‘ধর্ষণ প্রতিরোধে পারিবারিক-সামাজিক-রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বয়ানকে শক্তিশালী করতে হবে’ অধ্যাপক রেজওয়ানা

০৮ জুন, ২০২৫

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে নারী ও শিশু ধর্ষণের একের পর এক ঘটনার ফলে দেশজুড়ে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।

মাত্র আট বছর বয়সী শিশু আছিয়ার ধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ড আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে সমাজে কী ভয়াবহ বাস্তবতা বিরাজ করছে। শিশু, কিশোরী, গৃহবধূ থেকে শুরু করে কর্মজীবী নারী—কোনো বয়স কিংবা শ্রেণি ধর্ষণ ও নির্যাতনের করাল ছায়া থেকে রেহাই পাচ্ছে না। আইনের উপস্থিতি ও শাস্তির বিধান সত্ত্বেও ধর্ষণের ঘটনা কেন থামছে না—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আমরা কথা বলেছি সমাজ গবেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধার সঙ্গে।

প্রশ্নঃ সাম্প্রতিক সময়ে শিশু আছিয়ার ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডসহ ধর্ষণের ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, এই পরিস্থিতিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

রেজওয়ানা করিম:

ধর্ষণ সংস্কৃতির একটা সমস্যাতে বাংলাদেশ ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভুগছে। কিছু কিছু ধর্ষণ আমাদের মনোযোগ পায়, আর বাদ বাকি সারাবছরই যখন এ ধরনের ঘটনা ঘটে বা যৌন নির্যাতন হয়, সেগুলোকে আমাদের মিডিয়া ওভাবে মনোযোগ দেয় না।

রেজওয়ানা করিম:

ধর্ষণ সংস্কৃতির একটা সমস্যাতে বাংলাদেশ ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভুগছে। কিছু কিছু ধর্ষণ আমাদের মনোযোগ পায়, আর বাদ বাকি সারাবছরই যখন এ ধরনের ঘটনা ঘটে বা যৌন নির্যাতন হয়, সেগুলোকে আমাদের মিডিয়া ওভাবে মনোযোগ দেয় না।

এই যে মনোযোগ না দেওয়া, এটা ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার একটা কারণ। কারণ, এই যে ধর্ষণের পুরো ব্যাপারটা—এটা এক, হচ্ছে আইনি জটিলতা; দুই, ব্যয়বহুলতা; তিন নম্বরে হচ্ছে আমাদের যে মনটা, সেটা অনেক বেশি ক্ষমতা কেন্দ্রিক। ক্ষমতার সাথে ধর্ষণের একটা সম্পর্ক রয়েছে। এই ক্ষমতাটা কখনো কখনো রাজনৈতিক, কখনো কখনো অর্থনৈতিক, পারিবারিক কাঠামোগত, আবার কখনোবা আমরা যে নর্মস দেখাই, সেগুলোর ক্ষমতা।

প্রশ্নঃ ধর্ষণের সাথে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব কতটা জড়িত?

রেজওয়ানা করিম:

কিছু ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের কালচারাল ডিসকোর্স যখন পয়দা করা হয়, তখন এই ধর্ষকের যে মনোভঙ্গি বা চিন্তাধারা, সেটাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রমোট করা হয়। এবং যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের রাষ্ট্র ও মিডিয়া এর প্রতি সচেতন না হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত নারীর প্রতি বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দেওয়া বন্ধ না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ধর্ষণ পুরোপুরিভাবে বন্ধ হবে না।

এগুলো একটা আরেকটার সাথে কানেক্টেড, যেমন আমাদের সমাজে যে এসিড সন্ত্রাস শুরু হয়েছিলো, সেটি কিন্তু আমরা বন্ধ করতে পেরেছি। এক্ষেত্রে যৌথ ভূমিকা প্রয়োজন। একজন মেয়ে যখন পরিবারের কারো দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়, সেটা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নাই। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আছে—যখন ধর্ষণের কোনো অভিযোগ আসে, সেটা দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা; তথ্যমন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ইত্যাদি আনুষঙ্গিক বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে সোশ্যাল সেফটি নেটস-এর মধ্যে নিয়ে আসা। লিঙ্গ-বান্ধব পলিসি লেভেলে যদি আমরা পরিবর্তন আনতে সক্ষম হই, সেটার মধ্যে নিয়ে আসা।”

প্রশ্নঃ বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্যমতে, চলতি বছরের মার্চে ১৬৩ জন ও এপ্রিলে ১১১ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, এ বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন?

রেজওয়ানা করিম:

সাম্প্রতিক সময়ের পলিটিক্যাল অস্বাভাবিকতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করি। আমাদের বর্তমানে ধর্ষণের ঘটনাগুলো এত মনোযোগ পাচ্ছে কারণ, সমাজে যখন পলিটিক্যাল, লিগ্যাল ইন্সটিটিউশন কাজ করে না, তখন টার্গেট গ্রুপে পরিণত হয় নারী ও শিশু। কারণ তারা ক্ষমতা সম্পর্কের দিক থেকে দুর্বল। এখন এমন একটা পরিবেশ চলছে পুরো বাংলাদেশে, যেখানে মব জাস্টিস প্রতিনিয়ত করা হচ্ছে—কারো সাথে কারো ব্যক্তিগত আক্রোশের জেদে তার বাড়িতে হামলা ও ডাকাতি করে দেওয়া যাচ্ছে। সেখানে একজন পটেনশিয়াল ধর্ষক মনে করে যে, আমি এখন যাই করি, মনে হয় কিছু হবে না। এই কারণে এ বিষয়গুলো এখন ডিরেক্টলি দেখা যাচ্ছে।

প্রশ্নঃ আপনার মতে, একজন মানুষের মাঝে কীভাবে ধর্ষকের মানসিকতা গড়ে ওঠে?

