ক্রীড়াঙ্গন হোক দলীয় রাজনীতির প্রভাবমুক্ত

০৮ মার্চ, ২০২৬

স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে আমরা বিভিন্ন সময়ে ক্রীড়াঙ্গনে একটি স্লোগান শুনেছি। সেটি হলো, ‘রাজনীতিমুক্ত ক্রীড়াঙ্গন চাই।’ এই স্লোগান এত বছরে কার্যক্ষেত্রে কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে—এই বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে যেটি গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হলো এই স্লোগানে কী বোঝাতে চাওয়া হয়েছে। ক্রীড়াঙ্গনে কোন বার্তা দেওয়া হয়েছে।

জোরালো স্লোগানটি উচ্চারিত হয়েছে কখনো আন্তরিকতার বশবর্তী হয়ে, আবার কখনো পরিবেশ এবং পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে। দুনিয়াজুড়ে তো একটিই কথা, ‘ক্রীড়াঙ্গনে রাজনীতির স্থান নেই।’ এই নীতিবাক্যের কার্যকারিতা কতটুকু? যা হোক, আজ সেই আলোচনা নয়।
আমরা বলছি, ক্রীড়াঙ্গন চাই রাজনীতিমুক্ত।

রাজনীতি তো এক ধরনের মানবসেবা। এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। রাজনীতি করা দূষণীয় নয়। আবার রাজনীতি বিতর্ক এবং সমালোচনার ঊর্ধ্বেও নয়।

এখানে প্রশংসার পাশে আছে বিতর্কও। দেশের রাজনীতিতে পালাবদলের সময় ‘পল্টি’ দেওয়া শব্দটি বেশ জোরেশোরে ব্যবহৃত হয়। এটির ব্যাখ্যায় শুনেছি, ‘কী করব আমি তো সব সময় বর্তমান সরকার দল করি। আর তাই অতীত ফেলে দিয়ে বর্তমানের সঙ্গে ভিড়ে যাই। মানুষের পাশে তো থাকতে হবে।

ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে আজ কথা বলছি। আর তাই এই পরিধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে চাচ্ছি। রাজনীতি করা তো একটি মহৎ সেবা কার্যক্রম। এটি নীতি এবং আদর্শের মোড়কে মোড়ানো। যিনি রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তিনি তো আমাদের সমাজের মানুষ। বলতে পারি সচেতন মানুষ। রাজনীতির বাইরে তাঁর নিজস্ব একটা জগৎ আছে, আছে মন। আছে জীবিকা নির্বাহের জন্য পেশা। রাজনীতির সঙ্গে যিনি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত, তাঁর বা তাঁদের ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে ‘প্যাশন’ বা ভাবাবেগ থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কেউ যদি মনে করেন, তাঁর প্রশান্তির জায়গাটা অন্যভাবে উপভোগ করবেন, এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন, তাহলে এ ক্ষেত্রে প্রবেশে তো বাধার কোনো অবকাশ নেই। রাজনীতির সঙ্গে কেউ জড়িত, অতএব তিনি ক্রীড়াঙ্গনের প্রত্যক্ষ কার্যক্রমে শরিক হতে পারবেন না, এটি তো হতে পারে না। একজন মানুষ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, আবার ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে জড়িত হয়ে তাঁর মূল্যবান সময়, শ্রম, মেধা এবং প্রয়োজনে কখনো কখনো আর্থিক সহযোগিতার হাত প্রশস্ত করছেন—এটি তো কোনো সমস্যা নয়।

কিছুদিন আগে একান্তে কথা হচ্ছিল দেশের করপোরেট জগতের পরিচিত ব্যক্তিত্ব, বসুন্ধরা গ্রুপের চিফ ফিন্যানশিয়াল অফিসার এবং গ্রুপের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর মো. ইমরুল হাসানের সঙ্গে। পেশায় অ্যাকাউন্ট্যান্ট হলেও তাঁর আরেকটি প্যাশন হলো ক্রীড়াঙ্গনের সান্নিধ্য। এই জগিট তাঁকে ভীষণভাবে টানে। মো. ইমরুল হাসান বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং বসুন্ধরা কিংসের প্রেসিডেন্ট। পেশাগত দায়দায়িত্ব পালনের পর নিজস্ব সময়ে ফুটবল, ব্যাডমিন্টনসহ বিভিন্ন ধরনের খেলায় মেতে ওঠেন। ফুটবল ফেডারেশন ও ক্লাবের সাংগঠনিক কাজগুলো করেন। সময় দেন। এই বিষয়গুলো করেন তাঁর প্যাশন থেকে। আর এটি তিনি উপভোগ করেন।

মো. ইমরুল হাসান বলেছেন, ‘রাজনীতিমুক্ত ক্রীড়াঙ্গন বলতে কী বোঝানোর চেষ্টা করা হয় আমি জানি না। প্রচুর মানুষ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত। তাঁরা দলীয় নীতি ও আদর্শে বিশ্বাসী। তাঁদের অনেকেই সরাসরি এবং পরোক্ষভাবে আবার ক্রীড়াঙ্গন সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত আছেন। আমার কাছে মনে হয় বা আমার যতটুকু পর্যবেক্ষণ, তাতে যাঁরা রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, এই সব ব্যক্তি তাঁদের ব্যক্তিত্ব, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং নেতৃত্বের গুণাবলি দিয়ে কমবেশি ক্রীড়াঙ্গনে দাগ কাটতে সক্ষম হয়েছেন। ক্রীড়াঙ্গনে সাংগঠনিক দক্ষতার ঘাটতি আছে। এতে ক্রীড়াঙ্গন ভুগছে।’

