শিক্ষা প্রশাসনের উদাসীনতায় বার্ষিক পরীক্ষা গ্রহণে ভজঘট: স্থবির মাধ্যমিক শিক্ষা

০২ ডিসেম্বর, ২০২৫

শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা এবং শিক্ষা প্রশাসনের অসহযোগিতামূলক আচরণের কারণে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আজ, মঙ্গলবার, দ্বিতীয় দিনের মতো পূর্ণ দিবস কর্মবিরতি পালন করছেন। চার দফা দাবিতে চলা এই লাগাতার কর্মবিরতিতে চলমান বার্ষিক এবং এসএসসি নির্বাচনি পরীক্ষা বর্জন করায় সারাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থায় এক চরম অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আন্দোলনরত শিক্ষকদের প্রতি সহানুভূতিশীল না হয়ে উল্টো শিক্ষা প্রশাসন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হচ্ছে।

মূল সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু বৈষম্য উদাসীনতা:

শিক্ষক নেতারা বলছেন, তাদের যৌক্তিক দাবিগুলো নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি পালন এবং শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার আবেদন জানানো সত্ত্বেও তাদেরকে আন্দোলন করে দাবি আদায় করতে বলা হয়েছে। এর পাশাপাশি, শিক্ষা ক্যাডারের কলেজ শিক্ষকরা মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) প্রায় সকল গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকায় সেখানে এক ধরনের বৈষম্য প্রকট হয়ে উঠেছে।

বিভেদ: 

শিক্ষা ক্যাডারের কলেজ শিক্ষকরা যখন কর্মবিরতি পালন করেছেন, তখন তাদের দ্রুত পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে এবং কোনো বাধা দেওয়া হয়নি।

 অন্যদিকে, বিপরীত চিত্র দেখা গেছে সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকদের বেলায়। তাদের অধীনস্থ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকরা যখন চার দফা যৌক্তিক দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন, তখন তাঁদের প্রতি কঠোর হওয়ার এবং শাস্তি গ্রহণের হুঁশিয়ারি দিয়েছে শিক্ষা প্রশাসন। সমস্যা সমাধানে এখন পর্যন্ত শিক্ষকদের ডাকাও হয়নি।

পরীক্ষা বর্জন কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি:

বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি কর্তৃক ঘোষিত এই কর্মসূচিতে শিক্ষকরা বার্ষিক ও এসএসসি নির্বাচনি পরীক্ষা  গ্রহণ ও খাতা মূল্যায়ন থেকে বিরত থাকায় শিক্ষা কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শিক্ষকদের দাবি, সরকার যদি তাঁদের দাবি পূরণ করে, তবে তাঁরা সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র ও শনিবার অবশিষ্ট পরীক্ষাগুলো গ্রহণ করে ডিসেম্বরের মধ্যে ফল প্রকাশ করবেন। কিন্তু দাবি পূরণ না হলে আগামী বুধবার নতুন করে কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা আসতে পারে।

এর জবাবে, গত সোমবার (১ ডিসেম্বর), মাউশির পরিচালক (মাধ্যমিক) অধ্যাপক খান মঈনউদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল স্বাক্ষরিত এক পরিপত্রে জানানো হয়েছে, বার্ষিক পরীক্ষায় ব্যাঘাত ঘটলে কর্মবিরতিতে থাকা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আঞ্চলিক উপ-পরিচালকদের মাধ্যমে বিঘ্ন সৃষ্টিকারীদের নাম, পদবী ও কর্মস্থলের তথ্য মাউশিতে প্রেরণের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

চাপ প্রয়োগ করেও নেই সমাধান :

জানা গেছে, চলমান অচলাবস্থা নিরসনে স্থানীয় প্রশাসনও শিক্ষকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। গতকাল সোমবার বিভিন্ন জেলা প্রশাসকরা সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের পরীক্ষা গ্রহণের জন্য চাপ প্রয়োগ করেছেন। তবে অনেক প্রধান শিক্ষকই একা পরীক্ষা গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করেছেন, কারণ সাধারণ শিক্ষকরা কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে পরীক্ষা বর্জন করছেন। কোনো কোনো স্থানে প্রধান শিক্ষকরা পরীক্ষা গ্রহণের নোটিশ দিলেও পরক্ষণেই সাধারণ শিক্ষকদের চাপে তা আবার প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়েছেন। এই ঘটনা শিক্ষকদের অনড় অবস্থান ও কেন্দ্রীয় কর্মসূচির প্রতি তাদের সমর্থনের ইঙ্গিত দেয়।

শিক্ষকদের প্রধান ৪টি দাবি:

সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এই লাগাতার আন্দোলনের মূলে রয়েছে তাদের চারটি প্রধান দাবি:

১. "সহকারী শিক্ষক" পদটিকে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারভুক্ত করে "মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর" এর গেজেট দ্রুত সময়ে প্রকাশ। ২. বিদ্যালয় ও পরিদর্শন শাখায় কর্মরত শিক্ষকদের বিভিন্ন শূন্য পদে নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন দ্রুত কার্যকর করা। ৩. সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আলোকে বকেয়া টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের মঞ্জুরি আদেশ ৩ কর্মদিবসের মধ্যে প্রদান। ৪. ২০১৫ সালের পূর্বের মতো সহকারী শিক্ষকদের ২ হতে ৩টি ইনক্রিমেন্টসহ অগ্রিম বর্ধিত বেতন সুবিধা বহাল করে গেজেট প্রকাশ।

শিক্ষা প্রশাসনের এই উদাসীনতা, শিক্ষকদের আন্দোলন করতে বাধ্য করা, এবং শাস্তির হুঁশিয়ারি মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। দাবি আদায় না হলে আসন্ন দিনগুলোতে শিক্ষা কার্যক্রমে আরও বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে মনে করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ মহল।

লেখক : জাকিরুল ইসলাম, শিক্ষক, কুষ্টিয়া জিলা স্কুল।