রেজওয়ানা করিম:

আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, ধর্ষণের সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটে পরিবারের সদস্যদের দ্বারা। এরপর নিকটাত্মীয়, বন্ধু বা পরিচিতজন এবং সবশেষে অপরিচিত কারও দ্বারা সংগঠিত হয়। ধর্ষক একদিনে ধর্ষক হয়ে ওঠে না। সে শুরু করে নারীদের উত্ত্যক্ত করা, কুরুচিকর মন্তব্য করা, ইভটিজিং দিয়ে। এক পর্যায়ে সেটা পূর্ণাঙ্গ যৌন সহিংসতায় রূপ নেয়।

প্রশ্নঃ এই ধাপে ধাপে মানসিকতা তৈরিতে কোন কোন বিষয়গুলো ভূমিকা রাখে বলে মনে করেন?

রেজওয়ানা করিম:

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে নির্লিপ্ত ভূমিকায় থাকে। সিনেমাগুলোয় দেখানো হচ্ছে, চাইলেই একটা মেয়েকে শিস দেওয়া যায়, ওড়না ধরে টান দেওয়া যায়, যখন-তখন তার হাত ধরে ফেলা যায়। কিন্তু নারী বা পুরুষ—কারও গায়ে স্পর্শ করার ক্ষেত্রে যে সম্মতি লাগে, এই ভাষা এখনো আমরা শিখতে শুরু করিনি। যদি এই শিখনপ্রক্রিয়ার মধ্যে না ঢুকি, তাহলে আমরা ধর্ষণ থামাতে পারব না। গণমাধ্যমকে এ ব্যাপারে গণসচেতনতা বাড়াতে নিয়মিত কাজ করতে হবে।

প্রশ্নঃ আমরা দেখতে পাচ্ছি ধর্ষকের হাত থেকে শিশুরাও রেহাই পাচ্ছেনা। শিশু ধর্ষণের বিষয়টি নিয়ে কী বলবেন?

রেজওয়ানা করিম:

আমাদের সমাজে বেশিরভাগ কালচারাল নর্মস ঠিক নেই। প্রকাশ্যে শিশুদের চুমু দেওয়া, টাচ করা স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখা হয়। তবে এ ধরনের নর্মসের মাধ্যমে ধর্ষকরাও সুযোগ পায়।

আমরা গবেষণায় দেখেছি যে, শিশু ধর্ষণের ঘটনায় ভুক্তভোগীর পরিবার বেশিরভাগ সময় মামলা করতে চায় না—ধামাচাপা দেয়। সম্প্রতি আছিয়ার (৮ বছরের ধর্ষণ ও হত্যার শিকার শিশু) ক্ষেত্রে দেখলেও একই অবস্থা দেখা যায়। তার বোনের যে স্টেটমেন্ট, সেখানে আমরা দেখেছি—সে যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে, সেটা যাতে না বলে, সেজন্য তাকে মেরে ফেলা হয়েছে।”

আরেকটা দিক হচ্ছে, ২০০০ সালে যে নারী তার শিশুর ধর্ষণের বিষয়ে কেইস ফাইল করতো না, তাদের মাঝে এখন মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটেছে। এদিক থেকে সম্প্রতি কয়েক বছর সমাজে একটু হলেও আমরা পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি।

প্রশ্নঃ ধর্ষন প্রতিরোধে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

রেজওয়ানা করিম:

আমাদের সমাজে “ধর্ষণ” বিষয়টা মানুষের মাঝে এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার না। এক্ষেত্রে আমাদের ধর্ষণের আইনগুলোকে রিভাইস করতে হবে। দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালের অধীনে আনতে হবে। যারা এসব নিয়ে কাজ করে তাদেরকে সহায়তা করতে হবে। সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

ধর্ষণবিরোধী আইন ও সেকশনগুলো পর্যালোচনা ও সংস্কার করতে হবে, বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করে কার্যকর পরিবর্তন আনতে হবে। নারীদের প্রতি বিদ্বেষমূলক বক্তব্য (hate speech) অনলাইনে ও অফলাইনে কঠোরভাবে দমন করতে হবে।

সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ইমাম, মুয়াজ্জিন, রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মী ও শিক্ষার্থীদের সচেতনতা বৃদ্ধির কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে। প্রতি সপ্তাহে যৌন হয়রানি ও ধর্ষণবিরোধী সচেতনতামূলক কর্মসূচি বাধ্যতামূলক করা উচিত।

এছাড়া গণমাধ্যমকে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিশেষায়িত সমাজকর্মী নিয়োগ দিতে হবে এবং One-Stop Crisis Center (OCC) সার্বক্ষণিক চালু রাখতে হবে।”