০৭ অক্টোবর, ২০২৬
মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় অমুক্তিযোদ্ধাদের অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ এবং ১৯৭১ সালের শহীদ ও বীরাঙ্গনাদের তালিকা নিয়ে বিতর্কের অবসান ঘটাতে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে নির্মোহভাবে যাচাই-বাছাই করা হবে বলে জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। তিনি বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে কোনো মিথ্যা বা কলঙ্ক রাখতে চান না তারা।
বুধবার (৭ অক্টোবর) মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের প্রকৃত তালিকা প্রণয়নের কৌশল ও করণীয় নির্ধারণে মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, সরকার গঠনের পর বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে সংসদে, সংসদের বাইরে ও রাস্তাঘাটের বিভিন্ন আলোচনায় উঠে এসেছে, মহান স্বাধীনতার যারা যোদ্ধা বা মুক্তিযোদ্ধা, তাদের সঙ্গে হাজার হাজার অমুক্তিযোদ্ধা যুক্ত হয়েছেন। এ নিয়ে এখন রাস্তাঘাট, সংসদসহ সব জায়গায় আলোচনা ও সমালোচনা হচ্ছে।
তিনি জানান, ১৯৭১ সালের শহীদদের তালিকা নিয়েও অনেক বিতর্ক রয়েছে। স্বাধীনতার সময় সম্ভ্রমহানির শিকার বীরাঙ্গনা মা-বোনদের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এসব বিষয় নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় কাজ করছে।
মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী বলেন, ‘এই বিষয়গুলো নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় কাজ করছে নির্মোহভাবে। দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে আমরা এই বিষয়গুলোকে সঠিকভাবে যদি তুলে আনতে পারি, তাহলে আমরা মনে করি যে ইতিহাসের দায় থেকে আমরা নিজেদের মুক্ত করতে পারব।’
অমুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে সেই প্রক্রিয়া শেষ হতে কত সময় লাগবে তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, ‘কাজ করছি, কাজ করতে দেন আমাদের। আপনাদের সহযোগিতা চাই। আমরা কাজের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে, ঐতিহ্যকে সঠিক ধারায় নিয়ে যেতে চাই। আবারও বলি, নির্মোহভাবে। কোনো দল নেই, মত নেই, নির্মোহ।’
তিনি জানান, এ নিয়ে এর আগে সাংবাদিক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, সাবেক মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক বিভিন্ন পর্যায়ের জাতীয় নেতৃবৃন্দ ও বর্তমান নেতৃবৃন্দকে নিয়ে গোলটেবিল আলোচনা হয়েছে। ভবিষ্যতেও বিভিন্ন পর্যায় থেকে সবার মতামত নেওয়ার জন্য এ ধরনের গোলটেবিলের আয়োজন করা হবে।
আহমেদ আযম খান বলেন, ‘আজকেও সেরকমই সকল পর্যায়ের আলোচকরা ছিলেন। সকল বাংলাদেশের সকল পেশা থেকে আলোচকরা এসেছিলেন। ভবিষ্যতেও আমরা একে একে বিভিন্ন পর্যায় থেকে সকলের মতামত নেওয়ার জন্য এই ধরনের গোলটেবিলের আয়োজন করব।’
তিনি বলেন, স্বাধীনতার ইতিহাস সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করা এবং আগামী দিনে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে স্বাধীনতার ইতিহাস মানুষ সঠিকভাবে জানুক, সেই লক্ষ্যেই মন্ত্রণালয় কাজ করছে।
আজকের আলোচনায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি নির্মোহ ইতিহাসের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করব।’
মতবিনিময় সভায় কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী বলেন, আজকের বৈঠক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য নয়। অতীতেও এ ধরনের বৈঠক হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও আরও বৈঠক হবে। সবার মতামতের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হবে।
নতুন করে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আবেদন নেওয়ার বিষয়ে আহমেদ আযম খান বলেন, নতুন করে দরখাস্ত নেওয়া হচ্ছে না। তিনি মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময়ও আবেদন নেওয়া হচ্ছিল উল্লেখ করে বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হয়ে যাচ্ছে, এখন কেন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দরখাস্ত নেওয়া হবে? এটা স্বাভাবিকভাবে স্বাধীনতার পরে দুই-এক বছরে শেষ হওয়া দরকার ছিল।
তিনি বলেন, ‘৫৫ বছর, অনেক সময়। এটা শেষ হওয়া উচিত। এজন্যই বরং আমি একটা প্রজ্ঞাপন দিয়েছি যে এই ৭ অক্টোবর শেষ, এরপরে দরখাস্ত নেওয়া হবে না।’
তিনি জানান, যারা এরই মধ্যে আবেদন করেছেন, তাদের আবেদন চুলচেরা যাচাই-বাছাই করা হবে। সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কেউ বাদ পড়ে থাকলে তাদের তালিকাভুক্ত করা হবে।
