১২ জুন, ২০২৬
ইসলাম মানুষকে আমলের চেয়ে আমলের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ও আন্তরিকতার প্রতি অধিক গুরুত্ব দিতে শিক্ষা দিয়েছে। একজন মুসলমান যখন নামাজ আদায় করেন, রোজা রাখেন, জাকাত দেন বা হজ পালন করেন, তখন তার একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের সমাজে অনেক সময় ইবাদতের প্রকৃত উদ্দেশ্যের পরিবর্তে তার বাহ্যিক পরিচিতি ও সামাজিক মর্যাদা বেশি গুরুত্ব পায়। বিশেষত হজ পালন করার পর নামের শুরুতে ‘হাজি’ বা ‘আলহাজ’ উপাধি ব্যবহার করা এবং এ পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার প্রবণতা সমাজে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের উপাধি ব্যবহার কতটুকু সমীচিন?
হজ ইসলামের অন্যতম মহান ইবাদত
ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত। হজ তার অন্যতম।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত...।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮)
আর হজ শুধু একটি ইবাদত নয়; বরং মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ ও আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণের এক অনন্য শিক্ষা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মানুষের মধ্যে হজের ঘোষণা দিন; তারা আপনার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সব ধরনের ক্ষীণকায় উটের পিঠে আরোহণ করে, দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ২৭)
‘হাজি’ ও ‘আলহাজ’ শব্দের অর্থ
‘হাজি’ অর্থ হজ পালনকারী ব্যক্তি।
‘আলহাজ’ শব্দটিও মূলত একই অর্থ বহন করে। সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচলিত ধারণা হলো, একবার হজ করলে ‘হাজি’ এবং একাধিকবার হজ করলে ‘আলহাজ’ বলা হয়। অথচ আরবি ভাষা ও ইসলামী পরিভাষায় এ ধরনের কোনো পার্থক্যের ভিত্তি নেই।
ইসলামে নিয়তের গুরুত্ব
হজসহ সব ইবাদতের প্রাণ হলো নিয়ত। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সম্পাদিত আমলই কেবল গ্রহণযোগ্য।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সব কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯০৭)
তাই যদি কেউ ‘হাজি’ বা ‘আলহাজ’ উপাধি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় হজ করেন অথবা হজের পর এ পরিচয়ে মানুষের কাছে সম্মান প্রত্যাশা করেন, তাহলে তার ইবাদতের পবিত্রতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আত্মপ্রশংসা নয়, আত্মশুদ্ধি
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা নিজেদের পবিত্র বলে দাবি কর না। কে বেশি মুত্তাকি, তা আল্লাহই ভালো জানেন।’ (সুরা : নাজম, আয়াত : ৩২)
এই আয়াত থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, নিজের নেক আমলকে পরিচয়ের অংশ বানিয়ে আত্মপ্রশংসার পরিবেশ সৃষ্টি করা একজন মুমিনের জন্য কাম্য নয়।
সাহাবায়ে কেরামের আমল
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রায় সকল সাহাবিই হজ করেছেন। চার খলিফা, আশারায়ে মুবাশশারা এবং অসংখ্য সাহাবি হজ পালন করেছেন। কিন্তু ইতিহাসে কোথাও পাওয়া যায় না যে তাঁদের নামের আগে ‘হাজি’ বা ‘আলহাজ’ উপাধি যুক্ত করা হতো। তাঁরা নিজেদের পরিচয় দিতেন ঈমান, তাকওয়া, জ্ঞান ও চরিত্রের মাধ্যমে; বিশেষ কোনো ইবাদতকে উপাধি বানিয়ে নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৯১)
আবার কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে এমন লোকও থাকবে, যে মানুষের প্রশংসা লাভের জন্য ইবাদত করেছিল। (সহিহ মুসলিম)
তাই একজন মুসলমানের উচিত নিজের আমলকে প্রচারের মাধ্যম না বানিয়ে বিনয় ও গোপনীয়তার সঙ্গে তা সম্পাদন করা।
তাহলে ‘হাজি সাহেব’ বলে ডাকা কি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ?
কোনো ব্যক্তি যদি শ্রদ্ধা বা সম্মানের কারণে একজন হজ পালনকারীকে ‘হাজি সাহেব’ বলে সম্বোধন করেন, তাহলে তা সরাসরি হারাম বলা যাবে না। কারণ এতে মূলত পরিচয়ের উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তবে এটিকে সামাজিক মর্যাদা বা বাধ্যতামূলক উপাধি হিসেবে গ্রহণ করা, কিংবা এভাবে না ডাকলে অসন্তুষ্ট হওয়া অবশ্যই অনুচিত। অনেক সমসাময়িক আলেম ও ফকিহের মতে, নামের আগে ‘হাজি’ বা ‘আলহাজ’ উপাধি স্থায়ীভাবে ব্যবহার করা ইসলামের আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ এটি আমলের চেয়ে পরিচিতিকে বড় করে তোলে এবং কখনো কখনো রিয়া (লোক দেখানো) ও আত্মতুষ্টির কারণ হতে পারে।
অতএব, হজ মুসলমানের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত। এর প্রকৃত সৌন্দর্য উপাধিতে নয়, বরং হৃদয়ের তাকওয়া, বিনয় ও আল্লাহভীতিতে নিহিত। একজন মানুষ হজ থেকে ফিরে এসে যদি চরিত্রে, আচরণে এবং আল্লাহর আনুগত্যে পরিবর্তন আনতে পারেন, সেটিই তার প্রকৃত পরিচয়। ‘হাজি’ বা ‘আলহাজ’ উপাধি অর্জন নয়; বরং আল্লাহর দরবারে ‘মকবুল হাজি’ হিসেবে কবুল হওয়াই একজন হজযাত্রীর সবচেয়ে বড় সফলতা। তাই আমাদের উচিত উপাধির প্রতি নয়, ইখলাস ও আমলের গ্রহণযোগ্যতার প্রতি অধিক গুরুত্ব দেওয়া। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুক। আমিন।