০১ জুলাই, ২০২৬
মৌমাছি মানেই তো ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়ানো হলুদ-কালো ডোরাকাটা ছোট্ট প্রাণী। কিন্তু না, পৃথিবীতে এমন মৌমাছিও আছে, যারা ফুলের মধু নয়, বরং পচা মাংসের গন্ধে ছুটে যায়। আরও অবাক করার বিষয় হলো- সেই পচা মাংস থেকেই তারা দিব্যি তৈরি করে মধু!
এদের বলা হয় ভালচার বি বা শকুন-মৌমাছি। মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে কোস্টারিকায়, ট্রিগোনা গণের কিছু প্রজাতির এই অদ্ভুত মৌমাছির দেখা মেলে। ট্রিগোনা গণে প্রায় ৩২টি প্রজাতি থাকলেও এর মধ্যে মাত্র তিনটি প্রজাতি মূলত পচে যাওয়া প্রাণীর দেহ খেয়ে বেঁচে থাকে।
অন্য মৌমাছির মতো এরা ফুল থেকে পরাগ সংগ্রহ করে না। তবে কিছু উদ্ভিদের কাণ্ডে থাকা মিষ্টি রস চুষে খেতে পারে। কিন্তু তাদের প্রধান খাদ্য হলো পচে যাওয়া মাংস। অসাধারণ ঘ্রাণশক্তির কারণে অনেক দূর থেকেই মৃত প্রাণীর গন্ধ শনাক্ত করতে পারে তারা।
পচা মাংস হজমের গোপন রহস্য
অবশ্য পচা মাংস খাওয়া যে খুব নিরাপদ তা-ও নয়। বড় ঝুঁকিও রয়েছে। এতে থাকে অসংখ্য ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও বিষাক্ত উপাদান। তাহলে এই মৌমাছিগুলোর সুস্থ থাকার রহস্য কী?
২০২১ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, শকুন-মৌমাছির অন্ত্রে এমন কিছু বিশেষ অণুজীব বা ব্যাকটেরিয়া বাস করে, যা সাধারণ মৌমাছির শরীরে থাকে না। এদের মধ্যে রয়েছে অ্যাসিড-সহনশীল ব্যাকটেরিয়া, যা মাংস হজম করতে সাহায্য করে এবং ক্ষতিকর জীবাণুর বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়।
মজার বিষয় হলো, একই ধরনের ব্যাকটেরিয়া শকুন, হায়েনাসহ অন্যান্য মৃতদেহভোজী প্রাণীর পাকস্থলীতেও পাওয়া যায়। অর্থাৎ ভিন্ন প্রাণী হলেও একই ধরনের খাদ্যাভ্যাস তাদের শরীরে প্রায় একই ধরনের অণুজীবের উপস্থিতি তৈরি করেছে।
শুধু তাই নয়, এই মৌমাছির চোয়ালও সাধারণ মৌমাছির চেয়ে আলাদা। শক্ত ও ধারালো চোয়ালের সাহায্যে তারা সহজেই মাংস কেটে ছোট ছোট টুকরো করতে পারে।
তবে আচরণের দিক থেকে তারা অনেকটাই সাধারণ মৌমাছির মতো। সংগ্রহ করা মাংস তারা চাকে নিয়ে যায়, সেখানে বিশেষ কুঠুরিতে জমা রাখে এবং বেড়ে ওঠা লার্ভা বা মৌশিশুদের খাওয়ায়। কারণ দ্রুত বেড়ে ওঠার জন্য তাদের প্রচুর প্রোটিনের প্রয়োজন হয়। এমনকি সাধারণ মৌমাছি যে পায়ের বিশেষ ঝুড়িতে পরাগ বহন করে, শকুন-মৌমাছিরা সেই একই অংশ ব্যবহার করে মাংসের টুকরো বহন করে।
প্রকৃতির বিস্ময়কর অভিযোজনের এক অনন্য উদাহরণ এই শকুন-মৌমাছি। ফুলের বদলে মৃত প্রাণীর দেহ থেকে খাদ্য সংগ্রহ করলেও, সেই অস্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে নিজেদের শরীর ও জীবনযাপনকে এমনভাবে মানিয়ে নিয়েছে যে, শেষ পর্যন্ত তারা মধুও তৈরি করতে সক্ষম হয়।
সূত্রঃ আইএফএলসায়েন্স