১৫ মে, ২০২৬
মসজিদ আল্লাহ তাআলার ঘর। এতে তাঁর জিকির ও ইবাদত হয়। তাঁর বড়ত্ব ও মহিমার বর্ণনা হয়। তাঁর তাওহিদ ও রুবুবিয়াতের আলোচনা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,... ‘সেসব গৃহে, যাকে মর্যাদা দিতে এবং যাতে তাঁর নাম স্মরণ করতে আল্লাহ আদেশ করেছেন। তাতে সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁর তাসবিহ করে সেসব লোক, যাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বেচাকেনা আল্লাহর স্মরণ থেকে এবং নামাজ কায়েম ও জাকাত আদায় থেকে গাফেল করে না...।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩৬
মসজিদের সার্বিক কল্যাণ কামনার অর্থ, প্রতিটি গ্রামে মসজিদ প্রতিষ্ঠা হোক, এসব মসজিদ সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পরিচালিত হোক, মুসল্লি ও জিকিরকারী দ্বারা পরিপূর্ণ হোক এবং এর মাধ্যমে সবখানে হেদায়েতের আলো ছড়িয়ে পড়ুক—এই প্রত্যাশা করা। এটা মসজিদের সঙ্গে সম্পর্কের শুধু গুরুত্বপূর্ণ দিকই নয়, ঈমানের অংশ। পক্ষান্তরে মসজিদের কোনোরূপ অকল্যাণ কামনা এর প্রতি চরম বেয়াদবি ও কুফরের পরিচায়ক।
মুমিনের অন্তরে মসজিদ ও সালাতের প্রতি এক গভীর টান বা আত্মিক আকর্ষণ থাকে। যাদের হৃদয় এমন অনুভূতিতে সদা সিক্ত থাকে, তারাই মূলত মসজিদমুখী বান্দা। শুধু সশরীরে মসজিদে উপস্থিত হওয়া নয়, বরং মসজিদ থেকে বের হওয়ার পর পরবর্তী ওয়াক্তের আজানের জন্য মনে মনে এক ধরনের অস্থিরতা ও ব্যাকুলতা অনুভব করা। কিয়ামতের দিন সাত শ্রেণির মানুষ আল্লাহর আরশের নিচে ছায়া লাভ করবে, তন্মধ্যে অন্যতম হলো সেই ব্যক্তি, যার অন্তর মসজিদের সঙ্গে ঝুলন্ত থাকে। (বুখারি, হাদিস : ৬৬০)
অন্তর মসজিদমুখী করার উপায়
মুমিনের হৃদয়ের প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিক উন্নতির কেন্দ্রবিন্দু হলো মসজিদ। সদিচ্ছা ও কিছু কার্যকর অভ্যাসের মাধ্যমেই একজন মুমিন তার অন্তরকে মসজিদমুখী করে তুলতে পারেন।
নিম্নে অন্তরকে মসজিদমুখী করার কিছু উপায় নিয়ে আলোচনা করা হলো—
মসজিদের ফজিলত সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা
মানুষ স্বভাবগতভাবেই লাভের পেছনে ছোটে। কোনো কাজের উপকারিতা বা পুরস্কার সম্পর্কে জানলে সেই কাজের প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায়। এ জন্য মসজিদমুখী জীবন গঠনের জন্য সর্বপ্রথম মসজিদের ফজিলত ও মর্যাদা উপলব্ধি করা প্রয়োজন। রাসুলুল্লাহ বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় জায়গা হলো মসজিদ। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট জায়গা হলো বাজার।’ (মুসলিম, হাদিস : ৬৭১)
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘মসজিদগুলো জমিনে আল্লাহর ঘর। এগুলো আসমানবাসীদের জন্য তেমনি উজ্জ্বল দেখায়, যেমন আসমানের নক্ষত্ররাজি জমিনবাসীদের জন্য উজ্জ্বল দেখায়।’ (তাবারানি, আল-মুজামুল কাবির, হাদিস : ১০৬০৮)
জামাতে সালাত আদায়ের পুরস্কার নিয়ে চিন্তা করা
জামাতের সঙ্গে সালাত আদায়ের নেকি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে মসজিদে যাওয়ার আগ্রহ বাড়ে। কারণ একাকী সালাত আদায়ের চেয়ে জামাতে সালাত আদায় করলে ২৭ গুণ বেশি সওয়াব লাভ করা যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জামাতে সালাত আদায় করা একাকী সালাত আদায়ের চেয়ে ২৭ গুণ বেশি মর্যাদাপূর্ণ।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪৫)
মসজিদের কার্যক্রম ও সেবায় অংশগ্রহণ
মসজিদ শুধু সালাতের স্থান নয়। এটি জ্ঞান অর্জন ও মুসলমানদের সামাজিক কেন্দ্র। মসজিদের শিক্ষামূলক কার্যক্রমে অংশ নিলে ঈমান বাড়ে এবং মসজিদের প্রতি ভালোবাসা জন্মায়। মসজিদে দ্বিনি আলোচনা বা দরস অনুষ্ঠিত হয়, এতে হাজির হলে পরিপূর্ণ হজের সওয়াব লাভ করা যায়। আবু উমামা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কল্যাণময় (দ্বিনি) জ্ঞান অর্জন অথবা ওই জ্ঞান বিতরণের জন্যই শুধু মসজিদে গমনাগমন করে, তার জন্য পরিপূর্ণ হজের নেকি আছে।’ (তাবারানি, মুজামুল কাবির, হাদিস : ৭৪৭৩)
মসজিদকে শয়তানের আক্রমণ থেকে বাঁচার দুর্গ মনে করা
একাকী সালাত আদায় করা মানেই হলো শয়তানের সহজ শিকারে পরিণত হওয়া। আর মসজিদে জামাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে মুমিন বান্দা এমন একটি সুরক্ষিত দুর্গে আশ্রয় পায়, যা তাকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কোনো জনপদে বা বনজঙ্গলে তিনজন লোক একত্রে বসবাস করা সত্ত্বেও যদি তারা জামাতে সালাত আদায় না করে, তবে তাদের ওপর শয়তান আধিপত্য বিস্তার করে। অতএব, তোমরা জামাতকে আঁকড়ে ধরো। কারণ নেকড়ে (বাঘ) দলচ্যুত বকরিকেই খেয়ে থাকে।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৫৪৭)
মসজিদমুখী ভালো সঙ্গী নির্বাচন করা
মসজিদমুখী হওয়ার পথে একটি বড় শক্তি হতে পারে একজন মসজিদমুখী বন্ধু। মানুষের স্বভাব হলো সে তার বন্ধুর দ্বারা প্রভাবিত হয়। বন্ধু যদি দ্বিনদার হয়, তবে প্রতিটি আলাপন হবে জান্নাত আর রবের সন্তুষ্টি নিয়ে। দ্বিনদার মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘আর তুমি নিজেকে ধরে রাখো তাদের সঙ্গে যারা সকালে ও সন্ধ্যায় তাদের পালনকর্তাকে তাঁর চেহারা কামনায় আহবান করে।’ (সুরা : কাহফ, আয়াত : ২৮)
পরিশেষে মসজিদ হলো মুসলিম ঐক্যের প্রতীক এবং আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের নির্ধারিত স্থান। মসজিদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা মানে স্বয়ং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা। মহান আল্লাহ আমাদের মসজিদমুখী বান্দা হিসেবে কবুল করুন।