ইমোশনাল হার্টব্রেক: বিচ্ছেদের পরবর্তী কঠিন মুহূর্তগুলো যেভাবে সামলাবেন

২৬ জুন, ২০২৬

মানুষের জীবনে সবথেকে গভীর এবং যন্ত্রণাদায়ক অনুভূতির নাম হলো 'ইমোশনাল হার্টব্রেক' বা ভেঙে যাওয়া মন। প্রিয় কোনো মানুষ, সম্পর্ক কিংবা দীর্ঘদিনের লালিত কোনো স্বপ্ন যখন হঠাৎ ভেঙে যায়, তখন মানুষ যে মানসিক যন্ত্রণার সম্মুখীন হয়, তা কেবলই মনের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এটি শরীরেও গভীর প্রভাব ফেলে। 

এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হলো, কেন মানুষের হার্টব্রেক হয় এবং কীভাবে তা সামলে ওঠা সম্ভব।

ইমোশনাল হার্টব্রেক কেন হয়?

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ইমোশনাল হার্টব্রেক মূলত আমাদের মস্তিষ্কের নিউরোকেমিক্যাল পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত। যখন আমরা কাউকে ভালোবাসি, মস্তিষ্ক তখন ডোপামিন ও অক্সিটোসিনের মতো ‘ফিল গুড’ হরমোন নিঃসরণ করে। কিন্তু যখন সেই সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটে, তখন মস্তিষ্কের এই রাসায়নিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। অনেকটা মাদকাসক্ত ব্যক্তির মাদক ছেড়ে দেওয়ার মতো তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় মস্তিষ্কে। আর ঠিক এই কারণেই বিচ্ছেদের সময় শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা একই সাথে অনুভূত হয়।

মন ভাঙলে শরীরে ও মনে কী প্রভাব পড়ে?

হার্টব্রেক শুধু মনের কষ্ট নয়, চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে 'ব্রোকেন হার্ট সিন্ড্রোম' (Broken Heart Syndrome) বা 'তাকোতসুবো কার্ডিওমায়োপ্যাথি' বলা হয়। এর লক্ষণগুলো হলো-

শারীরিক লক্ষণ: বুক ধড়ফড় করা, বুকে তীব্র ব্যথা হওয়া, শ্বাসকষ্ট এবং হঠাত করেই রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া। অনেক সময় দেখা দেয় প্রচণ্ড মাথাব্যথা ও দীর্ঘমেয়াদী অনিদ্রা।

মানসিক লক্ষণ: তীব্র বিষণ্নতা, শূন্যতাবোধ, কোনো কিছুতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা এবং নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া। অনেক সময় মানুষ নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও কমে যায়।

কর্মক্ষমতা হ্রাস: মনের যন্ত্রণার কারণে প্রাত্যহিক কাজে মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, যা কর্মক্ষেত্র এবং সামাজিক জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

প্রতিকারের উপায়: যেভাবে সামলে উঠবেন

হার্টব্রেক কাটিয়ে ওঠা রাতারাতি সম্ভব নয়, তবে ধৈর্যের সঙ্গে সঠিক পদক্ষেপ নিলে এই যন্ত্রণা থেকে বেরিয়ে আসা যায়-

১. বাস্তবতাকে স্বীকার করুন: কোনো কিছু মেনে নেওয়া মানে হেরে যাওয়া নয়, বরং নতুন করে শুরু করার সাহস দেখানো। বিচ্ছেদ বা হার্টব্রেক যে হয়েছে, তা মেনে নিতে শিখুন। আবেগ দিয়ে নয়, পরিস্থিতিকে যুক্তির আলোকে দেখার চেষ্টা করুন।

২. যোগাযোগ বন্ধ রাখা (ডিজিটাল ডিটক্স): সম্পর্ক শেষ হওয়ার পর প্রিয়জনের সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল চেক করা বা বারবার পুরনো চ্যাট পড়ার অভ্যাস যন্ত্রণাকে দীর্ঘায়িত করে। তাই প্রয়োজনে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে সাময়িক বিরতি নিন বা প্রিয়জনকে ব্লক করে নিজের মানসিক শান্তি বজায় রাখুন।

৩. নিজের যত্ন নেওয়া: এই সময়ে মানুষ নিজের স্বাস্থ্যের কথা ভুলে যায়। নিয়মিত খাবার গ্রহণ, পর্যাপ্ত ঘুম এবং হালকা ব্যায়াম করার চেষ্টা করুন। শরীর সুস্থ থাকলে মনকেও সুস্থ রাখা সহজ হয়।

৪. শখ ও সৃজনশীল কাজে মনোনিবেশ: আপনার পছন্দসই কাজগুলোতে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। বই পড়া, বাগান করা, নতুন কিছু শেখা কিংবা ভ্রমণে সময় কাটালে মস্তিষ্কে আবার ইতিবাচক হরমোন নিঃসরণ শুরু হয়।

৫. পেশাদার পরামর্শ: যদি মনের কষ্ট খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং শারীরিক অসুস্থতা (যেমন বুকে ব্যথা) দেখা দেয়, তবে সংকোচ না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। মানসিক চাপ হার্টের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে, তাই একে অবহেলা করবেন না।

সবশেষে মনে রাখা প্রয়োজন, জীবনে অনেক কিছু হারাবে, কিন্তু নিজেকে হারিয়ে ফেললে চলবে না। সময় প্রতিটি ক্ষত শুকিয়ে ফেলার ওষুধ। প্রিয় মানুষ বা স্বপ্নের হাতছানি না থাকলেও, নিজের স্বপ্ন ও পরিবারকে ঘিরে বেঁচে থাকার আনন্দ খুঁজে নেওয়াটাই জীবনের আসল সার্থকতা।