০৫ নভেম্বর, ২০২৫
দুনিয়া স্থায়ী আবাস নয়। এখানের সব কিছু ক্ষণিকের ও ক্ষয়িষ্ণু। কিছুকাল দুনিয়া উপভোগ করার পর একসময় সব শেষ হয়ে যায়। আমরা দুনিয়াকে আরাম-আয়েশ ও ভোগ-বিলাসের ক্ষেত্র বানিয়ে নিয়েছি। অথচ এই দুনিয়া মুমিনের জন্য আখেরাতের চিরস্থায়ী জীবনের গন্তব্য ও লক্ষ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্র মাত্র। এখানে আমরা মুসাফিরের মতো রয়েছি, এই দুনিয়া আমাদের আসল ঠিকানা নয়। তাই দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত হওয়ার ব্যাপারে রাসুল (সা.) আদেশ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি অবলম্বন করো, তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন। আর মানুষের কাছে যা আছে, তুমি তার প্রতি অনাসক্ত হও, তাহলে মানুষও তোমাকে ভালোবাসবে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ ৪১০২)
আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই দুনিয়া সবুজ-শ্যামল ও সুমিষ্ট। আল্লাহতায়ালা দুনিয়ায় তোমাদেরকে তার প্রতিনিধিস্বরূপ প্রেরণ করেছেন। তিনি দেখবেন তোমরা কেমন আমল করো। অতএব, দুনিয়ার মোহ পরিহার করো এবং নারীদের ছলনা হতে পরিত্রাণ চাও। কেননা বনি ইসরাইলের সর্বপ্রথম বিপর্যয় নারী কর্র্তৃক প্রকাশিত হয়েছিল।’ (সহিহ মুসলিম ২৭৪২)
আবু হুরাইয়া (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘দুনিয়া হলো মুমিনের জন্য কারাগার। আর কাফেরের জন্য জান্নাত।’ (সহিহ মুসলিম ২৯৫৬)
আলোচ্য হাদিসে মুমিনের জীবনকে কারাবাসের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। কারাবাস এক পরাধীন জীবন। এ জীবনের কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কয়েদি ব্যক্তি সেখানে স্বাধীন থাকে না। বরং প্রত্যেক ক্ষেত্রেই অন্যের হুকুম বাস্তবায়ন করতে সে বাধ্য থাকে। যখন যা খাবার দেওয়া হয়, তাই গ্রহণ করতে হয়। যা পান করতে দেওয়া হয়, তাই পান করতে হয়। যেখানে বসার আদেশ করা সেখানে বসতে হয়। যেখানে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়, সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। মোট কথা, জেলখানায় নিজের কোনো মর্জি চলে না। বরং ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় অন্যের আদেশ মেনে চলতে হয়।
একজন প্রকৃত মুমিনের জীবনে কারাজীবনের এই বৈশিষ্ট্যগুলো অবশ্যই পাওয়া যায়। তাই মুমিনের পার্থিক জীবনকে ‘কারাগার’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পক্ষান্তরে কাফেরের দুনিয়ার জীবনকে জান্নাতের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। জান্নাতি জীবনের বৈশিষ্ট্য হলো, সেখানে জান্নাতিরা কোনো ধরনের আইন-কানুন বা নিয়ম-নীতির অধীনে থাকবে না। তারা থাকবে সম্পূর্ণ স্বাধীন। তারা নিজের মর্জি মাফিক জীবনযাপন করবে। মনের সব আশা-আকাক্সক্ষা পূর্ণ করবে। (মাআরিফুল হাদিস ২/৬৬)
দুনিয়ার জীবনের মোহ-মায়া ও ভালোবাসা যেন মানুষকে পরকালের পাথেয় সংগ্রহে অমনোযোগী করে না ফেলে এ জন্য আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্ট ভাষায় সতর্কবার্তা তুলে ধরেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘এটি (শাস্তি) এ জন্য যে, তারা আখেরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দেয়। আর নিশ্চয় আল্লাহ কাফের সম্প্রদায়কে হেদায়েত করেন না।’ (সুরা নাহল ১০৭) অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা জেনে রাখো যে, পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক, জাঁকজমক, পারস্পরিক গর্ব অহংকার প্রদর্শন এবং ধন-সম্পদ ও সন্তানসন্ততিতে প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। এর উপমা হলো বৃষ্টি, যার দ্বারা উৎপন্ন ফসল কৃষকদের মুগ্ধ করে। আর তা তেজস্বী হয়ে ওঠে। অতঃপর তা শুকিয়ে যায়। ফলে তুমি তা হলুদ বর্ণে দেখতে পাও। অবশেষে তা খড়কুটায় পরিণত হয়। আর পরকালে রয়েছে (কাফেরদের জন্য) কঠিন শাস্তি এবং (মুমিনদের জন্য) আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। বস্তুত দুনিয়ার জীবন ছলনাময় ভোগ ছাড়া আর কিছুই নয়।’ (সুরা হাদিদ ২০)
আলোচ্য আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, বৃষ্টি দ্বারা উৎপন্ন ফসল যেমন কৃষকদের মুগ্ধ করে, তেমনি দুনিয়ার এ জীবন ও তার ক্ষণস্থানী আনন্দ-উপভোগ কাফেরদের আনন্দিত ও খুশি করে। তারা কেবল দুনিয়া নিয়েই মেতে থাকে। কারণ তারা দুনিয়ার প্রতি সর্বাধিক আসক্ত ও লোভী। মানুষের মধ্যে তারাই দুনিয়ার প্রতি সবচেয়ে বেশি ধাবিত।
লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক ও প্রবন্ধকার।