২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
মানুষের ব্যক্তিত্ব, ঈমান ও চরিত্রের অন্যতম পরিচয় প্রকাশ পায় তার কথাবার্তায়। একটি সুন্দর কথা যেমন মানুষের হৃদয়ে প্রশান্তি সৃষ্টি করতে পারে, তেমনি একটি অনর্থক কথা অযথা সময় নষ্ট করার পাশাপাশি মানুষের সম্মানহানি, সম্পর্কের অবনতি এমনকি গুনাহের কারণও হতে পারে।
মুমিনের সময় ও জীবন এত মূল্যবান যে সে এমন কথা ও কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখে না, যার মধ্যে দুনিয়া বা আখিরাতের কোনো কল্যাণ নেই। তাইতো পবিত্র কোরআনে সফল মুমিনদের পরিচয় দিতে গিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘আর যারা অনর্থক কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকে।’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ৩)
অনর্থক কথা বলতে কী বোঝায়?
‘লাগও’ বলতে এমন কথা ও কাজ বোঝায়, যা শরিয়তসম্মত কোনো উপকার বহন করে না। সব অনর্থক কথা সরাসরি হারাম নয়; তবে মুমিনের জন্য অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা থেকে নিজেকে সংযত রাখা উত্তম।
কারণ অনর্থক কথার দরজা দিয়ে অনেক সময় গিবত, অপবাদ, মিথ্যা, পরনিন্দা, ঝগড়া ও অশ্লীল কথাবার্তা প্রবেশ করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০১৮)
অনর্থক কথাবার্তা থেকে বাঁচার উপায়
১. কথা বলার আগে নিজেকে প্রশ্ন করা : কথা বলার আগে একটু থেমে ভাবতে হবে—‘আমি যা বলতে যাচ্ছি, তা কি প্রয়োজনীয়? এতে কি কোনো উপকার আছে? এটি কি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করবে?’ উত্তর নেতিবাচক হলে নীরব থাকাই নিরাপদ।
২. প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা না বলা : অনেক সময় একটি প্রয়োজনীয় কথা বলতে গিয়ে আমরা তার সঙ্গে দশটি অপ্রয়োজনীয় কথা যুক্ত করি।
মুমিনের উচিত সংক্ষিপ্ত, স্পষ্ট ও প্রয়োজনীয় কথা বলা।
৩. অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে অযথা নাক না গলানো : কে কী করল, কার সংসারে কী হলো, কে কোথায় গেল—এসব বিষয়ে অপ্রয়োজনীয় অনুসন্ধান ও আলোচনা মানুষের সময় নষ্ট করে এবং অনেক সময় গিবত বা অপবাদের দিকে নিয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ব্যক্তির ইসলামের সৌন্দর্যের অন্যতম নিদর্শন হলো—যা তার জন্য প্রাসঙ্গিক নয়, তা সে পরিত্যাগ করে।’ (জামে তিরমিজি, ২৩১৭)
৪. নীরবতার অভ্যাস গড়ে তোলা : প্রতিটি কথার উত্তর দেওয়া জরুরি নয়। কেউ অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে জড়াতে চাইলে চুপ থাকা অনেক সময় সবচেয়ে উত্তম জবাব।
নীরবতা দুর্বলতা নয়; বরং আত্মসংযমের পরিচয়।
৫. গিবত ও পরনিন্দার আসর এড়িয়ে চলা : যে আড্ডায় মানুষের দোষ-ত্রুটি, ব্যক্তিগত জীবন কিংবা সম্মান নিয়ে আলোচনা হয়, সেখান থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া উচিত। কারণ অনর্থক আলাপ কখন যে গুনাহের আলোচনায় পরিণত হয়, তা অনেক সময় মানুষ বুঝতেও পারে না।
৬. সময়ের মূল্য উপলব্ধি করা : একজন মুমিন জানে—তার জীবন সীমিত এবং প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর দেওয়া আমানত। তাই দীর্ঘ সময় ধরে অর্থহীন গল্প, অপ্রয়োজনীয় তর্ক বা উদ্দেশ্যহীন আলাপে সময় নষ্ট না করে কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, ইলম অর্জন, পরিবারকে সময় দেওয়া কিংবা উপকারী কাজে নিজেকে নিয়োজিত করা উচিত।
৭. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংযমী হওয়া : বর্তমান সময়ে অনর্থক কথাবার্তার বড় একটি ক্ষেত্র হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। প্রতিটি পোস্টে মন্তব্য করা, প্রতিটি বিতর্কে জড়িয়ে পড়া, যাচাই না করে কোনো কথা ছড়িয়ে দেওয়া—এসব থেকেও মুমিনকে সতর্ক থাকতে হবে। মুখের কথা যেমন হিসাবের অন্তর্ভুক্ত, তেমনি লিখিত কথাও দায়িত্বের বাইরে নয়।
৮. কথা কমিয়ে অর্থবহ কথা বাড়ানো : লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘কম কথা বলা’ নয়; বরং কম অনর্থক কথা বলা এবং বেশি উপকারী কথা বলা। একজন মানুষ তার কথার পরিমাণ দিয়ে নয়, বরং কথার গুণ ও প্রভাব দিয়ে মূল্যবান হয়ে ওঠে।
মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের অনর্থক কথাবার্তা থেকে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।