১৬ এপ্রিল, ২০২৬
মাসরাত মুখতারকে জন্মদিনে তার বাবা তাকে সোনার কানের দুলগুলো উপহার দিয়েছিলেন। ২১ মার্চ দক্ষিণ এশিয়ায় ঈদুল ফিতর উদযাপিত হচ্ছিল। তখন মাসরাত মুখতার ঈদের আনন্দ না করে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে বিপদে থাকা বেসামরিক মানুষদের সাহায্যের জন্য নিজের সেই কানের দুল দান করে দেন। একটি ত্রাণ সংগ্রহ প্রকল্পে তিনি এই অনুদান দেন।
ভারত-শাসিত কাশ্মীরের তিনি ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি এক হাজার ৬০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে থাকা মানুষের জন্য নগদ অর্থ, গৃহস্থালির জিনিসপত্র এবং ব্যক্তিগত সম্পদ দান করেন। তার চাচাতো ভাইবোনেরাও পিছু পিছু এলো।
প্রত্যেকেই ব্যক্তিগত মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে এসেছিল। পরিবারগুলো তামার বাসনপত্র, গবাদি পশু, সাইকেল এবং সঞ্চয়ের অংশবিশেষ দান করল।
শিশুরা তাদের মাটির ব্যাংক ভেঙে, বহু বছর ধরে যত্ন করে জমানো সঞ্চয় বিলিয়ে দিল। দোকানদার ও ব্যবসায়ীরাও তাদের আয়ের অংশবিশেষ তুলে দিয়েছে।
বুদগামের ৫৫ বছর বয়সী মাসরাত মুখতার বলেন, ‘আমরা যা ভালোবাসি, সেটাই দান করি। এতে আমরা তাদের আরো কাছে অনুভব করি।
’ তিনি আরো বলেন, এই অঞ্চলকে ঐতিহাসিকভাবে ‘লিটল ইরান’ নামেও ডাকা হয় এবং এটি ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের প্রতীক। তিনি আরো বলেন, ‘সময় ও সংঘাতের মধ্যেও এই বন্ধন টিকে আছে।’
এই সম্পর্কটি ছয় শতাব্দীরও বেশি পুরোনো ঐতিহাসিক যোগসূত্রের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। যুদ্ধের সময় তা আরো প্রকাশ পেয়েছে। এতে ইরানি কর্তৃপক্ষের স্বীকৃতি মিলেছে, তবে ভারতের কর্মকর্তারা কিছু তহবিল সংগ্রহের পদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেছেন।
এক মেয়ের সম্পদ, আরেক মেয়ের জন্য
ভারত-শাসিত কাশ্মীরের বৃহত্তম শহর শ্রীনগরের শিয়া-সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা জাদিবালে ৭৩ বছর বয়সী তাহেরা জান প্রতিবেশীদের তামার হাঁড়ি দান করতে দেখছিলেন। জান বলেন, ‘কাশ্মীরিরা ঐতিহ্যগতভাবে তাদের মেয়েদের বিয়ের জন্য এই বাসনপত্র সংগ্রহ করে। আমরা এর পরিবর্তে সেগুলো সেইসব মেয়েদের দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যারা হামলায় তাদের মা ও বোনকে হারিয়েছে।’
২৪ বছর বয়সী মিনি-ট্রাক চালক সাদাকাত আলী মীর তার জীবিকার জন্য চালানো দুটি গাড়ির মধ্যে একটি দান করে দিয়েছেন। অন্যান্য দাতারা বাইসাইকেল, স্কুটার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়েছেন। নয় বছর বয়সী জয়নাব জানসহ শিশুরা মাটির ব্যাংক দান করেছে।
এটা নিশ্চিত যে, ভারত-শাসিত কাশ্মীরের জনসংখ্যার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ শিয়া হওয়ায় ইরানের যুদ্ধ এই অঞ্চলে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু ইরানের জন্য অনুদান শুধু শিয়াদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বেশ কয়েকটি সুন্নি পরিবার ইরানিদের দান করেছে। ওই ঈদের সময় কিছু দোকানদার তাড়াতাড়ি দোকান বন্ধ করেছেন এবং পরিবারগুলোও সাহায্যের জন্য তাদের দৈনন্দিন রুটিনে পরিবর্তন এনেছে।
রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরাও এতে অংশ নিয়েছেন। বুদগামের সাংসদ আগা সৈয়দ মুনতাজির মেহেদী তার এক মাসের বেতন দান করেছেন। শিয়া আলেম এবং পিপলস কনফারেন্স পার্টির নেতা ইমরান রেজা আনসারি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করেছেন।
পাকিস্তান, ইরাক এবং অন্যান্য দেশ থেকেও ইরানিদের সমর্থনে একই ধরনের অনুদান কর্মসূচির খবর পাওয়া গেছে। কিন্তু ভারত-শাসিত কাশ্মীরে ইরানের প্রতি এই বিপুল সমর্থনের মূলে রয়েছে সেই বিরল সাংস্কৃতিক বন্ধন, যা কাশ্মীর এবং তৎকালীন পারস্যের মধ্যে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিদ্যমান। উল্লেখ্য, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার পর এই কাশ্মীরে বড় বড় সমাবেশও অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
