০১ অক্টোবর, ২০২৬
দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের বলকান অঞ্চলের সবচেয়ে জাতিগতভাবে বৈচিত্র্যময় প্রজাতন্ত্র বসনিয়া।সাবেক যুগোস্লাভিয়ার এই দেশটির জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে আগামী রবিবার।
এই নির্বাচন দেশটির ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) যোগদানের প্রচেষ্টাকে প্রভাবিত করার পাশাপাশি দেশটির ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার প্রভাবকেও প্রভাবিত করতে পারে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতি, ইইউতে যোগদানের আলোচনা দীর্ঘসূত্রতা এবং রাজনৈতিক সংকট নিয়ে দেশটির মানুষের হতাশা বাড়ছে। প্রায় ৩০ লাখ মানুষের দেশটিতে চলমান রাজনৈতিক সংকট দেশটির বিভক্তির আশঙ্কাও তৈরি করেছে।
১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সালের যুদ্ধের পরও বিভাজন কাটিয়ে উঠতে পারেনি বলকানের ছোট্ট এই দেশটি।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ বছর ধরে দেশটির জনসংখ্যা কমছে। বিনিয়োগে স্থবিরতা, দুর্নীতি এবং তরুণদের বিদেশে পাড়ি জমানোর প্রবণতা এ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে।
যুদ্ধকালীন জাতিগত বিভাজনের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে চায় দেশটির ভোটাররা। তবে বাস্তবে রাজনীতি এখনো সেই বিভাজনেই আটকে আছে।
প্রার্থীরাও সাধারণত নিজেদের শক্ত ঘাঁটির বাইরে খুব বেশি প্রচারণা চালান না।
দেশটির রাজধানী সারায়েভোর ৪৭ বছর বয়সী ভোটার দামির বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, তিনি নির্বাচনের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ, বিচারব্যবস্থার সংস্কার এবং জাতিগত বিভাজনের অবসান প্রত্যাশা করেন। একই সঙ্গে ইউরোপের আরো সক্রিয় ভূমিকার আশাও প্রকাশ করেন তিনি।
জটিল ভোটব্যবস্থা
বসনিয়া দুটি প্রধান অঞ্চলে বিভক্ত—সার্ব-অধ্যুষিত রিপাবলিকা সার্পস্কা এবং বসনিয়াক-ক্রোয়াট ফেডারেশন। দুর্বল কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে অঞ্চল দুটি যুক্ত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ১৯৯৫ সালে বসনিয়ায় সাড়ে তিন বছরের ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটানো ঐতিহাসিক ‘ডেটন শান্তিচুক্তি’ দেশটিতে শান্তি বজায় রাখতে সহায়তা করলেও সমালোচকদের মতে, এটি জাতিগত বিভাজনকে আরো দীর্ঘস্থায়ী করেছে।
আগামী রবিবার ভোটাররা কেন্দ্রীয় ত্রিপক্ষীয় প্রেসিডেন্সি ও জাতীয় সংসদের পাশাপাশি দুটি ফেডারেল অঞ্চলের আইনসভা নির্বাচনে ভোট দেবেন। এর পরদিন সোমবার থেকে প্রাথমিক ফল প্রকাশ শুরু হতে পারে।
নির্বাচনে বসনিয়াকদের এসডিএ, সার্বদের এসএনএসডি এবং ক্রোয়াটদের এইচডিজেড বায়এইচ—জাতীয়তাবাদী দলগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে বহুজাতিক বিরোধী জোট, যার নেতৃত্বে রয়েছে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এসডিপি)।
রাজনৈতিক সংকট ও বিদেশি প্রভাব
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পূর্ব সীমান্ত এবং রাশিয়ার মিত্র সার্বিয়ার মাঝামাঝি অবস্থানের রয়েছে বসনিয়া। যার কারণে দীর্ঘদিন ধরে দেশটির ওপর বড় বড় বিদেশি শক্তিগুলো প্রভাব বিস্তারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আসছে। এর মধ্যে বলকান অঞ্চলে নিজেদের সদস্যসংখ্যা বাড়াতে চাইলেও ইইউর সঙ্গে বসনিয়ার ধীরগতি দেখা যায়।
রয়টার্স বলছে, গত বছর সার্ব নেতা মিলোরাদ দোদিককে আন্তর্জাতিক শান্তি দূতের আদেশ অমান্যের দায়ে বসনিয়ার একটি আদালত এক বছরের কারাদণ্ড দেয়। পরে সেই সাজা জরিমানায় রূপান্তর করা হয়। দোদিকের প্রতি রাশিয়া সমর্থন জানালেও যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে গত বছর তার ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে।
এদিকে, বসনিয়াক-ক্রোয়াট ফেডারেশন যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির জন্য ১৫০ কোটি ডলারের একটি পাইপলাইন প্রকল্প এগিয়ে নিচ্ছে। তবে প্রকল্পটির সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা একটি প্রতিষ্ঠান যুক্ত থাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মকর্তারা উদ্বেগ জানিয়েছেন।
বসনিয়ার ডেটন চুক্তি বাস্তবায়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভের ভূমিকা নিয়েও ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলসের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।
জার্মান সরকারের সাবেক কর্মকর্তা ক্রিশ্চিয়ান শ্মিট গত মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে পদত্যাগ করার পর এ পদটি এখনো শূন্য রয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে নতুন কূটনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।