১৫ মে, ২০২৬
সাম্প্রতিক সময়ে মোবাইল ফোন, টিভি, ট্যাব বা কম্পিউটার স্ক্রিনে বেশি আসক্ত হচ্ছে শিশুরা। এতে শিশুর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার স্কুলপড়ুয়া শিশুদের একটি বড় অংশ মোবাইল ফোন, টিভি, ট্যাব বা কম্পিউটারের মতো ইলেকট্রনিক যন্ত্রের স্ক্রিনে বা পর্দায় চোখ রেখে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ ঘণ্টা কাটায়। এর ফলে তাদের ঘুম কমে যাচ্ছে, ওজন বাড়ছে, মাথাব্যথা ও চোখের সমস্যা হচ্ছে। মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
দুই বছর ধরে ঢাকার ছয়টি স্কুলের ৪২০ জন শিশুর ওপর এই গবেষণা করা হয়। গবেষণার ফলাফল ৪ মে জার্নাল অব মেডিক্যাল ইন্টারনেট রিসার্চ (জেএমআইআর) হিউম্যান ফ্যাক্টরস-এ প্রকাশিত হয়েছে।
এই গবেষণার প্রধান গবেষক ও আইসিডিডিআরবির সহকারী বিজ্ঞানী শাহরিয়া হাফিজ কাকন বলেন, ‘শিশুদের দেরিতে ঘুমানো, বারবার মাথাব্যথা বা চোখের অস্বস্তি, অস্বাভাবিক খিটখিটে মেজাজ বা নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, বাইরের খেলাধুলার প্রতি অনীহা অথবা মনোযোগ কমে যাওয়ার মতো লক্ষণগুলোকে মা–বাবার উপেক্ষা করা উচিত নয়।’
গবেষণায় আরও বলা হয়, এমন পরিস্থিতিতে শিশুদের, বিশেষ করে স্কুলের শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং ভালো থাকার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রাথমিক উদ্বেগের কারণ হচ্ছে, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম নিষ্ক্রিয় জীবনযাপনকে উৎসাহিত করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, পাঁচজন শিশুর মধ্যে চারজন শিশু (৮৩%) প্রতিদিন দুই ঘণ্টার বেশি সময় ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহার করে, যা শিশুদের বিনোদনমূলক স্ক্রিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রায় দুই ঘণ্টার সীমাকে ছাড়িয়ে গেছে। গড়ে শিশুরা দিনে প্রায় ৪ দশমিক ৬ ঘণ্টা সময় কাটায় স্ক্রিনে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিশু চোখের সমস্যায় এবং ৮০ শতাংশ শিশু প্রায়ই মাথাব্যথায় ভুগছে। যারা দিনে ২ ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে, তারা গড়ে মাত্র ৭ দশমিক ৩ ঘণ্টা ঘুমায়, যা এই বয়সের শিশুদের সুষ্ঠু বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুমের তুলনায় অনেক কম।
এ ছাড়া প্রায় ১৪ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার শিকার এবং যারা বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে, তাদের মধ্যে এই হার বেশি। স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, শৈশবে দীর্ঘমেয়াদি ঘুমের অভাব স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, শারীরিক বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, প্রতি পাঁচজন শিশুর মধ্যে প্রায় দুজন শিশু দুশ্চিন্তা, অতিচঞ্চলতা বা আচরণগত সমস্যার মতো এক বা একাধিক মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে।
বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক গবেষণায়ও শিশুদের অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে অপর্যাপ্ত ঘুম, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া, স্থূলতা, উদ্বেগ এবং পড়াশোনায় দুর্বল ফলাফলের যোগসূত্র পাওয়া গেছে।
এ সমস্যার সমাধানে শিশুদের বাইরের খেলাধুলা, শারীরিক পরিশ্রম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ডিজিটাল ডিভাইস-মুক্ত পারিবারিক সময় কাটাতে উৎসাহিত করা জরুরি। শিশুদের বিতর্ক, দলবদ্ধভাবে পড়াশোনা, লাইব্রেরিতে যাওয়া এবং বাগানচর্চার মতো ভালো ও সৃজনশীল কাজে অংশ নিতে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।