১০ জুলাই, ২০২৬
বৃষ্টি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়; এটি মহান আল্লাহ তাআলার অসীম রহমত, করুণা ও অনুগ্রহের এক জীবন্ত নিদর্শন। আকাশ থেকে ঝরে পড়া প্রতিটি বৃষ্টিবিন্দু মানুষের হৃদয়ে নতুন আশা জাগায়, মৃত ভূমিকে পুনর্জীবিত করে এবং সৃষ্টিজগতের জন্য নিয়ে আসে কল্যাণের বার্তা।
তাই ইসলামে বৃষ্টিকে শুধুমাত্র একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে নয়, বরং আল্লাহর রহমতের প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনিই সেই সত্তা, যিনি মানুষের নিরাশ হওয়ার পর বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং তাঁর রহমত ছড়িয়ে দেন। তিনিই অভিভাবক, সর্বপ্রশংসিত।’ (সুরা : শুরা, আয়াত : ২৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বৃষ্টি দেখলে বিশেষ দোয়া পড়তেন, বৃষ্টির সময় আল্লাহর কাছে বেশি বেশি প্রার্থনা করতেন এবং উম্মতকে শিখিয়েছেন—এ সময় দোয়া কবুল হওয়ার বিশেষ আশা থাকে।
তাই একজন মুমিনের উচিত বৃষ্টিকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে গ্রহণ করা, আল্লাহকে স্মরণ করা এবং এ সময়কে ইবাদত ও দোয়ার মাধ্যমে মূল্যবান করে তোলা।
বৃষ্টি দেখলে যে দোয়া পড়া সুন্নত
রহমতের বৃষ্টি শুরু হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) এই সংক্ষিপ্ত অথচ অর্থবহ দোয়াটি পড়তেন,
اللَّهُمَّ صَيِّبًا نَافِعًا
উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা সাইয়্যিবান নাফিআ।
অর্থ : ‘হে আল্লাহ! এই বর্ষণকে আমাদের জন্য কল্যাণকর ও উপকারী করে দিন।’
হাদিস : আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন বৃষ্টি হতে দেখতেন, তখন এ দোয়া পাঠ করতেন।
(সহিহ বুখারি, হাদিস : ১০৩২)
এ দোয়ার মাধ্যমে একজন মুমিন আল্লাহর কাছে শুধু বৃষ্টি নয়; বরং কল্যাণকর, উপকারী ও বরকতময় বৃষ্টি কামনা করেন।
বৃষ্টির সময় দোয়া কবুলের বিশেষ সুযোগ
ইসলামে কিছু সময়কে দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বৃষ্টির সময় তার অন্যতম। সাহল ইবন সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুই সময়ের দোয়া প্রত্যাখ্যান করা হয় না, অথবা খুব কমই প্রত্যাখ্যান করা হয়—আজানের সময়ের দোয়া এবং যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার সময়ের দোয়া।’ অন্য বর্ণনায় এসেছে—‘বৃষ্টির সময়ের দোয়া।
’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ২৫৪০)
এ হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, বৃষ্টি শুরু হলে শুধু তা উপভোগ করাই নয়; বরং হাত তুলে নিজের, পরিবারের, দেশ ও সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করা উচিত।
বৃষ্টিকে আল্লাহর রহমত হিসেবে বিশ্বাষ করা
অনেক মানুষ বৃষ্টির প্রকৃত উৎস ভুলে বিভিন্ন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বা কুসংস্কারপূর্ণ ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে। অথচ ইসলাম শিক্ষা দেয়—বৃষ্টি একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। জায়েদ ইবন খালিদ জুহানী (রা.) বর্ণনা করেন, হুদাইবিয়ায় এক রাতে বৃষ্টি হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের উদ্দেশে বললেন— ‘আমার বান্দাদের কেউ আমার প্রতি ঈমানদার হয়েছে, আবার কেউ আমার প্রতি কুফরি করেছে। যে বলেছে, 'আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতে আমরা বৃষ্টি পেয়েছি', সে আমার প্রতি ঈমান এনেছে এবং তারকার প্রতি কুফরি করেছে। আর যে বলেছে, 'অমুক তারকার কারণে বৃষ্টি হয়েছে', সে আমার প্রতি কুফরি করেছে এবং তারকার প্রতি ঈমান এনেছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮৪৬, সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৭১)
