০৯ মে, ২০২৬
মানুষ সাধারণত বড় গুনাহকে ভয় পায়, কিন্তু ছোট ছোট পাপকে তেমন গুরুত্ব দেয় না। অথচ শয়তান মানুষের ঈমান ও আমল ধ্বংস করার জন্য অনেক সময় বড় গুনাহের দরজা নয়, বরং ছোট পাপের দরজাই ব্যবহার করে। একটি ছোট আগুনের স্ফুলিঙ্গ যেমন মুহূর্তেই বিশাল অগ্নিকাণ্ডের কারণ হতে পারে, তেমনি অবহেলায় করা ছোট ছোট গুনাহ একসময় মানুষের অন্তরকে কালো করে দেয়, ইবাদতের স্বাদ নষ্ট করে দেয় এবং ধীরে ধীরে তাকে বড় গুনাহের দিকে ঠেলে দেয়। একটি মিথ্যা কথা, হারাম দৃষ্টিপাত, গীবত, অশ্লীল কথা, নামাজে অলসতা কিংবা গুনাহকে তুচ্ছ মনে করা—এসবকে মানুষ ছোট মনে করলেও আল্লাহর কাছে তা ভয়াবহ হতে পারে।
কারণ পাপের আকার নয়, বরং কার আদেশ অমান্য করা হচ্ছে সেটিই সবচেয়ে বড় বিষয়। একজন মুমিনের হৃদয় তাই ছোট গুনাহকেও ভয় করে, যেমন একজন পথিক অন্ধকার রাতে বিষধর সাপকে ভয় করে। তাইতো মহানবী (সা.) ছোট গুনাহকে অবহেলা করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। কারণ সামান্য সামান্য করে জমতে জমতে এগুলোই মানুষের আমলনামাকে ভারী করে তোলে এবং অন্তরকে কঠিন ও অন্ধকারাচ্ছন্ন করে দেয়।
তাই একজন সচেতন মুমিন সবসময় নিজের কথা, কাজ ও চিন্তার হিসাব নেয় এবং ছোট পাপ থেকেও বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘হে আয়েশা, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গুনাহ থেকেও সাবধান হও। কেননা সেগুলোর জন্যও আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪২৪৩)
আলোচ্য হাদিসে মহানবী (সা.) মুমিনদের ছোট ছোট গুনাহের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন।
কেননা মানুষ সাধারণত ছোট ছোট গুনাহের ব্যাপারে উদাসীন হয় এবং তা ধীরে ধীরে মানুষকে অপরাধপ্রবণ করে তোলে। আর একসময় সে বড় পাপে জড়িয়ে পড়ে এবং ইহকাল ও পরকালে লজ্জিত হয়। হাদিসে ব্যবহৃত ‘মুহাক্কারাত’ শব্দের ব্যাখ্যায় হাদিসবিশারদরা বলেছেন, এমন পাপ, যার প্রতি মানুষ ভ্রুক্ষেপ করে না। ইমাম মুনাভি (রহ.) বলেন, ‘মুহাক্কারাত হলো ছোট ছোট পাপ। মহানবী (সা.) তা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন।
কারণ তা বড় বড় পাপের পথে মানুষকে পরিচালিত করে। যেমন ছোট আনুগত্যগুলো মানুষকে বড় বড় আনুগত্যের জন্য প্রস্তুত করে।’ (ফায়জুল কাদির : ৩/১৬৪)
সাহাবিরা কোনো পাপকেই ছোট মনে করতেন না; বরং তারা ছোট-বড় সব পাপের ব্যাপারে সাবধান থাকতেন এবং তা পরিহার করতেন। আনাস (রা.) বলেন, ‘তোমরা এমন সব কাজ করে থাকো যা তোমাদের দৃষ্টিতে চুল থেকেও চিকন। কিন্তু নবী (সা.)-এর সময়ে আমরা এগুলোকে ধ্বংসকারী মনে করতাম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪৯২)
ছোট পাপ শয়তানের হাতিয়ার। ছোট ছোট পাপের মাধ্যমে শয়তান মানুষকে বিভ্রান্ত করে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘শয়তান পৃথিবীতে আল্লাহর ইবাদতের ব্যাপারে হতাশ হয়ে গেছে। কিন্তু সে ছোট পাপের ব্যাপারে তোমাদের ওপর সন্তুষ্ট।’ (কানজুল উম্মাল, হাদিস : ৩৫১৪১)
