ণুতা : উসমানিয়া খেলাফত আমলে মিল্লাতব্যবস্থা ছিল এক উদ্ভাবনী ধারণা। এতে প্রতিটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে নিজেদের ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক বিষয়গুলো পরিচালনার স্বাধীনতা দেয়া হয়। এই ব্যবস্থায় সাম্রাজ্যের বহু ভাষাভাষী ও ধর্মাবলম্বী মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করতে পেরেছিল। ইসলামের সৌহার্দ্যনীতি কেবল ঐতিহাসিক নয়; এটি প্রতিদিনের জীবনে সমাজকে কিভাবে প্রভাবিত করে তা আরো গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের এই নীতি মানুষকে অন্যদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে, মতের পার্থক্য মেনে নিতে ও সহযোগিতা করতে উৎসাহিত করে।
গরিবদের প্রতি সদাচার : ইসলামের জাকাত ও সাদকার বিধান শুধু মুসলিমদের জন্য নয়, ভিন্নধর্মীদের প্রতিও আর্থিক সাহায্যের একটি নির্দেশনা রয়েছে।
প্রতিবেশীর অধিকার : কুরআন ও হাদিসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণ করা ঈমানের একটি শর্ত। নবী সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার প্রতিবেশীকে ক্ষতি করে, সে মুমিন হতে পারে না।’
আজকের বিশ্বে ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক সঙ্ঘাত অত্যন্ত ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এই পরিস্থিতিতে ইসলামের সৌহার্দ্যনীতি কেবল প্রয়োজনীয় নয়; বরং একটি কার্যকর সমাধান।
৩. আন্তঃধর্ম সংলাপ : ইসলাম ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সাথে শান্তিপূর্ণ সংলাপ ও বোঝাপড়ার ওপর জোর দেয়। বর্তমান সময়ে বিভিন্ন ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে সংলাপের মাধ্যমে সহনশীলতার প্রচার করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
৪. সামাজিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা : ইসলামের শিক্ষা সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে। এটি অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা এবং প্রতিটি সম্প্রদায়ের প্রতি সুবিচার নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।
৫. শিক্ষার মাধ্যমে সম্প্রীতি : শিক্ষার মাধ্যমে মানুষকে অন্য ধর্ম সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেয়া সম্ভব। ইসলামের শিক্ষা অনুসারে, ‘জ্ঞানের সন্ধান প্রতিটি মুসলিমের ওপর ফরজ’। এর মাধ্যমে বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মানবোধ জাগ্রত হয়। যদিও ইসলামের সৌহার্দ্যনীতি চিরকালীন, তবে এর বাস্তবায়ন অনেক সময় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। কিছু চ্যালেঞ্জ হলো : ধর্মীয় ভুল ব্যাখ্যা ও উগ্রতা, রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মের অপব্যবহার, আন্তঃধর্মীয় অবিশ্বাস। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ইসলামের মূল শিক্ষা প্রচার এবং সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের উচিত নবী করিম সা:-এর উদাহরণ অনুসরণ করে সব ধর্মাবলম্বীর সাথে মানবিক আচরণ বজায় রাখা।
ইসলামের সৌহার্দ্যনীতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির শিক্ষা চিরকালীন ও সর্বজনীন। এটি কেবল মুসলিমদের মধ্যেই নয়; বরং সব মানুষের মধ্যে শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন স্থাপন করে। বর্তমান বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ইসলামের এই শিক্ষাগুলো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। একটি বহুত্ববাদী সমাজ গঠনে ইসলামের সৌহার্দ্যনীতি আলোকবর্তিকা হয়ে উঠতে পারে। ইসলাম কেবল একটি ধর্ম নয়; এটি মানবতার কল্যাণে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এই শিক্ষা যদি সঠিকভাবে চর্চা করা হয়, তাহলে পৃথিবী শান্তি ও সৌহার্দ্যরে একটি সুন্দর জায়গায় পরিণত হবে। ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ে এই নীতি সমাজকে একত্রিত করেছে এবং আজও এটি একইভাবে প্রাসঙ্গিক। আধুনিক বিশ্বের বিভিন্ন সঙ্কটে এই শিক্ষার যথাযথ চর্চা মানবতার জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে উঠতে পারে। ইসলামের সৌহার্দ্যনীতি আমাদের শেখায়, বৈচিত্র্যকে সম্মান জানিয়ে একত্রে শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠন সম্ভব।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট