১৯ আগস্ট, ২০২৬
অনেক মুসলমানের মনে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায়—আমরা কিভাবে আমাদের অন্তরকে ফিতনা থেকে রক্ষা করব? কারণ এখন ফিতনাকে আমাদের কাছে আসা থেকে সম্পূর্ণরূপে ঠেকিয়ে রাখা অত্যন্ত কঠিন।
যেমন একটি জাহাজের নিয়তি হলো উত্তাল ঢেউ ও প্রচণ্ড ঝড়ের মুখোমুখি হওয়া, তেমনি এর অধিনায়ক যদি নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছতে চান, তবে তাঁকে সর্বদা সতর্ক ও সজাগ থাকতে হয়।
ঠিক তেমনি চারপাশে যত বেশি ফিতনা বাড়ে, একজন মুমিনের জন্য তত বেশি সতর্কতা, আত্মসমালোচনা ও অন্তরের সংস্কার অপরিহার্য হয়ে ওঠে। যেমন—বিচক্ষণ নাবিক ঝড় আসার আগেই নিরাপত্তার সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেন, তেমনি একজন মুমিনেরও উচিত নিজের অন্তরকে ফিতনা থেকে রক্ষার সব উপায় অবলম্বন করা এবং নিজের দ্বিন ও আখিরাতের নিরাপত্তার জন্য প্রস্তুত থাকা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘অন্ধকার রাতের টুকরার মতো ফিতনা আসার আগে নেক আমলে অগ্রসর হও। তখন মানুষ সকালে মুমিন থাকবে, সন্ধ্যায় কাফির হয়ে যাবে; আবার সন্ধ্যায় মুমিন থাকবে, সকালে কাফির হয়ে যাবে।
’(তিরমিজি, হাদিস : ২১৯৫)
নিঃসন্দেহে, যখন ফিতনা সহজেই মানুষের অন্তরে পৌঁছে যায়, তখন একজন মুমিনের আরো বেশি সতর্কতা, আত্মরক্ষা এবং সব ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অপরিহার্য।
ফিতনা ধীরে ধীরে অন্তরে প্রবেশ করে
ফিতনার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এটি একবারে অন্তরে প্রবেশ করে না; বরং ধীরে ধীরে প্রবেশ করে। একটি ছোট্ট প্রবৃত্তি, একটি সামান্য সন্দেহ, একটি নিষিদ্ধ দৃষ্টি কিংবা একটি আপাত তুচ্ছ কথা—এভাবেই ছোট ছোট বিষয় জমতে জমতে একসময় পুরো অন্তরকে ঢেকে ফেলে। অথচ মানুষ টেরই পায় না।
মহানবী (সা.) এ দৃশ্য অত্যন্ত সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন—‘ফিতনাগুলো একটির পর একটি মাদুরের বুননের মতো অন্তরের সামনে উপস্থাপিত হয়।’ (সহিহুল জামে, হাদিস : ২৯৬০)
অর্থাৎ ফিতনা একসঙ্গে আসে না; বরং বারবার আসে। ফলে ধীরে ধীরে নফস তা গ্রহণ করতে শেখে, অন্তর তার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যায়। প্রথমবার প্রভাবিত না হলেও দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার প্রভাবিত হতে পারে। অন্তর ঠিক থাকলে মানুষের সব কাজ ঠিক থাকে; আর অন্তর নষ্ট হলে পুরো জীবনই নষ্ট হয়ে যায়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জেনে রেখো, শরীরে একটি মাংসপিণ্ড আছে, তা ভালো থাকলে পুরো শরীর ভালো থাকে আর তা নষ্ট হলে পুরো শরীর নষ্ট হয়ে যায়। জেনে রেখো, সেটিই হলো অন্তর।’ (বুখারি, হাদিস : ৫২)
অন্তরের মাধ্যমেই মানুষ তার রবকে চেনে, ভালোবাসে, তাঁকে ভয় করে এবং তাঁরই কাছে আশা রাখে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো উপকারে আসবে না; উপকারে আসবে কেবল সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহর কাছে বিশুদ্ধ অন্তর নিয়ে উপস্থিত হবে।’ (সুরা : আশ-শুআরা, আয়াত: ৮৮-৮৯)
পাপের পথ ধরে অন্তরের সর্বনাশ হয়ে যায়। তাই পাপ বর্জনের কোনো বিকল্প নেই। আল্লাহ বলেন, ‘কখনো নয়! বরং তাদের কৃতকর্ম তাদের অন্তরের ওপর মরিচা ধরিয়ে দিয়েছে।’ (সুরা : আল-মুতাফফিফিন, আয়াত : ১৪)
তাই অন্তরের যত্ন নেওয়া অপরিহার্য। আর আল্লাহর জিকির ও কোরআন তিলাওয়াতে অন্তরের সর্বোত্তম যত্ন নেওয়া যায়। পবিত্র কোরআনের বাণী—‘ঈমানদারদের জন্য কি এখনো সেই সময় আসেনি, যখন তাদের অন্তর আল্লাহর স্মরণ ও অবতীর্ণ সত্যের সামনে বিনীত হবে? তারা যেন তাদের মতো না হয়, যাদের আগে কিতাব দেওয়া হয়েছিল; দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ায় তাদের অন্তর কঠোর হয়ে গিয়েছিল আর তাদের বেশির ভাগ ছিল অবাধ্য। জেনে রেখো, আল্লাহ মৃত পৃথিবীকে জীবিত করেন। আমি তোমাদের জন্য নিদর্শনগুলো স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছি, যাতে তোমরা উপলব্ধি করতে পারো।’ (সুরা : আল-হাদিদ, আয়াত : ১৬-১৭)