১৬ জুলাই, ২০২৬
প্রকৃতির রুদ্ররূপ আর প্রশাসনিক অবহেলার কী নির্মম বলি হতে পারে একটি তাজা প্রাণ, তারই এক বুকফাটা দৃষ্টান্ত দেখল নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া। চারদিকে অথৈ পানি, থমকে গেছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। প্রসব বেদনায় ছটফট করতে থাকা এক মা যখন হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হতে চাইলেন, তখন তার পথ আটকে দাঁড়িয়ে রইল যমদূতের মতো চেপে বসা জোয়ারের জল। শত চেষ্টা করেও পরিবারের সদস্যরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারলেন না।
অবশেষে কোনো চিকিৎসা ছাড়াই, ঘরের কোণে তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন প্রসূতি নাজমা আক্তার (৩০)। সঙ্গে চলে গেল তার গর্ভের অনাগত সন্তানটিও। বুধবার (১৫ জুলাই) দুপুরে নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের প্রত্যন্ত ইসলামপুর গ্রামে এই মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। নিহত নাজমা আক্তার ওই গ্রামের অতিদরিদ্র জেলে মো. হক সাবের স্ত্রী।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি আর অস্বাভাবিক জোয়ারের তোড়ে নিঝুমদ্বীপের বিস্তীর্ণ এলাকা এমনিতেই পানির নিচে তলিয়ে আছে। দুইদিন পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও বুধবার দুপুরের দিকে ধেয়ে আসে অতিরিক্ত জোয়ারের জল। মুহূর্তের মধ্যে ইসলামপুর গ্রামের প্রতিটি সড়ক, হাঁটাপথ এবং যোগাযোগের সব মাধ্যম কোমরসমান পানিতে তলিয়ে যায়। বন্ধ হয়ে পড়ে সব ধরনের যানবাহন চলাচল।
ঠিক এই বৈরি পরিস্থিতির মাঝেই বুধবার সকালে নাজমা আক্তারের প্রসববেদনা শুরু হয়। একদিকে প্রসূতির তীব্র চিৎকার, অন্যদিকে চারদিকে থৈ থৈ করা পানির বাধা—নিরুপায় স্বামী ও স্বজনরা দিশেহারা হয়ে পড়েন। তাকে কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালে নেওয়ার জন্য মরিয়া চেষ্টা চালানো হলেও পানির তীব্রতা আর কোনো যান না পাওয়ায় সব চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। একপর্যায়ে উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও শারীরিক জটিলতায় ঘরের বিছানাতেই নিভে যায় দুটি প্রাণ।
মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। এলাকাবাসীর মনে ক্ষোভ আর দীর্ঘশ্বাস যেন একাকার হয়ে গেছে।
২নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য কেফায়েত হোসেন অত্যন্ত ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন, সাম্প্রতিক জোয়ারের পানি ও জলাবদ্ধতায় আমাদের নিঝুমদ্বীপের সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ এখন চরমে পৌঁছেছে। একটা মুমূর্ষু রোগীকে যে দ্রুত হাসপাতালে নেব, সেই উপায়টুকুও প্রকৃতি আমাদের থেকে কেড়ে নিয়েছে। রাস্তাঘাট পানির নিচে তলিয়ে থাকায় আজ এই অসহায় বোনটিকে অকালে প্রাণ দিতে হলো। নাজমা আক্তারের এই করুণ মৃত্যু আমাদের যাতায়াত ব্যবস্থার কঙ্কালসার রূপটিকেই আবারও তুলে ধরল।
নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লাভলী আক্তার এই ট্র্যাজেডিতে গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, মারা যাওয়া প্রসূতির আগে আরও দুটো সন্তান রয়েছে। এটি ছিল তার তৃতীয় সন্তান। কিন্তু চারপাশে এত পানি আর যাতায়াতের কোনো পথ না থাকায় ঘরের ভেতরেই সন্তানসহ ছটফট করতে করতে তিনি মারা গেলেন। আমাদের এখানে কোনো ভালো রাস্তা নেই, আপদকালীন চিকিৎসার জন্য ভালো হাসপাতাল নেই। দ্বীপের মানুষকে প্রতিটি দিন বেঁচে থাকার জন্য কতটা কষ্ট করতে হয়, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
একটি মৃত্যু, অনেকগুলো অমীমাংসিত প্রশ্ন :
নাজমা আক্তারের এই অকাল বিদায় কেবল একটি সাধারণ মৃত্যু নয়; এটি দ্বীপ অঞ্চলের লাখো মানুষের স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ সুরক্ষার অভাবের এক জীবন্ত দলিল। জোয়ার এলেই যেখানে জীবন থমকে যায়, সেখানে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া যে কতটা আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো, তা নিঝুমদ্বীপের বাসিন্দারা প্রতিদিন হাড়েমাসি টের পাচ্ছেন।
নিঝুমদ্বীপের অভ্যন্তরীণ প্রধান সড়কগুলোর উচ্চতা বৃদ্ধি করা যেন জোয়ারের পানিতে তলিয়ে না যায়।
জরুরি রোগীদের স্থানান্তরের জন্য নৌ-অ্যাম্বুলেন্স বা বিশেষ যাতায়াত ব্যবস্থার টেকসই সমাধান।
দ্বীপাঞ্চলের সাধারণ মানুষের জন্য জরুরি প্রসূতি ও মাতৃস্বাস্থ্যসেবা সম্বলিত মিনি হাসপাতাল বা স্থায়ী স্বাস্থ্য ক্যাম্প স্থাপন।
জোয়ারের জল হয়তো একদিন নেমে যাবে, কিন্তু স্বামী হক সাবের শূন্য ঘর আর মা-হারা দুটি শিশুর চোখের জল কোনোদিন মুছবে না। নাজমা আক্তার ও তার অনাগত সন্তানের এই করুণ মৃত্যু যেন এক নীরব প্রশ্ন রেখে গেল—দ্বীপের মানুষের জীবনের মূল্য কি তবে জোয়ারের জলের চেয়েও সস্তা?