থ্রিফট শপিংয়ের জনপ্রিয়তা বাড়ছে কেন?

০৩ জুলাই, ২০২৬

কয়েক বছর আগেও ব্যবহৃত পোশাক কেনার বিষয়টি অনেকের কাছে অস্বস্তিকর মনে হতো। “সেকেন্ড হ্যান্ড” শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল সামাজিক সংকোচও। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা বিভিন্ন অনলাইন স্টোরে থ্রিফট পোশাকের আলাদা বাজার তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে থ্রিফট শপিং এখন শুধু অর্থ সাশ্রয়ের উপায় নয়, বরং ফ্যাশন ও সচেতন জীবনধারার অংশ হয়ে উঠছে।

কম খরচে ভালো মানের পোশাক পাওয়া, ইউনিক ডিজাইনের প্রতি আকর্ষণ, পরিবেশ সচেতনতা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব, সব মিলিয়ে থ্রিফট শপিংয়ের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হোম ইকোনমিক্স ইউনিটের বস্ত্র পরিচ্ছদ ও বয়নশিল্প বিভাগের শিক্ষার্থী আফরা ইয়াসমীন অবনী প্রায় দুই বছর ধরে থ্রিফট শপিং করছেন। শুরুটা হয়েছিল কৌতূহল থেকে। তিনি বলেন, “প্রথমবার একটি জ্যাকেট কিনেছিলাম। কম দামে ভালো মানের পোশাক পেয়ে বেশ অবাক হয়েছিলাম। এরপর থেকেই থ্রিফট শপিংয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়।”

অবনীর মতে, থ্রিফট শপিংয়ের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো কম খরচে ভালো মানের পোশাক পাওয়া। পাশাপাশি অনেক সময় এমন ইউনিক ডিজাইনের পোশাক পাওয়া যায়, যা সাধারণ দোকানে সহজে পাওয়া যায় না।

তিনি বলেন, “এটি শুধু অর্থ সাশ্রয়ের বিষয় নয়, ফ্যাশন ট্রেন্ডও। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ভিনটেজ ও ইউনিক পোশাকের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।”

তবে থ্রিফট পোশাক নিয়ে সামাজিক সংকোচ পুরোপুরি দূর হয়নি বলেও জানান তিনি। অনেকেই এখনও ব্যবহৃত পোশাক নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেন। কিন্তু ভালোভাবে বাছাই করলে উন্নত মানের পোশাক পাওয়া সম্ভব বলে মনে করেন এই শিক্ষার্থী।

বিশেষজ্ঞদের মতে, থ্রিফট শপিংয়ের জনপ্রিয়তার পেছনে অর্থনৈতিক কারণের পাশাপাশি রয়েছে পরিবেশগত দিকও।

ক্লাইমেট ওয়াচের রিপোর্টার খাদিজা আক্তার মাহিমা বলেন, পোশাক শিল্প পরিবেশের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে। একটি জিন্স প্যান্ট উৎপাদনেই বিপুল পরিমাণ পানি প্রয়োজন হয়। অথচ পৃথিবীর অনেক অঞ্চলে মানুষ এখনও নিরাপদ পানির সংকটে ভুগছে।

তিনি বলেন, “কাপড় ডাস্টবিনে ফেলে দিলে তা দীর্ঘ সময় ধরে পরিবেশে থেকে যায়। থ্রিফট শপিংয়ের মাধ্যমে একই পোশাক বারবার ব্যবহার করা যায়, ফলে বর্জ্য কমে এবং পরিবেশের ওপর চাপও কমে।”

মাহিমার মতে, বাংলাদেশের জন্য পোশাক বর্জ্য একটি বড় পরিবেশগত সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে পোশাক শিল্পের বর্জ্য নদী, খাল ও জলাশয়ে গিয়ে পড়ছে, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। কাপড় ফেলে না দিয়ে পুনর্ব্যবহার করা দায়িত্বশীল ভোক্তা আচরণের অংশ। থ্রিফট সংস্কৃতি টেকসই জীবনযাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে।

থ্রিফট শপিংয়ের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তাকে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন হিসেবেই দেখছেন বস্ত্র প্রকৌশলী মো. আলিফ রোবাইয়াত। তিনি বলেন, “এটি শুধু সাময়িক ট্রেন্ড নয়। বর্তমানে মানুষ কম খরচে ভালো মানের পোশাক খুঁজছে। সেই চাহিদা থ্রিফট বাজারকে আরও বিস্তৃত করছে।”

আন্তর্জাতিক ফ্যাশন সংস্কৃতির সঙ্গেও বাংলাদেশের থ্রিফট বাজারের মিল রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। ইউরোপ ও আমেরিকায় বহু বছর ধরেই থ্রিফট শপিং জনপ্রিয়। সেখানেও কম খরচে ভালো মানের পোশাক পাওয়ার বিষয়টি ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে।

ফাস্ট ফ্যাশনের তুলনায় থ্রিফট শপিংকে বেশি পরিবেশবান্ধব বলেও মনে করেন আলিফ রোবাইয়াত। তার ভাষায়, “নতুন পোশাক উৎপাদনে প্রচুর পানি, জ্বালানি ও কাঁচামাল লাগে। থ্রিফট শপিং পোশাকের ব্যবহারকাল বাড়ায় এবং নতুন উৎপাদনের ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করে।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও থ্রিফট সংস্কৃতি জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আগে যেখানে ব্যবহৃত পোশাকের বাজার ছিল সীমিত, এখন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সারা দেশের ক্রেতাদের কাছে সহজেই পৌঁছানো যাচ্ছে।

তরুণদের একটি বড় অংশ এখন পোশাকের উৎসের চেয়ে তার মান, ব্যবহারযোগ্যতা এবং মূল্যকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে ব্যবহৃত পোশাক নিয়ে পূর্বের সামাজিক সংকোচও ধীরে ধীরে কমছে।

অর্থ সাশ্রয়, ব্যক্তিগত স্টাইল, পরিবেশ সচেতনতা এবং টেকসই জীবনধারার সমন্বয়ে থ্রিফট শপিং আজ নতুন এক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব ফ্যাশনের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়তে থাকলে আগামী দিনগুলোতে এই বাজার আরও বড় হবে।

একসময় যে পোশাককে অনেকে শুধুই “পুরনো” বলে ভাবতেন, আজ সেটিই নতুন প্রজন্মের কাছে হয়ে উঠছে সচেতন, সাশ্রয়ী ও স্টাইলিশ পছন্দ।