১২ জুলাই, ২০২৬
পবিত্র কোরআন শুধু ইবাদতের বিধান দেওয়ার গ্রন্থ নয়; এতে রয়েছে ইতিহাস, শিক্ষা ও হেদায়াতের অসংখ্য দৃষ্টান্ত। বিভিন্ন নবী, জাতি ও সভ্যতার ঘটনা বর্ণনার পাশাপাশি কোরআনে এসেছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শহর, জনপদ ও অঞ্চলের নাম।
এসব স্থানের ইতিহাসে মানুষের জন্য রয়েছে শিক্ষা, সতর্কতা ও ঈমানের দিকনির্দেশনা।
১. মক্কা (মক্কা/বাক্কাহ)
পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র নগরী মক্কা। কোরআনে এ শহরের নাম সরাসরি ‘মক্কা’ (সুরা ফাতহ: ২৪) এবং ‘বাক্কাহ’ (সুরা আলে ইমরান: ৯৬)- দুইভাবেই এসেছে। এছাড়া ‘উম্মুল কুরা’ বা জনপদসমূহের জননী (সুরা শুরা: ৭) এবং ‘আল-বালাদুল আমীন’ বা নিরাপদ শহর (সুরা ত্বিন: ৩) নামেও এর মর্যাদা বর্ণিত হয়েছে।
মক্কাতেই জন্মগ্রহণ করেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স.)। এখানেই অবস্থিত পবিত্র কাবা শরিফ, যা মুসলমানদের কিবলা। এই নগরী থেকেই ইসলামের বিশ্বজনীন দাওয়াতের সূচনা হয়।
২. মদিনা (ইয়াসরিব)
বর্তমান মদিনা শহরের প্রাচীন নাম ছিল ইয়াসরিব। কোরআনে মুনাফিকদের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে এ নাম উল্লেখ করা হয়েছে- ‘আর যখন তাদের একদল বলেছিল, হে ইয়াসরিববাসী, এখানে তোমাদের কোনো স্থান নেই, তাই তোমরা ফিরে যাও।’ (সুরা আহজাব: ১৩)
হিজরতের পর এই শহর ‘মাদিনাতুন নবী’ বা নবীর নগরী হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এখানেই ইসলামের প্রথম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তি গড়ে ওঠে।
৩. মিসর (Egypt)
কোরআনে মিসর-সম্পর্কিত ঘটনা ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। হজরত ইউসুফ (আ.) ও হজরত মুসা (আ.)-এর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনেক ঘটনা এই ভূখণ্ডকে কেন্দ্র করে ঘটেছে।
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে- ‘তারা যখন ইউসুফের কাছে উপস্থিত হল, সে তার পিতা-মাতাকে নিজের কাছে স্থান দিল এবং বলল, ‘আল্লাহর ইচ্ছেয় পূর্ণ নিরাপত্তায় মিসরে প্রবেশ করুন।’ (সুরা ইউসুফ: ৯৯)
৪. বাবিল (Babylon)
কোরআনে বাবিল বা ব্যাবিলনের নাম এসেছে হারুত ও মারুত ফেরেশতাদ্বয় এবং জাদুবিদ্যার প্রসঙ্গে।
আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘...বাবিলে হারুত ও মারুত নামের দুই ফেরেশতার ওপর যা নাজিল হয়েছিল...।’ (সুরা বাকারা: ১০২)
বর্তমান ইরাকের এই প্রাচীন নগরী একসময় বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সভ্যতার কেন্দ্র ছিল।
৫. আহকাফ
কোরআনে আহকাফ নামের একটি অঞ্চলের উল্লেখ এসেছে। এটি ছিল আদ জাতির বসবাসের এলাকা।
আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘আর স্মরণ করুন আদ সম্প্রদায়ের ভাইয়ের কথা, যখন সে আহকাফের স্বীয় সম্প্রদায়কে সতর্ক করেছিল।’ (সুরা আহকাফ: ২১)
অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, বর্তমান ইয়েমেন ও ওমানের মধ্যবর্তী মরু অঞ্চলই আহকাফ।
৬. ইরাম
কোরআনে ইরামের কথা এসেছে সুউচ্চ স্তম্ভের অধিকারী জনপদ হিসেবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘ইরামের সঙ্গে, যার ছিল সুউচ্চ স্তম্ভ।’ (সুরা ফজর: ৭–৮)
