☰
✕

ইসলামে শিক্ষকের মর্যাদা

০৫ অক্টোবর, ২০২৬

মানুষের জীবনে মা-বাবার পর যাদের অবদান সবচেয়ে গভীর, তাদের মধ্যে অন্যতম শিক্ষক। একজন শিক্ষক শুধু বইয়ের জ্ঞান দেন না; তিনি শিক্ষার্থীর চিন্তা, চরিত্র ও ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ইসলাম জ্ঞানার্জনকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে এবং জ্ঞান শেখানো ও শেখানোর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদেরও সম্মানিত করেছে। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে শিক্ষকতা শুধু পেশা নয়, একটি গুরুত্বপূর্ণ আমানত ও দায়িত্ব।

কোরআনের প্রথম নাজিল হওয়া শব্দগুলোর অন্যতম হলো ‘ইকরা’ অর্থাৎ, পড়ো। আল্লাহ বলেন, ‘পড়ো তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা আলাক, আয়াত: ১) এই আয়াত থেকেই বোঝা যায়, ইসলামে জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব কতটা ব্যাপক। আর জ্ঞান অর্জনের পথে যারা মানুষকে সহযোগিতা করেন, তাদের ভূমিকা স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে কোনো পথ অবলম্বন করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের একটি পথ সহজ করে দেন।’ (সহিহ মুসলিম) ফলে জ্ঞান শেখানো ও শেখার কাজ ইসলামী সমাজে মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত।

শিক্ষকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ইসলামী আদবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাহাবায়ে কেরাম জ্ঞানী ব্যক্তিদের সম্মান করতেন এবং তাদের কাছ থেকে শেখার সময় গভীর মনোযোগ ও বিনয় অবলম্বন করতেন। কারণ জ্ঞান শেখার জন্য শুধু মেধা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন শ্রদ্ধা ও উত্তম আচরণ।

শিক্ষার্থীর উচিত শিক্ষকের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, অপ্রয়োজনীয় তর্ক থেকে বিরত থাকা, তার সময় ও শ্রমের মূল্য দেওয়া এবং ভুল হলে ভদ্রভাবে প্রশ্ন করা। তবে সম্মানের অর্থ অন্ধ আনুগত্য নয়; ইসলামে সত্য ও ন্যায়ের সীমার মধ্যে থেকেই শিক্ষককে সম্মান করতে বলা হয়েছে।

শিক্ষকের যেমন মর্যাদা রয়েছে, তেমনি তার দায়িত্বও অনেক। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণ করা, জ্ঞান গোপন না করা, নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা এবং শিক্ষার্থীর চরিত্র গঠনে ভূমিকা রাখা শিক্ষকের গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম) শিক্ষকও তার শিক্ষার্থীদের বিষয়ে দায়িত্বশীল। তাই শিক্ষকতার সঙ্গে আমানতদারি ও জবাবদিহির বিষয়টি গভীরভাবে জড়িত।

ইসলামে উপকারী জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়াকে চলমান সওয়াবের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি আমল অব্যাহত থাকে, সদকায়ে জারিয়া, উপকারী জ্ঞান এবং এমন নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে। (সহিহ মুসলিম)

একজন শিক্ষক জীবদ্দশায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে জ্ঞান ছড়িয়ে দেন, সেই জ্ঞান দিয়ে পরবর্তী প্রজন্ম উপকৃত হলে তার সুফল দীর্ঘদিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। এ কারণেই একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রভাব শুধু শ্রেণিকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা পরিবার, সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মেও ছড়িয়ে পড়ে।

তাই ইসলামে শিক্ষককে সম্মান করা মানে শুধু একজন পেশাজীবীকে সম্মান করা নয়; বরং জ্ঞান, শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা এবং শিক্ষকের দায়িত্বশীলতা দুটিই একটি সুন্দর ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।