আহমেদ আযম খান বলেন, ‘যারা দরখাস্ত দিয়েছেন, চুলচেরা যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে সততা এবং নিষ্ঠার সঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যদি সত্যিকারে কেউ বাদ পড়ে থাকেন, তাদেরকেই নেওয়া হবে যতজন দরখাস্ত করুক না কেন। তাতে অসুবিধা নেই, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের তালিকায় আসবে তারাই যারা সত্যিকারে মুক্তিযোদ্ধা এবং চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ে যারা থাকবে। এবং এটা হবে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে নির্মোহভাবে।’
আগের তালিকায় থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্য থেকে কেউ বাদ পড়বেন কি না জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, আগের তালিকা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। রাস্তাঘাট ও সংসদে এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, ‘সেদিন এক পত্রিকায় দেখলাম ৮৫ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা, যেটাকে আমি অমুক্তিযোদ্ধা বলব। এটা তো আছেই। এটা নিয়ে আমাদের যাচাই-বাছাই চলছে। এটা থেকেও আমরা বেরিয়ে আসতে চাই।’
তিনি জানান, মুক্তিযুদ্ধের তালিকায় অমুক্তিযোদ্ধাদের থাকা স্বাধীনতার ইতিহাসের একটি দায়। সেই দায় থেকে বেরিয়ে আসতে মন্ত্রণালয় কাজ করছে।
আহমেদ আযম খান বলেন, ‘কারণ স্বাধীনতার ইতিহাস আমাদের ঠিকানার ইতিহাস, আমাদের পরিচয়ের ইতিহাস। এ স্বাধীনতা কিন্তু বারবার আসে না, একবার এসেছে। আমরা স্বাধীন জাতি হিসেবেই যুগ যুগ ধরে থাকব। এইখানে যেন কোনো ইতিহাসের দায় না থাকে, কোনো মিথ্যে না থাকে, কোনো কলঙ্ক না থাকে—সেই চেষ্টাটা আমরা চালিয়ে যাব এবং আবারও বলছি, নির্মোহভাবে।’
মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রকৃত তালিকা, মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা এবং বিজয়ের পরে অস্ত্র জমা দেওয়ার বিষয়সহ অন্যান্য বিষয় নিয়েও কাজ করা হবে বলে জানান মন্ত্রী। সব বিষয় একসঙ্গে না ধরে ধাপে ধাপে কাজ করতে চায় মন্ত্রণালয় বলেও জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা একে একে সব বিষয়গুলো নিয়েই একে একে কাজ করতে চাই। সব বিষয় একত্রে ধরলে তাহলে হয়তোবা এটা আমরা অতটা... আমাদের অতটা জনবলও নেই, অতটা কাজও করতে পারব না। আমরা স্টেপ বাই স্টেপ আমরা সব বিষয়গুলো...।’
নতুন করে যারা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য আবেদন করেছেন, তাদের চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ের পরই তালিকাভুক্ত করা হবে বলে জানান মন্ত্রী। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) নীতিমালা অনুযায়ী কমিটি ও টিম গঠন, তদন্ত, সাক্ষাৎকারসহ বিভিন্ন ধাপে যাচাই করা হবে।
মন্ত্রী বলেন, ‘এখন যারা অতীতে তালিকাভুক্ত হয়নি বলে আবেদন করেছেন, তাদের আবেদন চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই করার পরই তারা তালিকাভুক্ত হবেন। জামুকায় কমিটি হবে, টিম হবে, তদন্ত হবে, তারপরে ইন্টারভিউ হবে—সমস্ত কিছু একেবারে নিবিড় তদন্তের পরেও আমাদের আরও অনেক যাচাই-বাছাইয়ের পরে তারপরে তালিকাভুক্ত হতে হবে।’
অতীতে মুক্তিযোদ্ধা বানানোর কারখানা ছিল বলে যে অভিযোগ রয়েছে, সেটি আর হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আহমেদ আযম খান বলেন, ‘যাতে করে অতীতের মতো... অতীতে যে ওইযে অনেকে বলেছেন যে এই আগের রেজিমে অনেকে একটা মুক্তিযোদ্ধা বানানোর ফ্যাক্টরি ছিল, সেটা হবে না ইনশাআল্লাহ। ইনশাআল্লাহ, এটা আমি হলফ করে বলতে পারি।’
কতদিনের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি নির্ভুল তালিকা প্রকাশ করা হবে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, কাজ শুরু হয়েছে। তবে এটি বড় কাজ হওয়ায় কতদিন লাগবে তা এখনই বলা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, ‘শুরু করেছি, দেখি কতদিনে পারি। এটা তো বড় একটা বিষয়, চেষ্টা করি।’
বর্তমানে দেশে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কত জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী বলেন, ‘এই মুহূর্তে মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা তো ২ লাখ ৩ হাজার সামথিং, এরকম আরকি।’
এই সংখ্যা যৌক্তিক কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা তো আমি আগেও বলেছি, আপনিও জানেন রাস্তাঘাটেও এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে, পত্রিকায় বের হয় ৮০ হাজার, ৮৫ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা, যেটাকে আমি অমুক্তিযোদ্ধা বলি। কাজেই এটা নিয়ে তো চূড়ান্ত কিছুই বলা যাবে না।’