২২ জুন, ২০২৬
অর্থনীতির গণতান্ত্রিকীকরণই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের মূল দর্শন বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, নাগরিকদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অবস্থা থেকে স্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছাতে দুই বছর সময় লাগবে। তৃতীয় বছর হবে উত্তরণের সময়, আর চতুর্থ ও পঞ্চম বছর হবে বাংলাদেশের সমৃদ্ধির বছর।
সোমবার রাজধানীর গ্রিন রোডে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক (ইউএপি) অডিটোরিয়ামে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) ও ইউএপির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘দ্য ফিসকাল কম্পাস ২০২৬: বিয়ন্ড দ্য নাম্বার্স, শেপিং বাংলাদেশ’স ফিউচার—প্রপোজড ন্যাশনাল বাজেট ২০২৬-২৭’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অর্থমন্ত্রী বলেন, মাত্র দেড় মাসের মধ্যে জনগণের উচ্চ প্রত্যাশার প্রেক্ষাপটে বাজেট প্রণয়ন করতে হয়েছে। এ বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য বৃহত্তর অংশগ্রহণ, অন্তর্ভুক্তি এবং নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি।
তিনি সৃজনশীল অর্থনীতির ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী শিল্প ও সাংস্কৃতিক সম্পদকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে।
ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেশীয় কারুশিল্প বিশ্ববাজারে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউএপির স্কুল অব বিজনেসের ডিন অধ্যাপক ড. এম এ বাকী খলিলী। তিনি বলেন, নতুন সরকারের প্রথম বাজেটকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা অনেক। বাজেটের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশল ও সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়।
তবে পরিকল্পনাগুলো বাস্তবসম্মত এবং বাস্তবায়নযোগ্য হওয়া জরুরি। তিনি রাজস্ব বোর্ডের কাঠামোগত সংস্কার, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর জোর দেন।
সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, বাজেট কেবল অর্থনৈতিক দলিল নয়, এটি সরকারের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার ও দিকনির্দেশনার প্রতিফলন। তিনি বলেন, বাজেটের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য বাস্তবায়ন কীভাবে হবে এবং প্রয়োজনীয় অর্থ কোথা থেকে আসবে– এসব প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে তিনি সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী জোরদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
আলোচনায় বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন, নীতিমালাকে আরও ব্যবসাবান্ধব করতে হবে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে শিল্প খাত চাপে রয়েছে। নতুন শিল্প খাত বিকাশ এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম জাহান বলেন, যেকোনো বাজেটের কেন্দ্রবিন্দুতে মানুষকে রাখতে হবে। বাজেটকে এক বছরের পরিকল্পনা হিসেবে না দেখে আগামী পাঁচ বছরের উন্নয়ন কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করার পরামর্শ দেন তিনি। একইসঙ্গে অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ, নারীর ক্ষমতায়ন ও তরুণদের কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার বলেন, বাজেট বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু এবং সরকারি-বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
ট্রান্সকম গ্রুপ সিইও সিমিন রহমান বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বন্দর ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। তিনি ওষুধ ও রপ্তানিমুখী শিল্পে সরকারের প্রণোদনামূলক উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন।
অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির আহ্বান জানিয়ে বলেন, কেবল কর বৃদ্ধি করে রাজস্ব আদায় বাড়ানো সম্ভব নয়, বিনিয়োগ ও উৎপাদন সম্প্রসারণে জোর দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ইউএপির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান কে এম মোজিবুল হক, র্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন ড. মাহমুদ ওসমান ইমাম, ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া, সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী, ব্যাংক এশিয়ার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মেহতাব ওসমানী, ব্যাংকার মামুন রশীদ, ইউএপির ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. মহিউদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন ড. মোহাম্মদ মাইনুল ইসলাম।
আলোচকরা বাজেট বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যকারিতা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। অনুষ্ঠানে সঞ্চালনা করেন সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান।