১৫ মে, ২০২৬
জিলহজ মাস অতি সন্নিকটে। এ মাসের প্রথম ১০ দিন অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। রমজান মাসকে ইবাদতের বসন্তকাল হিসেবে আমরা সবাই জানি। কিন্তু রমজানের বাইরে আরও একটি ইবাদতের বসন্তকাল আছে, সেটা আমরা খুব কম মানুষই জানি। সেই বসন্তকাল হলো জিলহজের প্রথম ১০ দিন। এই দিনগুলো আল্লাহর কাছে এত প্রিয় যে এই সময়ের আমলের মাধ্যমে একজন বান্দা সহজেই আল্লাহর প্রিয়পাত্র হয়ে উঠতে পারে।
জিলহজের প্রথম দশকের গুরুত্ব ও ফজিলত মহান আল্লাহ সুরা ফজরের ২ নম্বর আয়াতে ১০ রাতের শপথ করেছেন। অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, এখানে ১০ রাত বলতে জিলহজের প্রথম ১০ রাতকেই বোঝানো হয়েছে। আর স্বয়ং আল্লাহ যখন কোনো ব্যাপারে শপথ করেন, সেটার গুরুত্ব যে কতখানি, তার ব্যাখ্যা নিষ্প্রয়োজন। এ ছাড়া সুরা হজের ২৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, তারা যেন আল্লাহর নাম স্মরণ করে নির্দিষ্ট দিনসমূহে। ইবনে আব্বাস (রা.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, নির্দিষ্ট দিন বলে এখানে জিলহজের প্রথম দশককে বোঝানো হয়েছে। (তাফসিরে ইবনে কাসির)
রসুল (সা.) এই দিনগুলোর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করে বলেছেন, ‘জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের নেক আমল আল্লাহর কাছে যত প্রিয়, আর কোনো দিনের আমল তত প্রিয় নয়। সাহাবিগণ আল্লাহর পথে জিহাদের সঙ্গে এর তুলনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জিহাদও এর সমতুল্য নয়; তবে সেই ব্যক্তির কথা ভিন্ন, যে নিজের প্রাণ ও সম্পদ নিয়ে জিহাদে বেরিয়ে গেল এবং কোনো কিছুই আর নিয়ে ফিরে এলো না।’ (বুখারি)
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) বলেন, এই দশকের বিশেষত্বের কারণ হলো এখানে ইসলামের পাঁচটি মৌলিক স্তম্ভের (ইমান, সালাত, জাকাত, সিয়াম ও হজ) এক অনন্য সমন্বয় ঘটে, যা বছরের অন্য কোনো সময়ে সম্ভব হয় না।
জিলহজের প্রথম দশকের বিশেষ আমলসমূূহ
১. অধিক পরিমাণে আল্লাহর জিকির করা (সুরা হজ, ২৮)।
২. নেক আমল ও ভালো কাজের প্রতি বিশেষভাবে যত্নবান হওয়া। কেননা, মহান আল্লাহর কাছে অন্যান্য সময়ের আমলের চেয়ে জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের আমল অধিক প্রিয় (বুখারি, ৯৬৯)।
৩. অন্য সময়ের তুলনায় এই দিনগুলোতে পাপকাজ পরিহারে অধিক সচেষ্ট থাকা (সুরা তাওবা, ৩৬)।
৪. সামর্থ্যবান হলে হজ করা। হজ ইসলামের মৌলিক পাঁচটি স্তম্ভের একটি। যাদের সামর্থ্য আছে তাদের ওপর হজ ফরজ। আবার কবুল হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া অন্য কিছ্ নয় মর্মে নবীজি (সা.)-এর সুসংবাদ রয়েছে (সুরা আলে ইমরান, ৯৭; তিরমিজি, ৮১০)।
৫. সামর্থ্য থাকলে কোরবানি করা। মহান আল্লাহ বলেন, তুমি নিজ প্রতিপালকের জন্য সালাত আদায় করো ও কোরবানি করো (সুরা কাউসার, ২)।
৬. কোরবানি করতে ইচ্ছুক ব্যক্তির কোরবানি করার আগপর্যন্ত নখ, চুল, ও অবাঞ্ছিত লোম পরিষ্কার করা থেকে বিরত থাকা (মুসলিম, ১৯৭৭)।
এ হাদিসে যদিও কোরবানিদাতাকে চুল, নখ ইত্যাদি কাটা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে, তবে বিভিন্ন বর্ণনা থেকে বোঝা যায় যে যাদের কোরবানি করার সামর্থ্য নেই, তারাও ফজিলতপূর্ণ এ আমলটি করতে পারেন। এমনকি শিশুদেরও চুল-নখ কাটা থেকে বিরত রাখা উত্তম। (আবু দাউদ, ২৭৮৯; আল-মুস্তাদরাক আলাস সহিহাইন, ৭৫২০)
৭. অধিক পরিমাণে তাকবির, তাহমিদ ও তাহলিল পাঠ করা। অর্থাৎ আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ পড়া। আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) বলেন, আল্লাহর কাছে জিলহজের ১০ দিনের আমলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও প্রিয় আমল নেই। অতএব এ দিনগুলোতে তোমরা অধিক পরিমাণে তাকবির, তাহমিদ ও তাহলিল পাঠ করো (আল-মুজামুল কাবির, ১১১১৬)।
৮. তাশরিকের দিনগুলোতে প্রত্যেক সালাতের শেষে বিশেষভাবে তাকাবিরে তাশরিক পাঠ করা। অর্থাৎ ৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত প্রতি নামাজের পর একবার ‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ’ পাঠ করা (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, ৫৬৩১)।
৯. প্রথম ৯ দিন সিয়াম পালন করা। কোনো কোনো বর্ণনায় জিলহজের প্রথম ৯ দিনই সিয়াম পালনের নির্দেশনা পাওয়া যায়।
১০. আরাফার দিন বিশেষভাবে রোজা রাখা। কেননা, আরাফার দিনের রোজা রাখলে আশা করা যায় মহান আল্লাহ তার পেছনের এবং সামনের এক বছরের (সগিরা) গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন (মুসলিম, ১১৬২)।
১১. ঈদের দিনের সুন্নাহসমূূহ পালন করা।
♦ জুমার মিম্বর থেকে