হাদিসবিশারদরা বলেন, ছোট পাপের ব্যাপারে শয়তান সন্তুষ্ট হওয়ার কারণ হলো মানুষ ছোট পাপের প্রতি উদাসীন এবং এ বিষয়ে তারা বেপরোয়া হয়ে থাকে।
ছোট ছোট অপরাধ ও পাপ মানুষের ভেতরকার ভালো বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি ক্রমেই নষ্ট করে ফেলে, মানুষকে ঈমান ও ইসলামশূন্য করে ফেলে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিষয়টিকে এভাবে তুলে ধরেছেন, ‘তোমরা ছোট ছোট পাপ থেকে বেঁচে থাকো। কেননা ছোট পাপের দৃষ্টান্ত হলো—কোনো সম্প্রদায় উপত্যকার পাদদেশে উপনীত হলো। অতঃপর ছোট ছোট জ্বালানি একত্র করে রুটি তৈরি করে। নিশ্চয়ই ছোট ছোট পাপ যখন কাউকে পেয়ে বসে তখন তা তাকে ধ্বংস করে ছাড়ে।’ (মুসনাদে আহমদ : ৫/৩৩১)
ইমাম গাজালি (রহ.) বলেন, ‘মানুষের দৃষ্টি যেসব পাপ ছোট তা অন্য পাপের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। এমনকি একসময় ব্যক্তি মৃত্যুর সময় ঈমান হারিয়ে চির হতভাগ্যে পরিণত হয়।’ (ইহদাউদ দিবাজা : ৫/৫৬৮)
পাপ যত ছোটই হোক না কেন, তার জন্য পরকালে মহান আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘এবং উপস্থিত করা হবে আমলনামা এবং তাতে যা লেখা থাকবে তার কারণে আপনি অপরাধীদের আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়তে দেখবেন। তারা বলবে, হায়, দুর্ভাগ্য! এটি কেমন কিতাব যাতে ছোট-বড় কোনো কিছুই বাদ যায়নি; বরং সব কিছুর হিসাব তাতে রয়েছে। তারা তাদের কৃতকর্ম উপস্থিত পাবে এবং আপনার প্রতিপালক কারো প্রতি অবিচার করবেন না।’ (সুরা : কাহাফ, আয়াত : ৪৯)
অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘কেউ অণু পরিমাণ ভালো কাজ করলে সে তা দেখবে এবং কেউ অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করলে সে তাও দেখবে।’ (সুরা : জিলজাল, আয়াত : ৭-৮)
অতএব, ছোট পাপ কখনোই ছোট নয়। মানুষ যখন একটি গুনাহকে তুচ্ছ মনে করতে শুরু করে, তখন সেটিই তার ঈমানের জন্য বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ছোট পাপের প্রতি উদাসীনতা ধীরে ধীরে অন্তরের লজ্জা ও তাকওয়া কমিয়ে দেয়, ফলে একসময় বড় গুনাহ করতেও আর ভয় লাগে না। তাই একজন মুমিনের কর্তব্য হলো—প্রকাশ্য ও গোপন সব ধরনের গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করা, সঙ্গে সঙ্গে তাওবা করা এবং নিজের অন্তরকে সবসময় আল্লাহর ভয় ও সচেতনতায় জীবিত রাখা। মনে রাখতে হবে, যে ব্যক্তি ছোট পাপকে ভয় করে, আল্লাহ তাকে বড় পাপ থেকেও হেফাজত করেন। আর যে ব্যক্তি ছোট গুনাহকে অবহেলা করে, সে ধীরে ধীরে নিজের অজান্তেই ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ছোট-বড় সব ধরনের গুনাহ থেকে হেফাজত করুন এবং সর্বদা তাওবা ও তাকওয়ার জীবন দান করুন। আমিন।