০২ আগস্ট, ২০২৬
উগান্ডার ঐতিহাসিক পুরোনো এনটেবে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর টার্মিনালে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বড় ভাই লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইয়োনাতান ‘ইয়োনি’ নেতানিয়াহুর একটি পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য উন্মোচন করা হয়েছে। ১৯৭৬ সালে এনটেবে বিমানবন্দরে জিম্মি উদ্ধার অভিযানে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) এলিট ফোর্সের নেতৃত্ব দেওয়ার সময় ঠিক যে স্থানে তিনি নিহত হয়েছিলেন, সেখানেই আনুষ্ঠানিকভাবে এই স্মৃতিস্তম্ভটি স্থাপন করা হয়।
শনিবার (১ আগস্ট) আয়োজিত এক আবেগঘন অনুষ্ঠানে উগান্ডার সামরিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল মুহুজি কাইনেরুগাবা উপস্থিত থেকে ভাস্কর্যটির পর্দা উন্মোচন করেন এবং এই ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতিচারণ করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে জেনারেল মুহুজি কাইনেরুগাবা বলেন, ১৯৭৬ সালের ৪ জুলাই এনটেবে অভিযানের সময় সাহসিকতা, কর্তব্যপরায়ণতা ও নিঃস্বার্থ সেবার অনন্য প্রতীক হয়ে ওঠা ইসরায়েলি উদ্ধারকারী দলের বীর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইয়োনি নেতানিয়াহুর এই স্মৃতিস্তম্ভ উন্মোচনে এই ঐতিহাসিক স্থানে উপস্থিত হতে পেরে তিনি অত্যন্ত সম্মানিত ও গর্বিত বোধ করছেন। এ সময় ঐতিহাসিক এই ঘটনায় প্রাণ হারানো সাধারণ জিম্মিদেরও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন উগান্ডার সেনাপ্রধান।
জিন-জ্যাক মাইমোনি, পাসকো কোহেন, ইদা বোরোচোভিচ এবং ডোরা ব্লচ নামের নিহত চার জিম্মির নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেই করুণ ঘটনায় জীবন হারানো নিরপরাধ জিম্মিদের আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি এবং তাদের স্মৃতি এই ভাবগম্ভীর ইতিহাসের এক অপরিহার্য অংশ। তিনি আরও যোগ করেন, উগান্ডা ও ইসরায়েলের মধ্যকার বন্ধুত্ব কেবল ১৯৭৬ সালের ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বহু বছর ধরে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বাস্তবিক সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে দুই দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রয়েছে।
বিশেষ এই স্মারক তৈরির প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল এই বছরের শুরুর দিকে, যখন উগান্ডার সেনাপ্রধান ও দেশটির প্রেসিডেন্ট ইওয়েরি মুসেভেনির ছেলে লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুহুজি কাইনেরুগাবা ঘোষণা দেন যে ইয়োনি নেতানিয়াহু যেখানে নিহত হয়েছিলেন ঠিক সেই স্থানে তার একটি মূর্তি স্থাপন করা হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এবং পরবর্তীতে মুছে ফেলা এক পোস্টে সেনাপ্রধান দাবি করেছিলেন, এই ভাস্কর্য নির্মাণের পেছনে তার এক ঐশ্বরিক দর্শন ও অনুপ্রেরণা রয়েছে। সেই বার্তায় তিনি লিখেছিলেন, গত চার বছর ধরে তার ঈশ্বর স্বপ্নে আবির্ভূত হয়ে এন্টেবেতে ইয়োনি নেতানিয়াহুর স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং বিশ্বকে ভয় না পাওয়ার বার্তা দিয়েছেন।
১৯৭৬ সালের সেই বিশ্ব আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল যখন তেল আবিব থেকে প্যারিসগামী ২৪৬ জন যাত্রী বহনকারী এয়ার ফ্রান্সের একটি বিমান এথেন্সে যাত্রাবিরতির পর ছিনতাই হয়। পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন এবং জার্মানির রেভোলিউশনারি সেলসের যৌথ হাইজ্যাকার দলটি বিমানটিকে উগান্ডায় নিয়ে যায়। সেখানে তৎকালীন স্বৈরাচারী শাসক ইদি আমিন বিমান ছিনতাইকারীদের আশ্রয় দেন এবং তারা ৫ মিলিয়ন ডলার মুক্তিপণ ও ৫৩ জন ফিলিস্তিনপন্থী বন্দির মুক্তির দাবি জানায়। বিমানবন্দরে অবতরণের পর ছিনতাইকারীরা ইসরায়েলি ও ইহুদি যাত্রীদের পৃথক করে ফেলে এবং বাকিদের দুই দিন ধরে ধাপে ধাপে মুক্তি দেয়।
বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনার ঠিক এক সপ্তাহ পর ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর চারটি সি-১৩০ হারকিউলিস পরিবহন বিমান হাজার হাজার মাইল পথ অতিক্রম করে এনটেবে বিমানবন্দরে পৌঁছায়। অত্যন্ত দুঃসাহসিক ও নাটকীয় সেই উদ্ধার অভিযান মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন হয়। অভিযানে ছিনতাইকারীদের কবল থেকে অধিকাংশ জিম্মিকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও চারজন জিম্মি এবং আইডিএফ ফোর্সের একমাত্র সামরিক সদস্য হিসেবে কমান্ডার ইয়োনি নেতানিয়াহু নিহত হন। ৫০ বছর পর সেই ঐতিহাসিক এনটেবে অভিযানের স্মৃতিকে চিরস্মরণীয় করে রাখতেই উগান্ডা সরকারের উদ্যোগে এই বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলো।
সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল