প্রবাসীরা যেভাবে ভিডিও কলে বিয়ে সম্পন্ন করবেন

১২ আগস্ট, ২০২৬

বিয়ে একটি পবিত্র অঙ্গীকার। আল্লাহ তাআলা বিবাহবন্ধনকে ‘মিসাকান গালিজা’—অত্যন্ত দৃঢ় অঙ্গীকার হিসেবে অভিহিত করেছেন। বর্তমানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকেই বিদেশে অবস্থান করেন, আর পাত্র-পাত্রীর একজন বা উভয়জন ভিন্ন দেশে থাকায় সরাসরি বিয়ের মজলিসে উপস্থিত হওয়া সবসময় সম্ভব হয় না। ফলে ভিডিও কলের মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

এ ক্ষেত্রে ইসলামী ফিকহের মূলনীতি হলো—বিবাহের আকদ এমন পদ্ধতিতে সম্পন্ন হতে হবে, যাতে ইজাব-কবুল, সাক্ষী এবং একই মজলিসে আকদ সম্পাদনের প্রয়োজনীয় শর্তগুলো যথাযথভাবে পূরণ হয়। তাই দূরদেশে অবস্থানকারী পাত্র-পাত্রীর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও প্রচলিত শরিয়াহসম্মত পদ্ধতি হলো—উকিল বা প্রতিনিধি নিয়োগ করে তার মাধ্যমে একই মজলিসে দুই সাক্ষীর উপস্থিতিতে ইজাব-কবুল সম্পন্ন করা।

কননা আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ করো।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ১)

তাই বিয়েকে নিছক আনুষ্ঠানিকতা মনে করা যাবে না। ইজাব-কবুল, সাক্ষী, অভিভাবকত্বসহ শরিয়তের যেসব বিধান প্রযোজ্য, সেগুলো যথাযথভাবে পালন করেই বিবাহ সম্পন্ন করতে হবে।

উদাহরণস্বরুপ : ধরা যাক, বর সৌদি আরব, কাতার, যুক্তরাজ্য কিংবা অন্য কোনো দেশে অবস্থান করছেন, আর কনে বাংলাদেশে।

এখন তারা যদি মোবাইল বা ভিডিও কলে একে অপরের সঙ্গে সরাসরি ইজাব-কবুল করেন, তাহলে প্রশ্ন আসে—বিয়ের মজলিস ও সাক্ষীর শর্ত কীভাবে পূরণ হবে?

হানাফি ফিকহে একই মজলিসে ইজাব-কবুল ও সাক্ষীদের উপস্থিতির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে শুধু ভিডিও কলের মাধ্যমে দূরবর্তী দুই স্থানে অবস্থান করে সরাসরি ইজাব-কবুল করাকে বিয়ের নিরাপদ ও শরিয়াহসম্মত পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করা হয় না। তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রবাসী অবস্থায় বিয়ে করা অসম্ভব। বরং শরিয়তসম্মত একটি সুন্দর সমাধান হলো—উকিল বা প্রতিনিধি নিয়োগ করা।

উকিলের মাধ্যমে প্রবাসীর বিয়ে

ইসলামী ফিকহে একজন ব্যক্তি অন্য কাউকে নিজের পক্ষ থেকে বিবাহের আকদ সম্পন্ন করার জন্য উকিল বা প্রতিনিধি করতে পারেন।

ফলে বর বিদেশে থেকেও দেশে কাউকে নিজের পক্ষ থেকে বিয়ের আকদ সম্পন্ন করার দায়িত্ব দিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে দুটি পদ্ধতিটি হতে পারে—

প্রথম পদ্ধতি :

বর বিদেশে থেকে টেলিফোন বা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য মাধ্যমে দেশে একজন ব্যক্তিকে নিজের পক্ষ থেকে বিয়ের উকিল নিযুক্ত করবেন। এরপর বিয়ের মজলিসে কনের পক্ষ থেকে তার ওলি বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি বলবেন—‘আমি অমুক মেয়েকে অমুক ব্যক্তির সঙ্গে এত টাকা মহরের বিনিময়ে বিবাহ দিলাম।’ তখন বরের নিযুক্ত উকিল বলবেন— ‘আমি অমুক বরের পক্ষ থেকে তা কবুল করলাম।’ এ সময় শরিয়তের নির্ধারিত সাক্ষীরা উপস্থিত থাকবেন এবং ইজাব-কবুল স্পষ্টভাবে শুনবেন। এভাবে আকদ সম্পন্ন করা যাবে। (বাদায়েউস সানায়ে, ২/২৩১, আদ্দুররুল মুখতার, ৩/১৪)

