০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
মানুষ স্বপ্ন দেখে—কেউ বড় হওয়ার, কেউ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার, কেউ জ্ঞানী হওয়ার, কেউ একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার। কিন্তু স্বপ্ন আর বাস্তবতার মাঝখানে যে সেতুটি নির্মাণ করতে হয়, তার নাম পরিশ্রম।
প্রতিভা মানুষকে সম্ভাবনার দরজায় পৌঁছে দিতে পারে, সুযোগ তাকে পথ দেখাতে পারে; কিন্তু সেই পথে এগিয়ে নিয়ে যায় পরিশ্রম, ধৈর্য ও অধ্যবসায়।
জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যগুলোর একটি হলো—কোনো অর্জনই বিনা মূল্যে আসে না। একটি ফলবান গাছের পেছনে যেমন থাকে মাটির গভীরে প্রোথিত শিকড়, তেমনি একটি সফল জীবনের পেছনেও থাকে অসংখ্য অদৃশ্য শ্রম, ত্যাগ, ব্যর্থতা ও অপেক্ষার গল্প। তাই ইসলাম মানুষকে অলসতা নয়, চেষ্টা ও কর্মের শিক্ষা দিয়েছে।
কোরআন ও সুন্নাহর দিকনির্দেশনা থেকে স্পষ্ট হয়—মুমিনের জীবনে দোয়ার পাশাপাশি চেষ্টা থাকবে, তাওয়াক্কুলের পাশাপাশি কর্ম থাকবে এবং আশার পাশাপাশি থাকবে অবিচল অধ্যবসায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর মানুষ তাই পায়, যার জন্য সে চেষ্টা করে।’ (সুরা : নাজম, আয়াত : ৩৯)
মানুষকে তার সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করতে হবে। শুধু কল্পনা, আকাঙ্ক্ষা কিংবা স্বপ্ন দিয়ে জীবন বদলে যায় না; প্রয়োজন বাস্তব পদক্ষেপ ও নিরন্তর প্রচেষ্টা।
তবে এর অর্থ এমন নয় যে মানুষ যতটুকু পরিশ্রম করবে, ঠিক ততটুকু ফলই অবশ্যই তার হাতে আসবে। বরং আয়াতটি মানুষকে তার চেষ্টা ও দায়িত্বের প্রতি সচেতন করে। ফলাফল শেষ পর্যন্ত মহান আল্লাহর হাতে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর কাছে দুর্বল মুমিনের চেয়ে উত্তম ও অধিক প্রিয়। তবে উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে।
যা তোমার জন্য উপকারী, তা অর্জনে আগ্রহী হও, আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও এবং অক্ষম হয়ে বসে থেকো না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৬৪)
তাওয়াক্কুল মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়
তাওয়াক্কুলের অর্থ অনেকেই ভুল বোঝেন। কেউ মনে করেন, ‘আল্লাহর ওপর ভরসা করেছি, তাই আর চেষ্টা করার প্রয়োজন নেই।’ অথচ এটি ইসলামের শিক্ষা নয়। আল্লাহর ওপর ভরসা মানে হলো—সাধ্যমতো চেষ্টা করার পর ফলাফল আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেওয়া। একজন কৃষক জমিতে বীজ বপন করবে, জমি প্রস্তুত করবে, পানি দেবে, আগাছা পরিষ্কার করবে; তারপর বৃষ্টির জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করবে। সে যদি বীজ না বুনে শুধু বৃষ্টির জন্য দোয়া করে, সেটি তাওয়াক্কুল নয়; বরং কর্মবিমুখতা। মুমিন দোয়া করবে—সঙ্গে চেষ্টা করবে। পরিকল্পনা করবে—সঙ্গে আল্লাহর ওপর ভরসা করবে। পরিশ্রম করবে—সঙ্গে তাঁর সাহায্য চাইবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর যখন তুমি কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হও, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)
ইসলাম হালাল উপার্জনের জন্য পরিশ্রমকে অত্যন্ত মর্যাদা দিয়েছে। হজরত মিকদাম (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কেউ নিজের হাতের উপার্জনের চেয়ে উত্তম খাবার কখনো খায়নি। আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজের হাতের উপার্জন থেকেই খেতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২০৭২)