অতএব একজন মুমিনের মুখে থাকা উচিত—"আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতেই আমরা বৃষ্টিপ্রাপ্ত হয়েছি।"
অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে পঠিতব্য দোয়া
কখনো কখনো অতিবৃষ্টির কারণে মানুষের জীবন-জীবিকা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের একটি সুন্দর দোয়া শিখিয়েছেন। আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, এক জুমার দিনে এক সাহাবি এসে অতিবৃষ্টির কারণে মানুষের দুর্ভোগের কথা জানালে রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহর কাছে এভাবে দোয়া করেন,
اللَّهُمَّ حَوَالَيْنَا وَلَا عَلَيْنَا، اللَّهُمَّ عَلَى الْآكَامِ وَالْجِبَالِ وَالْآجَامِ وَالظِّرَابِ وَالْأَوْدِيَةِ وَمَنَابِتِ الشَّجَرِ
উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা হাওয়ালাইনা ওয়া লা আলাইনা; আল্লাহুম্মা আলাল আকামি ওয়াল জিবালি ওয়াল আজামি ওয়াজ জিরাবি ওয়াল আওদিয়াতি ওয়া মানাবিতিশ শাজার।
অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমাদের ওপর নয়, আমাদের আশপাশে বর্ষণ করুন। হে আল্লাহ! টিলা, পাহাড়, বনভূমি, উপত্যকা এবং বৃক্ষরাজির স্থানে বৃষ্টি বর্ষণ করুন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৯৩৩)
এ দোয়া আমাদের শেখায়, আল্লাহর কাছে এমন বৃষ্টি চাইতে হবে যা রহমত হয়ে আসে, কষ্টের কারণ না হয়।
বৃষ্টি আল্লাহর মহান নিদর্শন
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি আকাশ থেকে বরকতময় পানি বর্ষণ করেছি। অতঃপর তা দ্বারা উদ্যান ও শস্য উৎপন্ন করেছি।’ (সুরা : কাফ, আয়াত : ৯)
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘তিনিই আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, অতঃপর তা দ্বারা মৃত ভূমিকে জীবিত করেন। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীলদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৬৫)
এসব আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—বৃষ্টি কেবল পানির ফোঁটা নয়; এটি আল্লাহর কুদরত, রহমত এবং পুনরুত্থানেরও একটি জীবন্ত নিদর্শন।
বৃষ্টির সময় আমাদের ছয় করণীয়
১. বৃষ্টি শুরু হলে আল্লাহর প্রশংসা করা।
২. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়া পড়া।
৩. বৃষ্টির সময় বেশি বেশি দোয়া ও ইস্তিগফার করা।
৪. বৃষ্টিকে আল্লাহর রহমত হিসেবে বিশ্বাস করা।
৫. অতিবৃষ্টি বা দুর্যোগ দেখা দিলে নববী দোয়া পাঠ করা।
৬. আল্লাহর নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং গুনাহ থেকে তওবা করা।
অতএব, বৃষ্টির প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের জন্য দোয়া, ইস্তিগফার ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুবর্ণ সুযোগ। তাই বৃষ্টি নামলেই শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ না হয়ে, নবী করিম (সা.)-এর সুন্নত অনুসরণ করে দোয়া পাঠ করা, আল্লাহর রহমতের শুকরিয়া আদায় করা এবং নিজের ও সমগ্র মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনায় হাত তুলে প্রার্থনা করাই একজন সচেতন মুমিনের পরিচয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বৃষ্টির রহমত থেকে উপকৃত হওয়ার এবং এ সময়ের দোয়া কবুল হওয়ার সৌভাগ্য দান করুন। আমিন।