দাম্পত্য কলহ থেকে বাঁচার কিছু উপায়

২৫ অক্টোবর, ২০২৫

দাম্পত্য মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল অধ্যায়। এটি ভালোবাসা, মায়া, সহানুভূতি, ত্যাগ ও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধার এক অনন্য বন্ধন। একজন পুরুষ ও একজন নারী একসঙ্গে জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না ও স্বপ্ন-বাস্তবতার পথ পাড়ি দেন, এটাই দাম্পত্য জীবন। কিন্তু কখনো কখনো এই পবিত্র সম্পর্কের মধ্যে দেখা দেয় কলহ, বিরোধ ও মানসিক অশান্তি। ক্ষুদ্র ভুল বোঝাবুঝি থেকে শুরু হয় বড় ঝগড়া, যা ধীরে ধীরে ঘরে বিষাক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে। অথচ সামান্য ধৈর্য, সহনশীলতা ও ইসলামি শিক্ষার আলোয় চললে এ কলহ সহজেই এড়ানো সম্ভব। এ বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণী উল্লেখ করা হলো।

পারস্পরিক সম্মান ও সহানুভূতি : দাম্পত্য জীবনে কলহের প্রধান কারণ হলো, একে অপরের প্রতি সম্মানের ঘাটতি। স্বামী যদি স্ত্রীকে হেয় করে, কিংবা স্ত্রী যদি স্বামীকে অসম্মান করে, তাহলে সম্পর্কের ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে যায়। আল্লাহতায়ালা কোরআনে বলেন, ‘তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। যদি তোমরা তাদের অপছন্দ করো, তবে হতে পারে তোমরা কোনো জিনিস অপছন্দ করছ, অথচ আল্লাহ তাতে অনেক কল্যাণ রেখেছেন।’ (সুরা নিসা ১৯)

এই আয়াত আমাদের শেখায়, অপছন্দের মধ্যেও যেন ভালো দিক খুঁজে নেওয়া হয়। দাম্পত্য জীবনে অপরজনের প্রতি দয়া, মায়া ও সম্মান বজায় রাখলে কলহের সুযোগ থাকে না।

সহনশীলতা ও ধৈর্যের অনুশীলন : প্রত্যেক সম্পর্ক টিকে থাকে ধৈর্যের মাধ্যমে। দাম্পত্য জীবনে দুজন ভিন্ন মানুষ, ভিন্ন অভ্যাস ও মানসিকতার। তাই কিছু মতবিরোধ হবেই। কিন্তু অল্পতেই রাগ, চিৎকার বা কটূবাক্য ব্যবহার করলে তা ঝগড়ার জন্ম দেয়। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিমান সে নয়, যে কুস্তিতে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করে। বরং শক্তিমান সে, যে রাগের সময় নিজের রাগকে সংযত করতে পারে।’ (সহিহ বুখারি) যে স্বামী বা স্ত্রী ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে, তাদের সংসারে কখনোই স্থায়ী কলহ হয় না।

খোলা মনে যোগাযোগ : দাম্পত্য জীবনে কলহের আরেক বড় কারণ হলো, নীরবতা বা মনঃক্ষুণœ বিষয় প্রকাশ না করা। অনেকেই মনে কষ্ট রাখেন, কিন্তু বলেন না। পরে তা জমে বিস্ফোরণ ঘটে। অথচ খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে অনেক সমস্যা মুহূর্তেই সমাধান করা যায়। ভালোবাসার ভাষায় কোমলভাবে কথা বললে কঠিন বিষয়ও সহজ হয়ে যায়। তাই একে অপরের অনুভূতি বুঝতে ও শেয়ার করতে শিখতে হবে।

