বেশি আম খেলে শরীরের ওজনের যে পরিবর্তন হয়

০৭ মে, ২০২৬

গ্রীষ্মকাল এলেই বাজারে, হাটে, গাছের ডালে সবখানেই রাজত্ব শুরু হয় আমের। রসালো, মিষ্টি, সুগন্ধি এই ফলটি অনেকের কাছেই শুধু খাবার নয়, এক ধরনের আবেগও। কিন্তু আম নিয়ে একটি প্রশ্ন প্রায়ই শোনা যায়, আম খেলে কি সত্যিই ওজন বাড়ে?

অনেকেই ডায়েটের সময় আম খেতে ভয় পান, আবার কেউ কেউ মনে করেন আম খেলেই বুঝি মোটা হয়ে যাওয়া নিশ্চিত। বাস্তবতা কি সত্যিই এতটা সরল? নাকি এর পেছনে আছে আরও কিছু বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা? চলুন বিস্তারিতভাবে জেনে নেওয়া যাক।

আমের পুষ্টিগুণ

আমকে অনেকেই শুধু ‘মিষ্টি ফল’ হিসেবে দেখেন। কিন্তু আসলে এটি একটি পুষ্টিকর ফল, যেখানে রয়েছে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ভিটামিন ই, ফাইবার, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, পটাশিয়াম। এই উপাদানগুলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, ত্বক ভালো রাখে এবং হজমে সাহায্য করে। একটি মাঝারি আকারের আমে প্রায় ৯০–১৩০ ক্যালোরি থাকতে পারে, যা ফলের ধরন ও আকার অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়।

তাহলে প্রশ্ন হলো-আম কি ওজন বাড়ায়?

সহজ করে বললে উত্তর হবে, শুধু আম খেলে সরাসরি ওজন বাড়ে না। ওজন বাড়া বা কমা নির্ভর করে পুরো দিনের ক্যালোরি গ্রহণ ও খরচের উপর। যদি আপনি আপনার প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ক্যালোরি গ্রহণ করেন, তাহলে ওজন বাড়বে, এটা আম হোক বা অন্য কোনো খাবার। আমেও ক্যালোরি আছে, তাই অতিরিক্ত খেলে তা শরীরের ফ্যাট হিসেবে জমা হতে পারে। কিন্তু পরিমিত পরিমাণে খেলে এটি ওজন বাড়ানোর প্রধান কারণ নয়।

কোথায় সমস্যা হয়?

অনেকেই আম খাওয়ার সময় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন না। বিশেষ করে একসাথে ৩–৪টি আম খাওয়া, চিনি বা দুধের সঙ্গে আম মিশিয়ে খাওয়া, আমের জুস অতিরিক্ত পান করা। এই অভ্যাসগুলো ক্যালোরি অনেক বাড়িয়ে দেয়। তখনই ওজন বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

আম ওজন বৃদ্ধির আসল সম্পর্ক

ওজন বাড়ে মূলত তিনটি কারণে। যথা- অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণ, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস। আম এই তিনটির মধ্যে শুধুমাত্র প্রথমটির সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ আপনি যদি নিয়ন্ত্রণ না রাখেন, তখনই সমস্যা হয়।

আম কি ডায়েটে খাওয়া যায়?

হ্যাঁ, অবশ্যই খাওয়া যায়। অনেক ডায়েট প্ল্যানেও ফল হিসেবে আম রাখা হয়, তবে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ জরুরি। একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি দিনে সাধারণত ১টি মাঝারি আম বা অর্ধেক বড় আম খেতে পারেন, যদি তার বাকি খাবারগুলো ভারসাম্যপূর্ণ হয়।

আম খাওয়ার সঠিক সময়

সময়ও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ভুল সময়ে আম খেলে হজমে সমস্যা বা অতিরিক্ত ক্যালোরি জমা হতে পারে। সেরা সময়গুলো হলো- সকালের নাস্তার পর, দুপুরের খাবারের পর হালকা ডেজার্ট হিসেবে, বিকেলের স্ন্যাক্স হিসেবে। রাতে ঘুমানোর আগে আম খাওয়া এড়িয়ে চলা ভালো, কারণ তখন শরীরের ক্যালোরি খরচ কম থাকে।

ডায়াবেটিস ওজন

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য আম কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, কারণ এতে প্রাকৃতিক চিনি (ফ্রুকটোজ) থাকে। তবে পরিমিত পরিমাণে খেলে সমস্যা হয় না। একইভাবে যারা ওজন কমাতে চাইছেন, তাদের জন্যও আম পুরোপুরি নিষিদ্ধ নয়। বরং সঠিক পরিমাণে খেলে এটি শরীরকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি দিতে পারে।

আম খেলে ওজন না বাড়ার কিছু সহজ নিয়ম

·         দিনে ১টির বেশি আম না খাওয়া

·         আমের জুস না খেয়ে আসল ফল খাওয়া

·         মিষ্টি খাবারের সঙ্গে আম না মেশানো

·         নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম করা

·         খাদ্য তালিকায় ভারসাম্য রাখা

·         আম খাওয়ার উপকারিতা (ওজন ছাড়াও)

ওজন নিয়ন্ত্রণের বাইরে আমের আরও অনেক উপকার আছে। যেমন- চোখের জন্য ভালো, ত্বক উজ্জ্বল করে, হজম শক্তি বাড়ায়, শরীরে শক্তি যোগায়, ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী করে। তাই শুধু ‘ওজন বাড়ে’ ভেবে আমকে বাদ দেওয়া ঠিক নয়।

ভুল ধারণা কেন তৈরি হয়?

আম নিয়ে ভয়ের মূল কারণ হলো এর মিষ্টি স্বাদ। অনেকেই মনে করেন মিষ্টি মানেই ফ্যাট। কিন্তু বাস্তবে সব মিষ্টি খাবারই সমানভাবে ক্ষতিকর নয়। আরেকটি কারণ হলো, গরমকালে মানুষ বেশি আম খায় এবং শারীরিক পরিশ্রম তুলনামূলক কম হয়। ফলে ওজন বাড়লে অনেকে দোষ দেন আমকে, অথচ আসল কারণ থাকে জীবনযাত্রায়।

আম খেলে ওজন বাড়ে কি না, এর উত্তর এক কথায় ‘না’ বা ‘হ্যাঁ’ নয়। বিষয়টি নির্ভর করে আপনি কতটা খাচ্ছেন এবং কীভাবে খাচ্ছেন তার ওপর। পরিমিত পরিমাণে আম খেলে এটি ওজন বাড়ায় না, বরং শরীরের জন্য উপকারী একটি ফল। কিন্তু অতিরিক্ত খেলে যেকোনো খাবারের মতোই এটি ক্যালোরি বাড়িয়ে ওজন বৃদ্ধির কারণ হতে পারে। তাই ভয় না পেয়ে, বুদ্ধিমানের মতো আম উপভোগ করুন। কারণ গ্রীষ্মকাল আর আম একে অপরের সঙ্গে জড়িত এক মিষ্টি সম্পর্ক।

তথ্যসূত্র: হেলথ লাইন