০১ জুলাই, ২০২৬
ভারতীয় মঞ্চনাট্যের প্রবাদপ্রতিম অভিনেত্রী, নাট্যপরিচালক ও আধুনিক মারাঠি থিয়েটারের অন্যতম পথিকৃৎ বিজয়া মেহতা আর নেই। দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভোগার পর ৩০ জুন মুম্বাইয়ের নেপিয়ান সি রোডের নিজ বাসভবনে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তিনি এক কন্যা ও দুই পুত্র রেখে গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে ভারতীয় নাট্যাঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিল্পী, নাট্যব্যক্তিত্ব, শিক্ষার্থী ও শুভানুধ্যায়ীরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছেন এই কিংবদন্তিকে।
ভারতীয় থিয়েটারের ইতিহাসে বিজয়া মেহতা ছিলেন এক অনন্য নাম। বিশেষ করে মারাঠি নাটকে আধুনিক চিন্তা, পরীক্ষাধর্মী উপস্থাপনা এবং সামাজিক বাস্তবতাকে নাট্যভাষায় রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিল অসামান্য। ‘ব্যারিস্টার’, ‘হামিদাবাইচি কোঠি’, ‘পুরুষ’ এবং ‘ওয়াদা চিরেবন্দি’র মতো নাটক তাঁর সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গির উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
মুম্বাইয়ের এক মধ্যবিত্ত কায়স্থ পরিবারে জন্ম নেওয়া বিজয়া মেহতা মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন।
অভিনয়জীবনের শুরু হয় পার্সি থিয়েটারের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব আদি মার্জবানের দলে। পরে ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামার কিংবদন্তি নাট্যব্যক্তিত্ব ইব্রাহিম আলকাজির কাছে অভিনয় ও নির্দেশনার প্রশিক্ষণ নেন।
উইলিয়াম শেকসপিয়রের ‘ওথেলো’র মারাঠি রূপান্তরে ডেসডিমোনা চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে আলোচনায় আসেন তিনি। পরবর্তী সময়ে নাট্যকার বিজয় টেন্ডুলকার, অভিনেতা ড. শ্রীরাম লাগু, সুলভা দেশপান্ডে ও অরবিন্দ দেশপান্ডের সঙ্গে মিলে প্রতিষ্ঠা করেন ‘রঙ্গায়ন’ নাট্যদল। এই দলটি মারাঠি থিয়েটারে আধুনিক নাট্যচর্চার নতুন ধারার সূচনা করে
পরীক্ষাধর্মী নাটকের পাশাপাশি বাণিজ্যিক থিয়েটারেও সমান সফল ছিলেন বিজয়া মেহতা। জার্মান নাট্যকার বার্টোল্ট ব্রেখটের বিখ্যাত নাটক ‘দ্য ককেশিয়ান চক সার্কেল’-এর মারাঠি রূপান্তর ‘আজব ন্যায় বার্তুলাচা’ পরিচালনা করে ব্যাপক প্রশংসা পান। একই সঙ্গে মহেশ এলকুঞ্চওয়ার ও জয়বন্ত ডালভির মতো খ্যাতিমান নাট্যকারদের সৃষ্টিও নতুনভাবে দর্শকদের সামনে তুলে ধরেন।
মঞ্চের বাইরে টেলিভিশনেও তাঁর সফল পদচারণা ছিল। আশির দশকে পরিচালিত চিকিৎসাবিষয়ক ধারাবাহিক ‘লাইফ লাইন’ দর্শকমহলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরিচালক পিটার ব্রুকের ‘মহাভারত’ প্রযোজনার সঙ্গেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পাশাপাশি ন্যাশনাল সেন্টার ফর দ্য পারফর্মিং আর্টস (এনসিপিএ) এবং ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামার (এনএসডি) প্রশাসনিক দায়িত্বও দক্ষতার সঙ্গে সামলেছেন।
শুধু নির্মাতা বা অভিনেত্রী হিসেবেই নয়, একজন অনুপ্রেরণাদায়ী শিক্ষক ও মেন্টর হিসেবেও বিজয়া মেহতার অবদান ছিল অনস্বীকার্য। তাঁর হাত ধরেই অভিনয়জগতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন নানা পাটেকর, রীমা লাগু, অশোক সরাফ, বিক্রম গোখলে, নীনা কুলকার্নি, ভারতী আচরেকর ও বন্দনা গুপ্তের মতো অসংখ্য শিল্পী।