রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনল ট্রাম্প প্রশাসন

২১ মে, ২০২৬

দীর্ঘ তিন দশক আগের এক ঐতিহাসিক ঘটনার জেরে কিউবার সাবেক কমিউনিস্ট নেতা রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে মার্কিন নাগরিক হত্যার ষড়যন্ত্র ও অন্যান্য গুরুতর অপরাধের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। 

১৯৯৬ সালে কিউবা ও ফ্লোরিডার মধ্যবর্তী আকাশসীমায় কিউবান-আমেরিকানদের একটি সংগঠনের দুটি বেসামরিক বিমান ভূপাতিত করার ঘটনায় এই মামলা পুনরুজ্জীবিত করা হলো। ২০০৩ সালের পুরনো অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে বুধবার (২০ মে) দায়ের করা এই মামলায় রাউল কাস্ত্রোসহ মোট ছয়জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। সেদিনের ওই বিমান হামলায় তিন মার্কিন নাগরিকসহ মোট চারজন নিহত হয়েছিলেন।

বর্তমানে ৯৪ বছর বয়সি রাউল কাস্ত্রো সেই সময়ে কিউবার সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান ছিলেন এবং বিমান ভূপাতিত করার ওই ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দার মুখে পড়েছিলেন। মার্কিন বিচার বিভাগ এবার তার বিরুদ্ধে বিমান ধ্বংসের পাশাপাশি আর্মান্ডো আলেজান্দ্রে জুনিয়র, কার্লোস আলবার্তো কস্টা, মারিও ম্যানুয়েল দে লা পেনা এবং পাবলো মোরালেস নামের চার নাগরিককে সরাসরি হত্যার অভিযোগ এনেছে। 

মিয়ামির ফ্রিডম টাওয়ারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভারপ্রাপ্ত মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ এই ঘোষণা দিয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাদের নাগরিকদের ওপর হওয়া অন্যায় কখনোই ভুলে যান না। রাউল কাস্ত্রোকে মার্কিন আদালতে হাজির করা সম্ভব কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ব্ল্যাঞ্চ জানান, তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে এবং তিনি নিজে থেকে হোক বা অন্য উপায়ে—আদালতে হাজির হবেন বলেই তারা আশা করছেন।

কিউবার একদলীয় কমিউনিস্ট শাসনের ওপর ওয়াশিংটন যখন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে, ঠিক তখনই কিউবান বিপ্লবের এই প্রভাবশালী শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হলো। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই আকস্মিক পদক্ষেপকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং একটি ‘রাজনৈতিক চালবাজি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন কিউবার বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-কানেল। তার দাবি, সে সময় কিউবা তাদের নিজস্ব জলসীমায় সম্পূর্ণ বৈধ আত্মরক্ষার স্বার্থেই ওই পদক্ষেপ নিয়েছিল। এই অভিযোগের আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার ওপর সামরিক আগ্রাসন চালানোর পায়তারা করছে বলেও তিনি পাল্টা অভিযোগ তোলেন।

এই আইনি পদক্ষেপের সমসাময়িক সময়ে কিউবার স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সে দেশের জনগণের উদ্দেশ্যে একটি বিশেষ বার্তা দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমেরিকার সঙ্গে একটি নতুন কিউবা বিনির্মাণের পথ তৈরি করছেন। দ্বীপাঞ্চলটিতে চলমান বিদ্যুৎ বিপর্যয় এবং খাদ্য সংকটের জন্য তিনি কিউবান সামরিক বাহিনী দ্বারা পরিচালিত বাণিজ্যিক কনগ্লোমারেট ‘গায়েসা’-কে দায়ী করেন। রুবিওর এই বার্তার জবাবে প্রেসিডেন্ট দিয়াজ-কানেল মার্কিন প্রশাসনকে মিথ্যাবাদী এবং কিউবান জনগণের ওপর সম্মিলিত শাস্তি চাপিয়ে দেওয়ার খলনায়ক হিসেবে অভিহিত করেন।

এদিকে মিয়ামির যে কেন্দ্রে রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে অভিযোগ ঘোষণা করা হয়, সেখানে কিউবান নির্বাসিত ও বিরোধী সংগঠনের বিপুল সংখ্যক সদস্য উপস্থিত ছিলেন। ১৯৯৬ সালের হামলায় নিহতদের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে আবেগাপ্লুত অনেক কিউবান-আমেরিকান এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান এবং ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। 

তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, চলতি বছরের শুরুতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যেভাবে মার্কিন বিচার বিভাগের পরোয়ানার ভিত্তিতে একটি সামরিক অভিযানের মাধ্যমে আটক করার চেষ্টা করা হয়েছিল, রাউল কাস্ত্রোর ক্ষেত্রেও ট্রাম্প প্রশাসন একই ধরনের কোনো সামরিক অভিযানের অজুহাত খুঁজছে কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে। কিউবার সরকারি গণমাধ্যমগুলোও এই অভিযোগকে ‘মিথ্যা’ দাবি করে সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে মার্কিন চাপের মুখে তারা কোনো অবস্থাতেই আত্মসমর্পণ বা আপস করবে না।

সূত্র: বিবিসি।