আমার যেটি মনে হয়, সেটি হলো ‘রাজনীতিমুক্ত ক্রীড়াঙ্গন’ বিষয়টির সঠিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন। সেটি হলো, ক্ষমতাসীন দলের দলীয় রাজনীতির প্রভাব ক্রীড়াঙ্গনে কাম্য নয়। এটি ক্রীড়াঙ্গনের চেতনা, মূল্যবোধ, চলমান সংস্কৃতির বড় ক্ষতি করে। ক্রীড়াঙ্গন পরিচালিত হওয়া উচিত ক্রীড়া সংগঠকদের দ্বারা, যাঁদের এখান থেকে পাওয়ার কিছু নেই, আছে দেওয়ার অনেক কিছু। দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, অনেক সময় ক্রীড়াঙ্গনে দলীয় প্রাধান্য বিস্তারের জন্য দল সমর্থিত কাউকে কাউকে ক্রীড়াঙ্গনে পুনর্বাসন করে পুরস্কৃত করা হয়েছে। এতে অনেক নিবেদিত ক্রীড়া সংগঠক কোণঠাসা এবং অবহেলিত হয়ে স্বেচ্ছায় ক্রীড়াঙ্গন থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছেন। ক্রীড়াঙ্গনে এই মানুষগুলোর সার্ভিস বা অবদানের দরকার ছিল। ক্রীড়াঙ্গন পরিচালনা, ক্লাব ও বিভিন্ন ফেডারেশনের সঙ্গে যদি সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী, নেতা, সংসদ সদস্য এবং অন্যরা জড়িত হন—এটি তো দোষের কিছু নয়, যতক্ষণ না তাঁরা নিজস্ব দলীয় রাজনীতিকে ক্রীড়াঙ্গনে টেনে না আনেন। রাজনৈতিক চিন্তা-ভাবনায় দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টা না করেন।

আমার সুযোগ হয়েছে সেই মধ্য ষাটের দশক থেকে লেখালেখি করার জন্য ক্রীড়াঙ্গনকে অনুসরণ করার। জনপ্রিয় একটি সময় প্রচুর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা দলের সিনিয়র রাজনৈতিক নেতা, বিভিন্ন দলের কার্যনির্বাহী পরিষদের অনেক সদস্য ক্লাব ও বিভিন্ন খেলার সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাঁদের নাম উল্লেখ করতে চাচ্ছি না। তাঁরা সরকার ও বিরোধী দলের রাজনীতির সঙ্গে ছিলেন। এই সব ব্যক্তি কখনো ক্লাব ও খেলার সংস্থায় দলীয় রাজনীতিকে টেনে আনেননি। যাঁরা পুরনো দিনের সংগঠক, যাঁরা সত্তরোর্ধ্ব ক্রীড়ানুরাগী, তাঁরা আশা করি আমার সঙ্গে সহমত পোষণ করবেন। ক্রীড়াঙ্গনের বাইরে এই সব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সব সময় বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দিয়েছেন বিভিন্ন ইস্যুতে, কিন্তু কখনো ক্রীড়াঙ্গনে তাঁদের দলীয় এজেন্ডা বা অন্য কিছু টেনে আনেননি। তাঁরা সৃষ্টি করেছিলেন একটি চমৎকার সংস্কৃতি। ক্রীড়াঙ্গনে তাঁদের সবার পরিচয় ছিল ক্রীড়া সংগঠক।

কিন্তু সেই নীতি ও আদর্শে একসময় বিচ্যুতি ঘটতে দেখেছি। সেটি একটি উদাহরণ দিয়ে লেখা শেষ করতে চাচ্ছি। বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম, যিনি বর্তমান সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন, তিনি একসময়ের কৃতী ফুটবলার। পাকিস্তান জাতীয় দলেও কৃতিত্বের সঙ্গে খেলেছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দুই ম্যাচে মোহামেডানের হয়ে খেলে সাত গোল করার পরও হাফিজ উদ্দিনকে বাংলাদেশ জাতীয় দলে খেলার সুযোগ দেওয়া হয়নি। অথচ ‘স্ট্রাইকার’ হিসেবে তিনি ছিলেন সে সময় মাঠের সেরা। হাফিজ উদ্দিনের দোষ হলো, তাঁর বাবা পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচিত সদস্য ছিলেন। তিনি জাসদের সভাপতি ছিলেন। আর তাই হাফিজ উদ্দিনকে বাংলাদেশ জাতীয় দলে নেওয়া হয়নি। তখন হাফিজ উদ্দিন সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। আর তাই তিনি কোনো ধরনের উচ্চবাচ্য করতে পারেননি।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, এআইপিএস এশিয়া। আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন প্যানেল রাইটার, ফুটবল এশিয়া