৩০ জুন, ২০২৬
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ২ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন আদালত।
আজ মঙ্গলবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় দেন। এ ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
জানা গেছে, এ মামলায় ইনুর বিরুদ্ধে আনা ৮টি অভিযোগের মধ্যে ৩, ৬ ও ৭ নম্বর অর্থাৎ তিনটি প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে ৩ নাম্বার অভিযোগের সাজা ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১ লাখ টাকা জরিমানা, ৬ নাম্বার অভিযোগে ১ লাখ টাকা জরিমানা ও ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৭ নাম্বার অভিযোগে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। তবে তিনটি মামলায় একসঙ্গে (যুগপৎ) সাজা চলমান থাকবে বিধায় তাকে সর্বমোট ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২ লাখ টাকা আর্থিক দণ্ডের সাজার রায় দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
জুলাই-আগস্ট আন্দোলন ঘিরে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন স্থানে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানো হয়। এতে ছয়জন নিহত হন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইনুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়।
এ মামলার তদন্ত শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ। তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল হয় একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর। ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয় গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর। উভয় পক্ষের শুনানির পর গত বছরের ২ নভেম্বর অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল।
গত বছরের ৩০ নভেম্বর এ মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। এরপর প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষ সাক্ষী হাজির করে। তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয় চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল, যা শেষ হয় ১৩ মে। এরপর থেকে মামলাটি রায়ের অপেক্ষায় ছিল।
মামলার আট অভিযোগ
অভিযোগ ১
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই 'মিরর নাউ' নামে ভারতীয় একটি গণমাধ্যমে আন্দোলন দমনে এবং আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য আন্দোলনকারীদের জামায়াত, সন্ত্রাসী, সাম্প্রদায়িক ট্যাগ দেন এবং তাদের বিরুদ্ধে বল প্রয়োগের উস্কানি, প্ররোচনা, সহায়তা প্রদান এবং সম্পৃক্ত থেকে হত্যার নির্দেশসহ বিভিন্ন ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে ইনুর বিরুদ্ধে।
অভিযোগ ২
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই কারফিউ জারি করে 'শুট অ্যাট সাইট' (দেখামাত্র গুলি) কার্যকর করে নিরীহ-নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের হত্যা করার নির্দেশ প্রদান করেন ইনু।
অভিযোগ ৩
২০২৪ সালের ২০ জুলাই দুপুর সোয়া ১২টায় ছাত্র-জনতায় আন্দোলন দমনে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ভিডিও দেখে শনাক্ত করে আন্দোলন দমনের জন্য আন্দোলনকারীদের আটক, নির্যাতন ও হত্যার নির্দেশ দেন তিনি।
অভিযোগ ৪
২০২৪ সালের ২০ জুলাই দুপুর ২টায় আন্দোলন দমনে 'লিথাল ওয়েপন' বা (প্রাণঘাতী অস্ত্র) ব্যবহার, আন্দোলনকারীদের ঘেরাও করে ছত্রীসেনা নামিয়ে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে বোম্বিং করে হত্যাসহ আন্দোলন দমনে গুলি বর্ষণ ও অন্যান্য উপায় অবলম্বন করে আন্দোলনকারীদের হত্যা, নির্যাতন, আটকসহ বল প্রয়োগের পরিকল্পনা করেন তিনি।
অভিযোগ ৫
২০২৪ সালের ২৭ জুলাই নিউজ টোয়েন্টিফোর চ্যানেলে আন্দোলন দমনে এবং আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী, জঙ্গি ইত্যাদি সাম্প্রদায়িক ট্যাগ দিয়ে উস্কানিমূলক বক্তব্য দেন ইনু। সেই সঙ্গে সরকার কর্তৃক গৃহীত হত্যাকাণ্ড সংঘটনসহ নির্যাতন নিপীড়নকে কৌশলে সমর্থন ও সহায়তা করেন।
অভিযোগ ৬
২০২৪ সালের ২৯ জুলাই আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের সভায় জোটের অন্যতম শরীক হাসানুল হক ইনু নিজে উপস্থিত থেকে আন্দোলন দমনে এবং আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য আন্দোলনকারীদের জামায়াত, সন্ত্রাসী, সাম্প্রদায়িক ট্যাগ দেয়ার জন্য জামায়াত ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের উপর পরিচালিত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতন সংঘটনে উস্কানি, সহায়তা প্রদান এবং সম্পৃক্ত থাকা।
অভিযোগ ৭
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বিকাল সাড়ে ৪টায় ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে জঙ্গি তকমা এবং কারফিউ জারির মাধ্যমে গুলি বর্ষণের মত কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়ে আন্দোলন দমনে শেখ হাসিনার সাথে পরামর্শ করে আন্দোলনরত নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার উপর গুলি বর্ষণ করে তাদেরকে হত্যা, নির্যাতন ও আন্দোলনকারীদের নির্মূল করার জন্য তা অধস্তনদের নির্দেশ প্রদান করেন আসামী হাসানুল হক ইনু।
অভিযোগ ৮
সরকারি চাকরিতে প্রচলিত কোটা সংস্কার ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুর দেড়টা থেকে বিকাল ৪টায় কুষ্টিয়া জেলার কুষ্টিয়া সদর মডেল থানা এলাকায় নিরীহ-নিরস্ত্র আন্দোলনরত কিশোর আব্দুল্লাহ আল মুস্তাকিনসহ ৬ জন কে হত্যা করার অপরাধ।