তবে ইরাম সম্পর্কে মুফাসসিরদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ একে একটি নগরী বলেছেন, আবার কেউ আদ জাতির একটি বিশেষ গোত্র বা তাদের পূর্বপুরুষের নাম হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
৭. মাদইয়ান
মাদইয়ান ছিল হজরত শুয়াইব (আ.)-এর জাতির আবাসস্থল। কোরআনে একাধিক স্থানে এই জনপদের কথা এসেছে।
মাদইয়ানের লোকেরা ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রতারণা, মাপে কম দেওয়া এবং মানুষের অধিকার নষ্ট করার মতো অপরাধে লিপ্ত ছিল। হজরত শুয়াইব (আ.) তাদের সত্য ও ন্যায়ের পথে আহ্বান করেন। ইরশাদ হয়েছে- ‘আর মাদইয়ানে (প্রেরণ করেছিলাম) তাদের ভাই শুআইবকে। সে বলল, হে আমার কওম, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর। তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো (সত্য) ইলাহ নেই।’ (সুরা আরাফ: ৮৫)
৮. হিজর
হিজর ছিল সামুদ জাতির আবাসস্থল।
আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘হিজরের অধিবাসীরাও রাসুলদের অস্বীকার করেছিল।’ (সুরা হিজর: ৮০)
বর্তমান সৌদি আরবের মাদাইন সালিহ এলাকাকে এই ঐতিহাসিক স্থানের সঙ্গে চিহ্নিত করা হয়। সেখানে পাহাড় কেটে নির্মিত প্রাচীন স্থাপত্যের নিদর্শন এখনো রয়েছে।
৯. সাবা
বর্তমান ইয়েমেন অঞ্চলে অবস্থিত ছিল সমৃদ্ধ সাবা রাজ্য। কোরআনে সাবা জাতির সমৃদ্ধি, আল্লাহর নেয়ামত এবং পরবর্তীতে তাদের অকৃতজ্ঞতার কারণে বিপর্যয়ের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘সাবাবাসীদের জন্য তাদের আবাসস্থলে অবশ্যই একটি নিদর্শন ছিল।’ (সুরা সাবা: ১৫)
ইসলামি ঐতিহ্য অনুযায়ী, এ অঞ্চলই ছিল রানী বিলকিসের রাজ্য।
১০. রুম (রোমান সাম্রাজ্য)
কোরআনে ‘রুম’ (রোমান সাম্রাজ্য) সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ সুরা রয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘রোমানরা পরাজিত হয়েছে। নিকটস্থ ভূমিতে, কিন্তু তারা তাদের পরাজয়ের পর শীঘ্রই জয়লাভ করবে। কয়েক বছরের মধ্যেই। পূর্বের ও পরের সিদ্ধান্ত আল্লাহরই। আর সেদিন মুমিনরা হর্ষোৎফুল্ল হবে।’ (সুরা রুম: ২–৪)
তাফসিরবিদদের মতে, এখানে তৎকালীন পূর্ব রোমান (বাইজেন্টাইন) সাম্রাজ্য ও পারস্য সাম্রাজ্যের সংঘর্ষের কথা বলা হয়েছে। কোরআনে ঘোষিত এই ভবিষ্যদ্বাণী পরবর্তীতে ইতিহাসে বাস্তব রূপ নেয়।
জেরুজালেম ও মসজিদুল আকসা
কোরআনে জেরুজালেম বা বায়তুল মাকদিস শব্দ দুটি সরাসরি উল্লেখ নেই। তবে এই নগরীর মসজিদুল আকসার কথা কোরআনে স্পষ্টভাবে এসেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘পবিত্র তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ করিয়েছেন, যার চারপাশকে আমি বরকতময় করেছি...।’ (সুরা ইসরা: ১)
মসজিদুল আকসা ইসলামের অন্যতম পবিত্র স্থান। ইসরা ও মেরাজের ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে এ স্থান জড়িত। মুসলমানদের প্রথম কিবলাও ছিল মসজিদুল আকসা।
কোরআনে উল্লেখিত শহর, জনপদ ও অঞ্চলগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জন্য নানা শিক্ষা। কোথাও রয়েছে আল্লাহর রহমতের নিদর্শন, কোথাও নবীদের দাওয়াত ও সংগ্রামের ইতিহাস, আবার কোথাও রয়েছে অবাধ্য জাতির করুণ পরিণতি। এসব ঘটনা মনে করিয়ে দেয়- কোনো সভ্যতার স্থায়িত্ব শুধু শক্তি, সম্পদ বা স্থাপত্যের ওপর নির্ভর করে না; বরং আল্লাহর আনুগত্য, ন্যায়বিচার ও তাকওয়ার ওপরই প্রকৃত সফলতা নির্ভরশীল।