০৮ জুলাই, ২০২৬
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ইন্দোনেশিয়া সফরের মূল লক্ষ্য ছিল দুই দেশের কূটনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও জোরদার করা।তবে সফরের অন্যতম আকর্ষণ ছিল মধ্য জাভার ঐতিহাসিক প্রাম্বানান মন্দির কমপ্লেক্স পরিদর্শন।
ইয়োগ্যাকার্তায় অবস্থিত এই মন্দির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ ও নান্দনিক হিন্দু স্থাপত্যের নিদর্শন। একই সঙ্গে এটি সংরক্ষণে ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার সম্ভাব্য যৌথ উদ্যোগের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। এর মাধ্যমে দুই দেশের শতাব্দীপ্রাচীন সাংস্কৃতিক ও সভ্যতার বন্ধন আরও দৃঢ় করার বার্তা দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইন্দোনেশিয়ায় অবস্থিত প্রাম্বানান দেশটির সমৃদ্ধ হিন্দু ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল সাক্ষী।
ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে বড় হিন্দু মন্দির
ইয়োগ্যাকার্তার অদূরে মধ্য জাভার সমভূমিতে অবস্থিত প্রাম্বানান ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে বড় হিন্দু মন্দির কমপ্লেক্স। কম্বোডিয়ার আংকোর ওয়াতের পর এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম হিন্দু মন্দির।
নবম ও দশম শতকে প্রাচীন মাতারাম রাজ্যের সঞ্জয়া রাজবংশের শাসনামলে এই মন্দির নির্মিত হয়। এটি হিন্দুধর্মের ত্রিমূর্তি—শিব, বিষ্ণু ও ব্রহ্মাকে উৎসর্গ করে নির্মাণ করা হয়েছিল।।বৌদ্ধ ঐতিহ্যের প্রতীক বরোবুদুর মন্দিরের মতোই প্রাম্বানান ইন্দোনেশিয়ার সমৃদ্ধ হিন্দু ইতিহাসের প্রতীক। ১৯৯১ সালে এর ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যগত গুরুত্ব বিবেচনায় ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
অনন্য স্থাপত্যশৈলী
প্রাম্বানানের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর সুউচ্চ স্থাপত্য। বিস্তৃত আকারের বদলে এর মিনারগুলো আকাশের দিকে উঠে গেছে, যা দূর থেকেই নজর কাড়ে।
মন্দির কমপ্লেক্সের কেন্দ্রে রয়েছে শিব, বিষ্ণু ও ব্রহ্মার তিনটি প্রধান মন্দির। প্রায় ৪৭ মিটার উঁচু শিব মন্দিরটি সবচেয়ে বড়। এর ভেতরে শিব, দুর্গা, গণেশ ও ঋষি অগস্ত্যের মূর্তি সংরক্ষিত রয়েছে।
পুরো কমপ্লেক্সটি হিন্দু বিশ্বতত্ত্ব অনুসারে পরিকল্পিত। একসময় এখানে প্রায় ২৪০টি মন্দির ছিল, যার অনেকগুলো এখন ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে।
পাথরের গায়ে রামায়ণের কাহিনি।প্রাম্বানানের দেয়ালজুড়ে খোদাই করা রয়েছে রামায়ণের অসংখ্য দৃশ্য। দর্শনার্থীরা মন্দিরের চারপাশে ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘুরে এই খোদাই অনুসরণ করে যেন পাথরে লেখা একটি প্রাচীন কাহিনি পড়তে পারেন।
এই শিল্পকর্মে ভারতীয় মহাকাব্যের প্রভাব যেমন রয়েছে, তেমনি জাভার নিজস্ব শিল্পধারারও ছাপ স্পষ্ট। আজও মন্দির প্রাঙ্গণে খোলা আকাশের নিচে রামায়ণ ব্যালে মঞ্চস্থ হয়, যা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ।
রোরো জংগ্রাংয়ের কিংবদন্তি
প্রাম্বানানকে ঘিরে রয়েছে জনপ্রিয় জাভানিজ লোককাহিনি। কিংবদন্তি অনুযায়ী, রাজকুমারী রোরো জংগ্রাং বীর যোদ্ধা বান্দুং বন্ডোভোসোকে বিয়ে এড়াতে এক রাতের মধ্যে এক হাজার মন্দির নির্মাণের শর্ত দেন।
অলৌকিক শক্তির সাহায্যে যোদ্ধা প্রায় কাজ শেষ করে ফেললেও রাজকুমারীর কৌশলে ভোর হয়ে গেছে বলে আত্মারা কাজ ছেড়ে চলে যায়। শেষ পর্যন্ত ক্ষুব্ধ যোদ্ধা রাজকুমারীকে অভিশাপ দিয়ে পাথরে পরিণত করেন। স্থানীয়দের বিশ্বাস, শিব মন্দিরের দুর্গা মূর্তিটিই সেই রাজকুমারী। যদিও ইতিহাসবিদরা এটিকে কেবল লোককাহিনি হিসেবে বিবেচনা করেন।
ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনর্জন্ম
দশম শতকের পর রাজনৈতিক পরিবর্তন, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, ভূমিকম্প এবং দীর্ঘদিনের অবহেলায় প্রাম্বানান ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
উনিশ শতকে এটি পুনরাবিষ্কারের পর শুরু হয় দীর্ঘ পুনর্নির্মাণ কাজ। ২০০৬ সালের ভয়াবহ ইয়োগ্যাকার্তা ভূমিকম্পেও মন্দির ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরে প্রত্নতাত্ত্বিকদের তত্ত্বাবধানে ধাপে ধাপে এর সংস্কার করা হয়। বর্তমানে প্রধান মন্দিরগুলো তাদের আগের জৌলুস অনেকটাই ফিরে পেয়েছে।