১৭ আগস্ট, ২০২৬
ডাল ও ডিম—দুটি পরিচিত খাবার। তবে এই দুই উপকরণ একসঙ্গে রান্না করলে কেমন হয়? ভারতের পূর্বাঞ্চলে এই দুই খাবারের মেলবন্ধনেই তৈরি হয়েছে জনপ্রিয় পদ ‘ডিম তড়কা’ বা ‘আণ্ডা তড়কা’।
ডাল, বিভিন্ন মসলা এবং তার সঙ্গে স্ক্র্যাম্বলড ডিম—এই খাবার সাধারণত রুটির সঙ্গে পরিবেশন করা হয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে রাস্তার ধারের খাবারের দোকান, ধাবা ও পিস হোটেলে দীর্ঘদিন ধরেই জনপ্রিয় ডিম তড়কা। পরে এটি ওডিশা ও আসামের কিছু এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ে।
ডালে ডিম যোগ হলো কীভাবে ?
ডিম তড়কার সঠিক উৎপত্তি কোথায় বা কে প্রথম এই খাবার তৈরি করেছিলেন, তার নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। এ নিয়ে খাদ্য ইতিহাসবিদ ও লেখকদের মধ্যে রয়েছে একাধিক মত।
একটি প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, কলকাতা ও আশপাশের সড়কপথে ধাবা সংস্কৃতি বিস্তারের সময় এই খাবারের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। পণ্যবাহী ট্রাকের চালক ও পথচারীদের জন্য রাস্তার পাশে গড়ে ওঠা খাবারের দোকানগুলো স্থানীয় মানুষের স্বাদ অনুযায়ী খাবারে নানা পরিবর্তন আনত।
খাদ্যলেখক কল্যাণ কারমাকার তার লেখায় কলকাতার খাদ্য ইতিহাসবিদ পৃথা সেনের একটি মত তুলে ধরেছেন। সেই বর্ণনা অনুযায়ী, পাঞ্জাবি ধাবাগুলোতে পরিবেশন করা তুলনামূলক ঘন ও সমৃদ্ধ ডালের সঙ্গে বাঙালিদের আমিষ খাবারের প্রতি আগ্রহকে মিলিয়ে ডালে ডিম, কিমা বা কখনো কলিজা যোগ করার ধারণা তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
এতে ডাল হয়ে উঠত আরো ভারী ও পেটভরা। ব্যবসায়িক দিক থেকেও এটি ছিল সুবিধাজনক—অল্প পরিমাণ ডালের সঙ্গে ডিম বা মাংস যোগ করলে একটি পরিবেশনেই খাবার আরও পরিপূর্ণ হয়ে উঠত।
রাঁধুনিদের হাত ধরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে
তবে ডিম তড়কার গল্প শুধু ধাবাকে ঘিরেই নয়।
খাদ্যলেখক মধুশ্রী বসু রায়ের মতে, কোনো খাবারের যাত্রাপথ নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন।
তার একটি ধারণা, কলকাতার পিস হোটেলে কাজ করা ওডিয়া রাঁধুনিদের মাধ্যমেও এ ধরনের খাবার ওডিশায় পৌঁছে থাকতে পারে। কলকাতায় কাজের সময় কোনো খাবার শেখার পর রাঁধুনিরা তা নিজেদের এলাকায় নিয়ে যেতে পারেন—এমন সম্ভাবনাও রয়েছে।
ফলে ডিম তড়কা হয়তো একক কোনো জায়গা থেকে ছড়ায়নি। মানুষের যাতায়াত, রাঁধুনিদের স্থানান্তর এবং নতুন খাবারের দোকান গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন অঞ্চলে এর রূপ বদলেছে।
কেউ কেউ মনে করেন, খাবারটির অস্তিত্ব ১৯৩০-এর দশকেও থাকতে পারে। তবে ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে এটি বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে বলে ধারণা করা হয়।
ডালে ডিম নিয়ে আপত্তিও আছে!
ডালে ডিমের এই সংমিশ্রণ সবার কাছে অবশ্য স্বাভাবিক নয়। কলকাতার খাবার নিয়ে একটি অনুষ্ঠানে ডিম তড়কা প্রসঙ্গে শেফ কুনাল কাপুরও বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। পাঞ্জাবি এই শেফের কাছে খাবারটি ছিল বেশ অপরিচিত।
বিষয়টি বেশ চমকপ্রদ। কারণ ডিম তড়কার উৎপত্তি নিয়ে যে তত্ত্বে পাঞ্জাবি ধাবার প্রভাবের কথা বলা হয়, সেই খাবারই আবার একজন পাঞ্জাবি শেফের কাছে অপরিচিত ছিল।
শুধু খাবার নয়, স্মৃতির সঙ্গেও জড়িত
ডিম তড়কার জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে এর সহজলভ্যতা ও স্বাদ। ডাল, ডিম, মসলা ও রুটি—সাধারণ উপকরণেই তৈরি হয় খাবারটি। সঙ্গে থাকে পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ ও কখনো আচার।
তবে রাস্তার ধারের ধাবায় রান্না করা ডিম তড়কার স্বাদ অনেকের কাছে আলাদা। রান্নার ধোঁয়াটে ঘ্রাণ, মসলার স্বাদ আর গরম রুটির সঙ্গে ডিম মেশানো ডাল—সব মিলিয়ে এটি হয়ে উঠেছে এক ধরনের ‘কমফোর্ট ফুড’।
বাংলাদেশে ডাল-ডিমের সংমিশ্রণ খুব পরিচিত না হলেও, খাবারের এই গল্প দেখায় কীভাবে মানুষের চলাচল, রাঁধুনিদের হাত বদল এবং স্থানীয় স্বাদের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে একটি খাবার নতুন পরিচয় পেতে পারে।
ডিম তড়কার সঠিক জন্মস্থান হয়তো কখনো নিশ্চিতভাবে জানা যাবে না। তবে ডালের সঙ্গে ডিমের এই অদ্ভুত জুটি যে ভারতের পূর্বাঞ্চলের মানুষের কাছে দীর্ঘদিন ধরে প্রিয়, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।