দ্বিতীয় পদ্ধতি :

বিপরীত পদ্ধতি হলো- কনের পিতা বা শরিয়তসম্মতভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত অভিভাবক দেশে থেকে বিদেশে অবস্থানরত কোনো ব্যক্তিকে নিজের পক্ষ থেকে উকিল নিযুক্ত করবেন। এরপর বিদেশে বরের উপস্থিতিতে সেই উকিল বিয়ের মজলিসে শরিয়তের নির্ধারিত সাক্ষীদের সামনে বলবেন— ‘আমি অমুক মেয়েকে অমুক ব্যক্তির সঙ্গে এত টাকা মহরের বিনিময়ে বিবাহ দিলাম।’ তখন বর বলবেন—‘আমি কবুল করলাম।’ এভাবেও যথাযথ শর্ত পূরণ হলে আকদ সম্পন্ন হতে পারে। (আদ্দুররুল মুখতার, ৩/১৪, ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া, ১১/১৬১)

ভিডিও কল ছাড়া মেসেজের মাধ্যমে বিয়ে 

শুধু মেসেজ, ই-মেইল বা লিখিত বার্তা পাঠিয়ে অপর পক্ষের সঙ্গে সরাসরি বিয়ে সম্পন্ন করা নিরাপদ ও যথেষ্ট নয়। কারণ এখানে প্রেরকের পরিচয়, ইজাব-কবুলের মজলিস এবং সাক্ষীদের উপস্থিতির মতো বিষয়গুলো শরিয়াহসম্মতভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে ফিকহের আলোচনায় লিখিত ইজাবের একটি বিশেষ পদ্ধতি রয়েছে। কোনো ব্যক্তি লিখিতভাবে বিবাহের প্রস্তাব পাঠালে, প্রস্তাবদাতার পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তা শরিয়তের নির্ধারিত সাক্ষীদের সামনে পাঠ করা এবং অপর পক্ষের পক্ষ থেকে মৌখিকভাবে গ্রহণ করার মাধ্যমে আকদ সম্পন্ন হওয়ার বিধান ফিকহের গ্রন্থে আলোচিত হয়েছে। (খুলাসাতুল ফাতাওয়া, ২/৪৯, রদ্দুল মুহতার, ৩/১২)

তবে সাধারণ মানুষের জন্য এসব জটিল ফিকহি পদ্ধতি নিজেরা প্রয়োগ না করে নির্ভরযোগ্য আলেম বা মুফতির তত্ত্বাবধানে আকদ সম্পন্ন করাই অধিক নিরাপদ।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

প্রবাসী পাত্র-পাত্রীর বিয়েতে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকা প্রয়োজন—

১. উকিল কে হচ্ছেন, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

২. উকিল নিয়োগকারী ব্যক্তি সত্যিই ওই ব্যক্তি কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে।

৩. মহরের পরিমাণ আগে থেকেই নির্ধারণ করা উচিত।

৪. বিয়ের মজলিসে সাক্ষীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।

৫. ইজাব ও কবুলের শব্দ স্পষ্ট হতে হবে।

৬. কনের ওলি বা তার প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি শরিয়াহ অনুযায়ী নিশ্চিত করতে হবে।

৭. শুধু ভিডিও কলে বর-কনের কথোপকথনকে বিয়ের আকদ মনে করা উচিত নয়।

৮. মেসেজ বা ই-মেইলের মাধ্যমে নিজেরা বিয়ে সম্পন্ন করার চেষ্টা না করে অভিজ্ঞ আলেম বা মুফতির তত্ত্বাবধানে আকদ করা জরুরি।

অতএব, প্রবাসে থাকা পাত্র-পাত্রীর বিয়ের ক্ষেত্রে ভিডিও কলের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যক্তিকে উকিল নিযুক্ত করা যেতে পারে; এরপর উকিল, ওলি এবং সাক্ষীদের উপস্থিতিতে একই মজলিসে ইজাব-কবুল সম্পন্ন করাই অধিক নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি।