২৪ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাসে দেশের অর্থনীতিতে কিছু সূচকে উন্নতি হলেও সামগ্রিক চিত্র এখনো আশাব্যঞ্জক নয় বলে মনে করছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। সংস্থাটির পর্যালোচনায় অর্থনীতির ৩১টি প্রধান সূচকের মধ্যে ১৯টিতেই অবনতি হয়েছে। বিপরীতে প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভসহ ১২টি সূচকে অগ্রগতি দেখা গেছে।
সোমবার রাজধানীতে ‘সরকারের ছয় মাস: পারফরম্যান্স পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া ডায়ালগে এসব তথ্য তুলে ধরেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, নতুন সরকারের কাছে জনগণের বড় প্রত্যাশা ছিল অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু ছয় মাসের বাস্তবতায় এ দুটি ক্ষেত্রেই প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যায়নি।
সিপিডির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমে ৩ শতাংশের নিচে নেমেছে। একই সময়ে রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। শিল্প খাতেও গ্যাস ও বিদ্যুতের দীর্ঘস্থায়ী সংকট বিনিয়োগ ও উৎপাদন কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দায়িত্ব নেওয়ার সময় যে মূল্যস্ফীতি, তারল্য সংকট ও বাজারের অস্থিরতা ছিল, ছয় মাস পরও সেসব সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হয়নি।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বর্তমান সরকার আগের সরকারের কাছ থেকে একটি দুর্বল অর্থনৈতিক কাঠামো পেয়েছে। ব্যাংকিং খাতের সংকট, খেলাপি ঋণ, অর্থ পাচার, তারল্য সংকট ও রাজস্ব ঘাটতির মতো বড় সমস্যাগুলো ছিল শুরু থেকেই। তবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে দ্রুত ঘুরে দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত গতি পাওয়া যায়নি।
তার মতে, অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে বিচ্ছিন্ন কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও সামগ্রিকভাবে একটি সমন্বিত সংস্কার কার্যক্রমের ঘাটতি রয়েছে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য শুধু স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ নয়, কাঠামোগত সংস্কারের দিকেও নজর দিতে হবে।
অর্থনীতির পাশাপাশি সরকারের সুশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সিপিডি। দেবপ্রিয় বলেন, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, সিন্ডিকেট ও মব সংস্কৃতি বন্ধের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তন সীমিত।
মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। একই সঙ্গে নারী, শিশু ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং মব সহিংসতা বন্ধে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন।
দেবপ্রিয় আরও বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সংকটগুলোর একটি সমন্বিত ও তথ্যভিত্তিক চিত্র প্রকাশ করা হয়নি। ফলে সরকার কী ধরনের পরিস্থিতি পেয়েছিল এবং ছয় মাসে কতটা পরিবর্তন এসেছে—তা পরিমাপের ক্ষেত্রে তথ্যের ঘাটতি রয়েছে।
তবে সরকারের সব উদ্যোগকে নেতিবাচক হিসেবে দেখছে না সিপিডি। এমপিদের গাড়ি ও প্লট না নেওয়ার সিদ্ধান্ত, কয়েকটি আলোচিত মামলার দ্রুত বিচার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং বাজেটে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানোর মতো কিছু পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন দেবপ্রিয়।
তিনি বলেন, অর্থনীতি দ্রুত সচল করতে হলে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের বদলে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে অর্থনীতি ও সুশাসন—দুই ক্ষেত্রেই জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকারের জবাবদিহিতা ও কার্যকর পদক্ষেপ বাড়ানো জরুরি।