২৩ মে, ২০২৬
ঢাকা জেলার বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদীকেন্দ্রিক নৌপথে দীর্ঘদিন ধরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা আন্তঃজেলা ডাকাতচক্র ‘টিক্কা বাহিনী’র প্রধান মজিবুর রহমান আকন ওরফে ‘টিক্কা’কে গ্রেপ্তার করেছে নৌ পুলিশ। অভিযানের সময় ডাকাত সর্দারের হামলায় নৌ পুলিশ ঢাকা অঞ্চলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহফুজুর রহমান গুরুতর আহত হয়েছেন।
বর্তমানে তিনি রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
নৌ পুলিশ সূত্র জানায়, টিক্কা বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরের নদীপথে মালবাহী ট্রলার, বালুবাহী বাল্কহেড এবং বিভিন্ন নৌযানে ডাকাতি ও চাঁদাবাজি চালিয়ে আসছিল। চক্রটি বিশেষ করে রাতের আঁধারে নৌযান থামিয়ে মাঝি ও শ্রমিকদের মারধর করত। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নগদ টাকা, মোবাইল ফোন এবং মূল্যবান মালামাল লুটে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
অনেক সময় ভুক্তভোগীদের নদীতে ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার হওয়া মজিবুর রহমান আকন ওরফে টিক্কার বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, বিস্ফোরক ও ডাকাতিসহ অন্তত ১১টি মামলা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে থেকে তিনি তার বাহিনীর সদস্যদের মাধ্যমে নৌপথে অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিলেন।
নৌ পুলিশ ঢাকা অঞ্চলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহফুজুর রহমানের নেতৃত্বে একটি বিশেষ টিম সম্প্রতি টিক্কাকে গ্রেপ্তারের পরিকল্পনা নেয়।
অভিযানে অংশ নেন আশুলিয়া নৌ ফাঁড়ির ইনচার্জ পুলিশ ইন্সপেক্টর (নি.) মোহাম্মদ দাউদ, এএসআই (নি.) শরীফুল ইসলামসহ নৌ পুলিশের একটি চৌকস দল।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শুক্রবার দুপুরে গাজীপুর মহানগরের পুবাইল থানার মাজুখান বাজার এলাকায় অভিযান চালানো হয়। সেখানে অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর অভিযান চালিয়ে টিক্কাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি সাভার মডেল থানার মামলা নং-৮(২)২৫, ধারা ৩৮৫/৩৯৫/৩৯৭-এর এজাহারভুক্ত আসামি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তবে গ্রেপ্তারের সময় পরিস্থিতি হঠাৎ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে টিক্কা পালানোর চেষ্টা করেন। এসময় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহফুজুর রহমান তাকে আটকের চেষ্টা করলে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে দুজনই পাকা সড়কের ওপর পড়ে যান। এতে মাহফুজুর রহমান মাথার পেছনে, মেরুদণ্ড ও কোমরে গুরুতর আঘাত পান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে পুলিশ ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ দাউদ এবং কনস্টেবল সজিব মিয়াও আহত হন।
আহত অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে তাৎক্ষণিকভাবে রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে জাতীয় নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শেষে আবারও তাকে রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। আহত অন্য দুই সদস্য প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল ত্যাগ করেছেন।
নৌ পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, টিক্কা বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ থাকলেও নদীপথে অবস্থান পরিবর্তন এবং স্থানীয়ভাবে প্রভাব বিস্তার করে তারা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে চলছিল। সম্প্রতি নৌপথে ডাকাতি ও চাঁদাবাজির ঘটনায় অভিযোগ বাড়তে থাকায় বাহিনীটির বিরুদ্ধে বিশেষ নজরদারি শুরু করা হয়।
নৌ পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার হওয়া টিক্কাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাহিনীর অন্যান্য সদস্যদের অবস্থান শনাক্তে অভিযান চলছে। নৌপথে ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধে বিশেষ অভিযান আরো জোরদার করা হবে বলেও জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।