ডেঙ্গু নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে ভারতে

১২ জুন, ২০২৬

ভারতে ডেঙ্গু এখন আর শুধু বর্ষাকালের রোগ নয়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং দ্রুত নগরায়ণের কারণে ডেঙ্গুবাহী মশার বিস্তার বাড়ছে। ফলে সারা বছরই ডেঙ্গুর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

৩২ বছর বয়সী সফটওয়্যার প্রকৌশলী নীতিন শর্মা চলতি বছরের মে মাসে হঠাৎ জ্বরে আক্রান্ত হন। বর্ষা শুরু হতে তখনও কয়েক সপ্তাহ বাকি ছিল। তাই তিনি প্রথমে ভেবেছিলেন এটি সাধারণ ভাইরাসজনিত জ্বর। কিন্তু হাসপাতালে পরীক্ষা করার পর জানা যায়, তিনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন।

নীতিন বলেন, এপ্রিল বা মে মাসে ডেঙ্গু হবে, এটা আগে কখনও ভাবিনি। সবচেয়ে অবাক হয়েছি রোগ ধরা পড়ার সময়টা দেখে।

আগেভাগেই বাড়ছে সংক্রমণ

চিকিৎসকরা বলছেন, নীতিনের মতো ঘটনা এখন ক্রমেই বাড়ছে। এ বছর কেরালায় আনুষ্ঠানিকভাবে বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই বিভিন্ন রাজ্যের হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হতে শুরু করেছে।

হরিয়ানার মহারিষি মার্কণ্ডেশ্বর মেডিকেল কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. হর্ষদীপ জোশি বলেন, “ডেঙ্গু আর শুধু বর্ষা বা বর্ষা-পরবর্তী সময়ের রোগ নয়। এখন প্রচলিত মৌসুমের বাইরেও নিয়মিত রোগী পাওয়া যাচ্ছে।”

বছরের শুরুতেই হাজারো রোগী

ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার ফর ভেক্টর বর্ন ডিজিজেস কন্ট্রোল (এনসিভিবিডিসি) জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ পর্যন্ত দেশে ৬ হাজার ৯২৭ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বছরের প্রথম দুই মাসে এত রোগী পাওয়া ডেঙ্গুর আগাম বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।

এ বছর সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেছে তামিলনাড়ুতে, যেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার ৮৭৩। এরপর রয়েছে মহারাষ্ট্র, কেরালা ও কর্ণাটক।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চ সংক্রমণ

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ভারতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিল ২ লাখ ৮৯ হাজার ২৩৫ জন এবং মারা গিয়েছিল ৪৮৫ জন।

২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৩৩ হাজার ৫১৯ এবং মৃত্যু ২৯৭ জন।

আর ২০২৫ সালে আক্রান্ত হয়েছিল ১ লাখ ২১ হাজার ৮২৪ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ১৩১ জনের।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর সংক্রমণ কখনও কমলেও দীর্ঘমেয়াদে রোগটির বিস্তার বাড়ছে এবং এর ভৌগোলিক পরিধিও সম্প্রসারিত হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে, আর্দ্রতা ৬০ থেকে ৭৮ শতাংশের মধ্যে থাকলে এবং মাঝারি মাত্রার বৃষ্টিপাত হলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ দ্রুত বাড়ে।

বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ডেঙ্গুর ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

বায়ুদূষণেও বাড়ছে ঝুঁকি

২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব দেশে বায়ুদূষণের মাত্রা বেশি, সেখানে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হারও বেশি।

বিশেষ করে পিএম ২.৫ নামের ক্ষুদ্র বায়ুকণার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দিতে পারে, ফলে ডেঙ্গু আরও মারাত্মক রূপ নিতে পারে।

টিকা তৈরির চেষ্টা

ডেঙ্গু প্রতিরোধে ভারত ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নিয়েছে।

চলতি বছর জাপানের টাকেদা ফার্মাসিউটিক্যালসের তৈরি ‘কিউডেঙ্গা’ টিকার অনুমোদন দিয়েছে দেশটির সরকার।

এছাড়া ভারতীয় গবেষণা সংস্থা আইসিএমআর এবং প্যানাসিয়া বায়োটেক যৌথভাবে ‘ডেঙ্গিঅল’ নামে ভারতের প্রথম এক ডোজের ডেঙ্গু টিকার তৃতীয় ধাপের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে।

একই সঙ্গে সিরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়াও নতুন ডেঙ্গু টিকার ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে।

শুধু টিকাই যথেষ্ট নয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু টিকা যথেষ্ট হবে না।

তারা বলছেন, মশা নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, রোগ পর্যবেক্ষণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ডেঙ্গু থেকে সেরে ওঠার পর নীতিন শর্মা এখন সারা বছরই সতর্ক থাকেন। বাসার আশপাশে কোথাও পানি জমে আছে কি না, নিয়মিত খোঁজ নেন এবং সবসময় মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করেন।

তার ভাষায়, এখন মনে হয় ডেঙ্গু যে কোনো সময় হতে পারে।