ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

১৮ নভেম্বর, ২০২৫

ইসলাম ন্যায়ের ধর্ম। এই ধর্ম ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানায়। মহান আল্লাহ ন্যায়কে মানবজীবনের মৌলিক প্রয়োজন হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। কোরআনের একাধিক আয়াতে ইনসাফের গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, নবী-রাসুলদের প্রেরণের অন্যতম উদ্দেশ্যই ছিল মানুষকে ন্যায়বিচারের পথে পরিচালিত করা। ইসলাম এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা দিয়েছে, যেখানে অন্যায় ও বাড়াবাড়ি কোনো স্থান নেই। মহান আল্লাহ মানুষকে নির্দেশ দিয়েছেন ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে, তা নিজের বা নিকটজনের বিরুদ্ধেও হোক না কেন। আবার সতর্ক করেছেন, কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন ন্যায়বিচার থেকে বিচ্যুত না করে।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জীবনে ন্যায় প্রতিষ্ঠার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। তিনি কারও মর্যাদা বা সম্পর্কের কারণে কখনো অন্যায় সহ্য করেননি। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয় আমি আমার রাসুলদের নির্দেশনাদি দিয়ে প্রেরণ করেছি এবং তাদের সঙ্গে নাজিল করেছি কিতাব ও মাপার পাল্লা, যেন মানুষ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে।’ (সুরা হাদিদ ২৫)

মহান আল্লাহ আসমানি কিতাব নাজিল করেছেন, মানুষ যেন আকিদা-বিশ্বাস, আখলাক ও আমলের ক্ষেত্রে ন্যায়ের পথে চলতে পারে। শিথিলতা ও বাড়াবাড়ির রাস্তা পরিহার করে চলে। আর মহান আল্লাহ পাল্লা দিয়েছেন যেন লেদদেন ও বেচাকেনায় কমবেশি না করে ইনসাফের রাস্তায় চলে। উভয়ই ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ মেজাজের বহিঃপ্রকাশ।

পবিত্র কোরআনের অন্যত্র মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহতায়ালা আদেশ করেন ইনসাফ, মঙ্গল সাধন ও আত্মীয়স্বজনকে দান করার এবং নিষেধ করেন অশ্লীলতা, মন্দ কর্ম ও সীমালঙ্ঘন থেকে।’ (সুরা নাহল ৯০) এই আয়াতে তিনটি বিষয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মানুষের আকিদা-বিশ্বাস, কর্ম, স্বভাব-চরিত্র, লেনদেন, আবেগ-অনুভূতি সবই ন্যায় ও ইনসাফের মানদণ্ডে নির্ণীত হতে হবে। বাড়াবাড়ি বা শিথিলতার কারণে কোনো দিকে ঝুঁকে বা ওপরে উঠতে পারবে না। কঠিন থেকে কঠিনতর শত্রুর সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রেও ন্যায়ের পাল্লা ফেলে দেওয়া যাবে না। মানুষ নিজেকে নেকি ও কল্যাণের প্রতীক বানিয়ে অন্যের মঙ্গল কামনা করবে। ইনসাফেরও ঊর্ধ্বে উঠে দয়া ও ক্ষমা এবং সহানুভূতি ও সমবেদনার অভ্যাস গড়বে।

মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘হে ইমানদারগণ! তোমরা ইনসাফের পূর্ণ প্রতিষ্ঠাকারী, আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য প্রদানকারী হয়ে যাও, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বা তোমাদের মাতা-পিতা ও আত্মীয়স্বজনের বিপক্ষে হয়। অতএব তোমরা ইনসাফ করার বিষয়ে অন্তরের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না।’ (সুরা নিসা ১৩৫)

উল্লিখিত আয়াতে আল্লাহর জন্য সাক্ষ্যদানকারী ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠাকারী হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, যদি নিজেদের পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়ের বিপক্ষে গিয়ে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তবুও তা করতে হবে। ইসলামি স্কলাররা বলেন, এ কথা বলার কারণ হচ্ছে মানুষকে সতর্ক করা। কারণ তাদের স্বার্থরক্ষা করতে গিয়েই মানুষ ইনসাফের পথ থেকে বিচ্যুত হয়। যদিও এখানে কিছু শ্রেণির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এর মূল বিষয় হচ্ছে পারস্পরিক সম্পর্ক। অর্থাৎ সম্পর্কের কারণে মানুষ ইনসাফের পথ থেকে সরে আসে, যাকে স্বজনপ্রীতি বলে।

হিংসা-বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে মানুষ সুবিচারের পথ থেকে সরে আসে। মহান আল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আর কোনো সম্প্রদায়ের শত্রুতা যেন তোমাদের সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে। তোমরা সুবিচার করো, এটাই তাকওয়ার বেশি নিকটবর্তী।’ (সুরা মায়েদা ৮)

নবীজি (সা.) শত্রু-মিত্র, সমর্থক বা বিরোধী, মুসলিম বা অমুসলিম সবার সঙ্গে ন্যায় ও ইনসাফপূর্ণ আচরণ করতেন। নিকটাত্মীয় হলেও কোনো রকম পক্ষপাতমূলক বিচার করতেন না। কোরআনের নির্দেশ ও নবীজি (সা.)-এর জীবনাচরণে আমরা দেখতে পাই, ন্যায়বিচার কেবল আইনগত বিষয় নয়, বরং এটি বিশ্বাস, চরিত্র ও সমাজ গঠনের অপরিহার্য উপাদান। ইনসাফ এমন এক মূল্যবোধ, যা মানুষকে নিজ স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে শেখায়, অন্যের অধিকার রক্ষা করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং সমাজে শান্তি, নিরাপত্তা ও আস্থার ভিত্তি স্থাপন করে।

লেখক: ধর্মীয় নিবন্ধকার