২৪ এপ্রিল, ২০২৫
ইসলামে মূল উদ্দেশ্য হলো, রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহর অনুসরণ। কখনো কখনো কোনো ইবাদতে একাধিক সহিহ সুন্নাহর পদ্ধতি পাওয়া যায়, যাকে বলা হয় ইখতিলাফে তানাওউ অর্থাত্ বৈধ বিকল্পভিত্তিক ভিন্নতা, যা বিরোধ নয় বরং শরিয়তের প্রশস্ততা।
তবে পূর্বসূরি মুসলিম মনীষীরা আমাদের শিখিয়েছেন, যে এলাকায় বা যে মসজিদে যে পদ্ধতি প্রচলিত, সেখানে তা-ই বহাল রাখা উচিত। ভিন্ন সুন্নাহ প্রচার করে সাধারণ মুসলি্লদের বিভ্রান্ত করা বা ফেতনা সৃষ্টি করা অনুচিত। ইমাম ইবনে আব্দিল বার (রহ.) বলেন, ইমাম মালেকের বর্ণনার ভিত্তিতে মদিনায় রাফয়ে ইয়াদাইন কেবল নামাজের শুরুতে করা হতো এবং সেখানকার উলামায়ে কেরাম প্রচলিত পদ্ধতির বিরোধিতা করতেন না। (আল-ইসতিযকার, ৪/১০১)
শায়খ বিন বাজ (রহ.) বলেন, যদি কোনো মুস্তাহাব আমল (যেমন রাফয়ে ইয়াদাইন বা জোরে আমিন) দ্বারা মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়, তবে তা ছেড়ে দেওয়াই উত্তম। রাসুল (সা.)-ও কাবা শরিফকে ইবরাহিম (আ.)-এর ভিত্তির ওপর নির্মাণ করেননি, কারণ তাতে কুরাইশের নব-মুসলিমদের মনে বিভ্রানি্তর আশঙ্কা ছিল। (মাজমূউল ফাতাওয়া : ২৯/২৭৫-৩৭৪)
এ থেকেই শিক্ষা পাওয়া যায়, শরিয়তসম্মত হলেও যদি কোনো আমল ফেতনার কারণ হয়, তবে তা গোপন রাখা বা না করা শ্রেয়। ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন ‘এক এলাকায় এমন একটি মত প্রচলিত, যা শরিয়তসম্মত এবং অন্য একটি মতও শরিয়তসম্মত; তবে যদি ভিন্ন মতটি চর্চা করা ফেতনার কারণ হয়, তাহলে ঐ মত প্রকাশ না করাই উত্তম।' (আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা : ২/৪৭)
বর্তমান প্রেক্ষাপটে করণীয় ও সমাধান
ইখতিলাফি সুন্নাহর চর্চা নিয়ে বর্তমান সমাজে যে উত্তেজনা, বিভাজন ও অস্থিরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা দ্বিন ও উম্মাহ উভয়ের জন্য ক্ষতিকর। এই বাস্তবতায় ইসলামের আলোকে কিছু বাস্তবসম্মত করণীয় নির্ধারণ করা জরুরি, যা আমাদের মধ্যকার ঐক্যকে সুদৃঢ় করবে এবং সুন্নাহর সঠিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করবে।
১. সহিহ ইলম অর্জন ও ফিকহি বহুমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা :
বর্তমান বিভ্রানি্তর অন্যতম প্রধান কারণ হলো খণ্ডিত জ্ঞান। তাই মুসলিমদের উচিত, ইলমে দ্বীন অর্জন করা, বিশেষ করে চার মাজহাবের ইজতিহাদ ও ইখতিলাফের মূলনীতি বোঝা। কোরআন বলছে, ‘তোমরা যদি না জানো, তাহলে জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা করো।' (সুরা আন-নাহল, আয়াত : ৪৩)
ইলম ছাড়া দাওয়াত শুধু নয়, বরং নিজের আমলও বিপদের মুখে পড়ে।
২. সুন্নাহর দাওয়াতে হিকমত ও বাস্তবতা-বিবেচনা :
সুন্নাহর আমল প্রচার করতে গেলে সংশি্লষ্ট মসজিদ, সমাজ ও লোকদের মানসিকতা বুঝে ধীরে ধীরে, সেৌন্দর্যের সাথে তুলে ধরাই হলো সুন্নাহর প্রকৃত দাওয়াত। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘তোমার রবের পথে হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে দাওয়াত দাও।' (সুরা নাহল : ১২৫)
উগ্রতা, বিতর্ক ও হঠকারিতার মাধ্যমে নয়; বরং কোমলতা ও ধৈর্য দিয়েই মানুষকে সুন্নাহর দিকে টানতে হবে।
৩. ভিন্ন মত ও মাজহাব চর্চাকারীদের সম্মান ও সহনশীলতা বজায় রাখা :
যিনি সহিহ হাদিস অনুসারে ভিন্ন কোনো সুন্নাহ পালন করছেন, তাঁকে কটাক্ষ নয়, বরং শ্রদ্ধা করাই হচ্ছে ইখলাস ও উম্মাহর ঐক্যের বহিঃপ্রকাশ। হাদিসে এসেছে, ‘এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই, সে তার প্রতি জুলুম করে না, তাকে একা ফেলে দেয় না।' (সহিহ বুখারি : ২৪৪২)
এই ভ্রাতৃত্ববোধ সমাজে সুন্নাহভিত্তিক ভিন্নতাকে শানি্তপূর্ণ সহাবস্থানে পরিণত করতে পারে।
৪. ইমাম ও আলেমদের দায়িত্বশীল ভূমিকা :
মসজিদের ইমাম ও স্থানীয় আলেমদের উচিত, কোনো ভিন্ন সুন্নাহর প্রচারে ফিতনার সম্ভাবনা থাকলে তা সম্মিলিত পরামর্শে, ধৈর্যের সাথে সামলানো। প্রয়োজনে কেৌশলে ব্যক্তিগতভাবে বুঝিয়ে দেওয়া, যাতে জামাতের ঐক্য বিনষ্ট না হয়।
৫. মিডিয়া ও দাওয়াতি প্ল্যাটফর্মে সংযম ও দায়িত্বশীলতা :
সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু ভাই ‘সুন্নাহ প্রচার' এর নামে বিদ্বেষমূলক ভিডিও, ফতোয়া ও তির্যক ভাষায় মন্তব্য ছড়ান, যা নবী (সা.)-এর নম্রতা ও দাওয়াতি পদ্ধতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। দায়বদ্ধ ও শরীয়ত-সম্মত দাওয়াতের পরিবেশ গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি।
৬. সামগ্রিকভাবে উম্মাহর ঐক্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া :
ফরজ ও ওয়াজিব ইবাদতের তুলনায় সুন্নাহর এমন ইখতিলাফি বিষয়গুলোতে উম্মাহর ঐক্যকে প্রাধান্য দেওয়ার নীতিই ছিল সাহাবাদের। ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.) বলেন, ‘ঐক্য ও সংহতি, বিভাজন ও মতবিরোধের চেয়ে উত্তম।' (মাজমূউল ফাতওয়া : ২২/৪০৭)
পরিশেষে, আমরা যদি সত্যিই সুন্নাহর অনুসারী হতে চাই, তবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সেই চরিত্র ও হিকমতের অনুসরণ করতে হবে, যার মাধ্যমে উম্মাহ ঐক্যবদ্ধ হয় বিভক্ত নয়।