ক্ষমার গুণ অর্জন : মানুষ মাত্রই ভুল করে। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই ভুল করতে পারেন। কিন্তু ভুল ধরিয়ে দিয়ে অপমান করলে সম্পর্ক ভেঙে যায়। ক্ষমা করার মধ্যে আছে মানসিক প্রশান্তি। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যে ক্ষমা ও সংশোধন করে, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছেই।’ (সুরা শুরা ৪০) দাম্পত্য জীবনে যদি ক্ষমার মনোভাব থাকে, তাহলে কোনো বিষয়ই বড় কলহে রূপ নেয় না।

" بَارَكَ اللهُ لَكُمَا وَبَارَكَ عَلَيْكُمَا وَجَمَعَ بَيْنَكُمَا فِيْ خَيْرٍ”
— অর্থৎ-এই বিবাহে আল্লাহ তোমাদের জন্য বরকত দান করুন ও তোমাদের উপর বরকত দান করুন এবং তোমাদের উভয়কে কল্যাণের সাথে একত্রিত করুন।
—ইবনু মাজাহ হা/১৯০৫; আহমাদ, তিরমিযী, আবুদাঊদ, মিশকাত হা/২৪৪৫;

ইসলামি শিক্ষা ও নামাজের প্রতি যতœ : যে পরিবারে নামাজ ও ইসলামি আদর্শের চর্চা থাকে, সেখানে শান্তি স্থায়ী হয়। আল্লাহভীতি মানুষকে অন্যের প্রতি ন্যায়পরায়ণ হতে শেখায়। স্বামী যদি আল্লাহকে ভয় করে, তবে সে স্ত্রীর প্রতি জুলুম করবে না। স্ত্রীও যদি আল্লাহকে ভয় করে, তবে স্বামীর অবাধ্য হবে না। আল্লাহ বলেন, ‘যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য বের হওয়ার পথ করে দেন।’ (সুরা তালাক ২) অর্থাৎ আল্লাহভীতিই দাম্পত্য জীবনের কলহ থেকে বাঁচার শ্রেষ্ঠ পথ।

আর্থিক স্বচ্ছতা ও দায়িত্ববোধ : অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে দাম্পত্য জীবনে অনেক সময় দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। স্বামী যদি পরিবারের প্রয়োজন বুঝে সঠিকভাবে ব্যয় না করেন, কিংবা স্ত্রী যদি অপচয় করেন, তবে তাতে অশান্তি জন্ম নেয়। ইসলাম উভয়কেই পরিমিত ব্যয়ের নির্দেশ দিয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘কিছুতেই অপব্যয় করো না। নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই।’ (সুরা ইসরা ২৬-২৭) স্বামী-স্ত্রী দুজনেই যদি দায়িত্বশীল হন, তাহলে পারিবারিক অর্থনীতি সুষ্ঠু থাকে এবং কলহের অবসান ঘটে।

আত্মসমালোচনা ও পরিবর্তনের মানসিকতা : অনেক সময় আমরা ভাবি, দোষটা শুধু অন্যজনের। অথচ সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে নিজের ভুলও স্বীকার করা জরুরি। আত্মসমালোচনার অভ্যাস মানুষকে বিনয়ী করে। আর বিনয়ই কলহের জট খুলে দেয়। দাম্পত্য সম্পর্কে ‘আমি ঠিক, তুমি ভুল’ মনোভাব নয়, বরং ‘আমরা একসঙ্গে ঠিক করব’ মনোভাব প্রয়োজন।

পারিবারিক হস্তক্ষেপ এড়ানো : অতি মাত্রায় শ্বশুরবাড়ি বা বাবার বাড়ির হস্তক্ষেপ দাম্পত্য কলহ বাড়ায়। অনেক সময় ছোট বিষয়ে বাইরে পরামর্শ নিতে গিয়ে বিষয়টি জটিল হয়ে পড়ে। স্বামী-স্ত্রীর গোপন বিষয় বাইরের কাউকে জানানো উচিত নয়। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি সেই স্বামী বা স্ত্রী, যে দাম্পত্য গোপনীয়তা প্রকাশ করে।’ (সহিহ মুসলিম) তাই গোপনীয়তা রক্ষা করা এবং নিজেদের মধ্যে সমাধানের চেষ্টা করা কলহ প্রতিরোধে অপরিহার্য।