‘লিটল ইরান’
১৪শ শতকে ইরানের হামাদান থেকে সুফি পণ্ডিত মির সৈয়দ আলী হামাদানি কাশ্মীরে আসেন। তিনি সেখানে ধর্মীয় প্রথা, শিল্পকলা এবং পারস্য সাহিত্য ঐতিহ্য ছড়িয়ে দেন। এর প্রভাব আজও দেখা যায় ঐতিহাসিক মসজিদগুলোর স্থাপত্যে পারস্য ধাঁচ রয়েছে এবং পারস্য ভাষাও স্থানীয় সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
সেন্ট্রাল এশিয়ান স্টাডিজের গবেষক ইরশাদ আহমদ বলেন, ‘এই ঐতিহাসিক সম্পর্কের কারণেই ত্রাণ সংগ্রহের মতো উদ্যোগগুলোতে মানুষ অংশ নেয়। তাদের প্রার্থনা, আচার-অনুষ্ঠান এবং শিল্পরীতিতেও এই দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ছাপ রয়েছে। কাশ্মীরকে ঐতিহাসিকভাবে ‘ইরান-এ-সাগীর’ বা ‘লিটল ইরান’ নামেও ডাকা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব দান শুধু আর্থিক মূল্য বহন করে না, বরং এর একটি গভীর আবেগীয় ও সাংস্কৃতিক অর্থ রয়েছে। নিউ দিল্লির মানবিক কার্যক্রম বিষয়ক লেকচারার সাকিনা হাসান বলেন, ‘মানুষ শুধু জিনিসপত্র দিচ্ছে না, তারা এক ধরনের আবেগ ও সম্পর্কও ভাগ করে নিচ্ছে।’
যুদ্ধের কারণে ইরানে এখন পর্যন্ত দুই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি বর্তমানে কার্যকর রয়েছে।
লাখ লাখ টাকার অনুদান
কাশ্মীর থেকে আসা অনুদানের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমান অনুযায়ী, দানের মোট মূল্য প্রায় ৬ বিলিয়ন রুপি (প্রায় ৬৪ মিলিয়ন ডলার)। এর মধ্যে রয়েছে নগদ অর্থ, সোনা, গয়না, গৃহস্থালির জিনিসপত্র, গবাদিপশু এবং যানবাহন। শ্রীনগর, বুদগাম, বারামুলা এবং উত্তর কাশ্মীরের বিভিন্ন এলাকায় স্থাপিত সংগ্রহ কেন্দ্রগুলোতে স্বেচ্ছাসেবকরা এসব দান নথিভুক্ত করেন। অনেক ছোট ছোট দান, যেমন কয়েন, পিগি ব্যাংক, এবং বাসনপত্র সংখ্যায় অনেক বেশি হলেও মোট পরিমাণে বড় অংশ তৈরি করেছে।
শ্রীনগরের একটি কেন্দ্রীয় সংগ্রহ কেন্দ্র পরিচালনাকারী স্বেচ্ছাসেবক সৈয়দ আসিফি বলেন, সীমিত আয়ের মানুষরাও যা সম্ভব তাই নিয়ে এসেছে। স্থানীয় চিকিৎসকেরা মেডিকেল কিট তৈরি করেন এবং শিক্ষার্থী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী ত্রাণ সংগ্রহে অংশ নেয়।
ভারতের দিল্লিতে অবস্থিত ইরান দূতাবাস এক্স-এ এক পোস্টে কাশ্মীরের জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলে, তারা ইরানের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে। সেখানে বলা হয়, এই মানবিক সহায়তা ও সংহতি দীর্ঘস্থায়ী।
দূতাবাস একটি ভিডিওও শেয়ার করে, যেখানে এক বিধবা নারী তার স্বামীর স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রাখা সোনার গয়না দান করতে দেখা যায়। পরবর্তীতে ওই পোস্টটি দূতাবাস মুছে ফেলে, তবে পরে আবার একটি পোস্ট দিয়ে ভারত ও কাশ্মীরের মানুষকে ধন্যবাদ জানায়।
দূতাবাস জানায়, ভারতের মোট দানের একটি বড় অংশই এসেছে কাশ্মীর থেকে, স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী যা প্রায় ৪০ শতাংশেরও বেশি। যদিও বেশিরভাগ অনুদান মানবিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়, তবে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এর সম্ভাব্য অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ এবং রাজ্য তদন্ত সংস্থা (এসআইএ) জানিয়েছে, সংগৃহীত কিছু তহবিল বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর স্থানীয় নেটওয়ার্কের দিকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘যারা সরাসরি ইরানি দূতাবাসে টাকা জমা দিচ্ছেন, তাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। স্বচ্ছ নজরদারি ছাড়া দালালদের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ উদ্দিষ্ট প্রাপকের কাছে নাও পৌঁছাতে পারে।’ কর্তৃপক্ষ তহবিল সংগ্রহের নিয়মকানুন মেনে চলা নিশ্চিত করতে স্বেচ্ছাসেবকদের রেকর্ড রাখার জন্যও বলেছে।