এ হাদিস আমাদের শেখায়, হালাল উপার্জনের জন্য শ্রম করা কোনো ছোট কাজ নয়। কাজের মর্যাদা তার বাহ্যিক চাকচিক্যে নয়; বরং তার হালাল হওয়া, সততা এবং মানুষের উপকারে আসার মধ্যে। তাই কোনো বৈধ কাজকে ছোট করে দেখা উচিত নয়। নিজের শ্রমে অর্জিত হালাল রিজিক মানুষের জন্য সম্মানের।
পরিশ্রমের ফল পেতে সময় লাগে
একটি বীজ মাটিতে পুঁতে দিয়ে পরদিন ফল আশা করা যায় না। তাকে মাটির নিচে অন্ধকারের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, শিকড় বিস্তার করতে হয়, মাটিকে ভেদ করে আলোয় উঠতে হয়। তারপর ধীরে ধীরে সে বৃক্ষে পরিণত হয় এবং একদিন ফল দেয়। মানুষের জীবনও অনেকটা এমন।
একজন মানুষ পরীক্ষায় ব্যর্থ হতে পারে, ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, চাকরিতে প্রত্যাখ্যাত হতে পারে কিংবা কোনো পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে পারে। কিন্তু এগুলোর কোনোটিই তার জীবনের শেষ অধ্যায় নয়। বরং প্রতিটি ব্যর্থতা তাকে নতুন কিছু শেখাতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যা তোমার জন্য উপকারী, তা অর্জনে আগ্রহী হও, আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও এবং অক্ষম হয়ে বসে থেকো না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৬৪)
অতএব, পড়ে গেলে উঠে দাঁড়াতে হবে। ভুল হলে ভুল সংশোধন করতে হবে। পরিকল্পনা ব্যর্থ হলে নতুন পরিকল্পনা করতে হবে। দরজা বন্ধ হলে বৈধ অন্য দরজা খুঁজতে হবে। কারণ একজন মুমিনের অভিধানে ‘চেষ্টা শেষ’ শব্দটি থাকা উচিত নয়।
পরিশ্রমের সঙ্গে থাকতে হবে সততা
প্রতারণা করে অর্জিত সম্পদ, অন্যের অধিকার নষ্ট করে পাওয়া সাফল্য, ঘুষ বা হারাম উপায়ে অর্জিত অর্থ—এসবকে প্রকৃত সফলতা বলা যায় না। ইসলামের কাছে সাফল্যের অর্থ হলো—হালাল পথে অর্জন, ন্যায়সংগত উপায়ে অগ্রসর হওয়া এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। একজন মানুষ হয়তো অনেক অর্থ উপার্জন করল; কিন্তু যদি সেই অর্থ হারাম হয়, তবে বাহ্যিক চাকচিক্য তার প্রকৃত সাফল্যের প্রমাণ নয়। অন্যদিকে একজন মানুষ অল্প উপার্জন করেও যদি হালাল পথে জীবনযাপন করে, পরিবারকে হালাল রিজিক খাওয়ায় এবং মানুষের অধিকার রক্ষা করে, তবে আল্লাহর কাছে তার জীবন অনেক বেশি মূল্যবান হতে পারে।
দোয়া ও পরিশ্রম অন্যতম অবলম্বন
জীবনের সাফল্যের জন্য একজন মুমিনের দুটি বিষয় প্রয়োজন—আল্লাহর কাছে দোয়া এবং নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা। শুধু দোয়া করে চেষ্টা না করা যেমন সঠিক নয়, তেমনি শুধু নিজের শক্তির ওপর নির্ভর করে আল্লাহকে ভুলে যাওয়াও মুমিনের পথ নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও এবং অক্ষম হয়ে বসে থেকো না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৬৪)
জীবনের পথ কখনো মসৃণ নয়। কোথাও কাঁটা থাকবে, কোথাও অন্ধকার থাকবে, কোথাও ব্যর্থতার দেয়াল সামনে এসে দাঁড়াবে। কিন্তু তাই বলে পথ চলা থামিয়ে দেওয়া যায় না। মনে রাখতে হবে—সাফল্য অনেক সময় তাদের কাছেই আসে, যারা ব্যর্থতার পরও চেষ্টা চালিয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা ‘মানুষ তাই পায়, যার জন্য সে চেষ্টা করে।’ (সুরা : নাজম, আয়াত : ৩৯)
তাই জীবনের কোনো পর্যায়ে হতাশ হয়ে থেমে যেও না। আজ যদি সফল না হও, কাল আবার চেষ্টা করো। আজ যদি পড়ে যাও, আগামীকাল উঠে দাঁড়াও। মানুষের প্রশংসা বা নিন্দাকে সাফল্যের মাপকাঠি বানিয়ো না। বরং সৎ উদ্দেশ্যে, হালাল পথে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাও। কারণ পরিশ্রম হয়তো কখনো কখনো ফল দিতে দেরি করে, কিন্তু সৎ পরিশ্রম কখনো বৃথা যায় না।