সময় ও ভালোবাসার বিনিয়োগ : বেশিরভাগ কলহের মূল কারণ একে অপরের জন্য সময় না দেওয়া। ব্যস্ত জীবনে স্বামী-স্ত্রী দূরে সরে যায় মানসিকভাবে। তাই প্রতিদিন কিছু সময় একসঙ্গে কাটানো, আন্তরিকভাবে কথা বলা, পরস্পরের মেনে নেওয়া, এসব ছোট কাজ বড় সুখ এনে দেয়। ভালোবাসা প্রকাশ করলে ভালোবাসা বাড়ে।

পরনিন্দা ও তুলনাবোধ পরিহার : অনেক স্ত্রী অন্যের স্বামীর সঙ্গে তুলনা করেন, আবার অনেক স্বামীও অন্য পরিবারের জীবন দেখে হতাশ হন। এই তুলনাবোধ শয়তানের অস্ত্র। প্রত্যেক সম্পর্কের নিজস্ব সৌন্দর্য আছে। পরনিন্দা বা তুলনা করলে অসন্তুষ্টি বাড়ে, আর অসন্তুষ্টি থেকেই কলহ জন্ম নেয়।

রাগের সময় নীরবতা : রাগের মুহূর্তে বলা একটি কথা পুরো সম্পর্ক নষ্ট করে দিতে পারে। তাই ইসলাম শিক্ষা দেয়, রাগের সময় নীরব থাকা, অজু করা বা স্থান পরিবর্তন করা। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কেউ রাগান্বিত হয়, তখন যদি দাঁড়িয়ে থাকে তবে বসে যাক। আর তাতে যদি রাগ দূর না হয়, তবে শুয়ে পড়–ক।’ (আবু দাউদ) এভাবে রাগ নিয়ন্ত্রণ করলে ঘরে শান্তি ফিরে আসে।

যৌথ সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ : পরিবারের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে স্বামী-স্ত্রীর পরামর্শ জরুরি। একতরফা সিদ্ধান্ত অসন্তোষের জন্ম দেয়। নবী করিম (সা.)-ও তার স্ত্রীদের পরামর্শ নিতেন। এই চর্চা পারস্পরিক বন্ধন দৃঢ় করে।

দাম্পত্য জীবনের সৌন্দর্য : দাম্পত্য জীবন ফুলের বাগানের মতো। যতœ নিলে ফুল ফোটে, অবহেলা করলে কাঁটা গজায়। কলহ থেকে বাঁচতে হলে দরকার পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্মান, ক্ষমা, ধৈর্য ও আল্লাহভীতি। জীবনসঙ্গী প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং জীবনের সহযাত্রী। তাই তাকে বুঝতে হবে, মূল্য দিতে হবে এবং একসঙ্গে চলার ইচ্ছা রাখতে হবে।

যে দম্পতি ইসলামের আলোয় জীবন গড়ে, তারা কলহ নয়, বরং ভালোবাসা, শান্তি ও তৃপ্তির এক সুন্দর সংসার গড়ে তোলে। দাম্পত্য জীবনের প্রকৃত সুখ তখনই আসে, যখন দুজনই আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশে একে অপরকে খুশি রাখার চেষ্টা করে। ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা তোমাদের জন্য পোশাক স্বরূপ এবং তোমরা তাদের জন্য পোশাক স্বরূপ।’ (সুরা বাকারা ১৮৭) এই আয়াতেই দাম্পত্য জীবনের সৌন্দর্য ও কলহমুক্তির রহস্য নিহিত। তা হলো, ভালোবাসা, আড়াল, রক্ষা ও পরিপূরক সম্পর্কের বন্ধন।

লেখক : মুহতামিম, জহিরুল উলুম মহিলা মাদ্রাসা, গাজীপুর